উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নয় নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে: হাওরাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার ইঙ্গিত
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরবেষ্টিত জেলাগুলোতে বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। একাধিক নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় নতুন করে প্লাবনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, ধীরগতিতে পানি বাড়লেও পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম—ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রশাসনের সমন্বিত প্রস্তুতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর বেসিনে প্রাক-মৌসুমি বন্যা পরিস্থিতি দিন দিন অবনতি হচ্ছে। মঙ্গলবার সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ জেলার অন্তত নয়টি নদীর ১১টি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এতে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার নিম্নাঞ্চল নতুন করে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন: দেশের ৮ বিভাগে ঘণ্টায় ৮০ কিমি বেগে কালবৈশাখীর শঙ্কা
পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সিলেট অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদী কুশিয়ারার পানি ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে বিপৎসীমা ছাড়িয়ে গেছে। একইভাবে সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টেও নদীটির পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যা আশপাশের জনপদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে।
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর এলাকায় নলজুর নদীর পানি বিপৎসীমার তুলনায় অনেক বেশি উচ্চতায় অবস্থান করছে, যা স্থানীয়ভাবে আকস্মিক প্লাবনের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। জেলার হাওরাঞ্চলে পানি বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকায় কৃষিজমি ও মৎস্যসম্পদের ক্ষতির শঙ্কাও বাড়ছে।
আরও পড়ুন: ৮ নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে, উত্তর-পূর্বে বন্যার শঙ্কা
নেত্রকোনা জেলায় ধনু-বাউলাই, সোমেশ্বরী, ভুগাই-কংশ ও মগরা নদীর পানি বিভিন্ন পয়েন্টে বিপৎসীমার অনেক ওপরে রয়েছে। বিশেষ করে মগরা নদীর পানি উল্লেখযোগ্য উচ্চতায় প্রবাহিত হওয়ায় নদীসংলগ্ন বসতবাড়ি ও রাস্তাঘাট প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
অন্যদিকে হবিগঞ্জ জেলার কালনি ও সুতাং নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। একইভাবে মৌলভীবাজারের মনু নদীর পানি হঠাৎ বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমা ছুঁয়েছে, যা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে স্থানীয়দের মধ্যে।
পাউবো জানিয়েছে, সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নদীগুলোর পানি ঘণ্টায় শূন্য থেকে ১ সেন্টিমিটার হারে ধীরে বাড়ছে। যদিও এই বৃদ্ধি ধীরগতির, তবুও দীর্ঘ সময় ধরে পানি স্থির থাকলে বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হাওরাঞ্চলের মানুষের জন্য এই পরিস্থিতি নতুন নয়, তবে প্রাক-মৌসুমেই এমন পানি বৃদ্ধি উদ্বেগজনক। অনেক এলাকায় আগাম বোরো ধান কাটা সম্ভব হয়নি, ফলে কৃষকদের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় প্রশাসনকে আগাম আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, শুকনো খাবার ও চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে নদীতীরবর্তী জনগণকে সতর্ক থাকতে এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পাউবোও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আগাম সতর্কবার্তা জারি করার কথা বলেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় বন্যা এবার দীর্ঘায়িত হতে পারে। পানি বৃদ্ধির গতি কম হলেও এর স্থায়িত্বই এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই সময়মতো সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।





