পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে নতুন বন্যার শঙ্কা, ১৮ জেলায় বিপদের ঘণ্টা
টানা ভারী বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং একের পর এক নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় দেশের বিস্তীর্ণ জনপদ আবারও বন্যার হুমকির মুখে। ইতোমধ্যে অন্তত ১৮ জেলার নিম্নাঞ্চলে পানি ঢোকার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কোথাও বিদ্যমান বন্যা আরও ভয়াবহ হতে পারে, আবার কোথাও নতুন করে প্লাবিত হতে পারে বসতি, ফসলের মাঠ ও সড়ক। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাই নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের মানুষকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েকদিন ধরে অব্যাহত ভারী বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ভারতের উজানের ঢল যুক্ত হওয়ায় বড় ধরনের বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার তথ্যের ভিত্তিতে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) প্রকাশিত সর্বশেষ পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, দেশের উত্তর-পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের একাধিক নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা, আবার কোথাও বিদ্যমান বন্যার আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
আরও পড়ুন: টানা বৃষ্টি নিয়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে কী বলা হচ্ছে?
বর্তমানে সাঙ্গু নদী বান্দরবান ও দোহাজারী পয়েন্টে, মাতামুহুরী নদী লামা ও চিরিঙ্গা পয়েন্টে, মনু নদী মনু রেলওয়ে ব্রিজ ও মৌলভীবাজার পয়েন্টে, ধলাই নদী কমলগঞ্জে, খোয়াই নদী বাল্লাহ ও হবিগঞ্জে এবং কুশিয়ারা নদী মারকুলী স্টেশনে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এসব নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নদীসংলগ্ন জনপদে উদ্বেগ বাড়ছে।
আবহাওয়া পরিস্থিতিও স্বস্তিদায়ক নয়। আগামী দুই দিন সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। একই সময়ে ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গেও ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। উজানের এই অতিবৃষ্টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নদীগুলোর পানির প্রবাহ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন: সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে সারা দেশে ভারী বৃষ্টির সতর্কতা
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার। সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় আরও বাড়তে পারে। একই সময়ে ফেনী, খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রামের গোমতী, মুহুরী, ফেনী, সেলোনিয়া ও হালদা নদীর পানি কয়েকটি স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করে স্বল্পমেয়াদি বন্যার সৃষ্টি করতে পারে। এর প্রভাবে লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর নিম্নাঞ্চলের অনেক এলাকা সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে মনু, ধলাই ও খোয়াই নদীর পানি আপাতত স্থিতিশীল থাকলেও সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও ময়মনসিংহের সারিগোয়াইন, সোমেশ্বরী, যাদুকাটা এবং ভোগাই-কংস নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। কোথাও কোথাও এসব নদী বিপৎসীমা অতিক্রম করলে নতুন করে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকার পানি আগামী তিন দিন পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এফএফডব্লিউসি। এতে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে ইতোমধ্যে যে বন্যা পরিস্থিতি রয়েছে, তা আরও খারাপ হতে পারে। অনেক এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
উত্তরাঞ্চলেও নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলার তিস্তা নদীর পানি কয়েকটি স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। পাশাপাশি আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি পৌঁছে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত করতে পারে।
গত ২৪ ঘণ্টার বৃষ্টিপাতের চিত্র পরিস্থিতির ভয়াবহতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ সময়ে চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ২৯৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এছাড়া সুনামগঞ্জে ২৬৫ মিলিমিটার, নওগাঁর আত্রাইয়ে ২৬০ মিলিমিটার, বান্দরবানের লামায় ২০৭ মিলিমিটার, বান্দরবানে ১৯৬ মিলিমিটার, মহাদেবপুরে ১৯৩ মিলিমিটার এবং বরগুনায় ১৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। ভারতের মেঘালয়ের মাউকিরওয়াতে ২৪৫ মিলিমিটার এবং চেরাপুঞ্জিতে ২২৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হওয়ায় উজানের নদীগুলোর পানির চাপ আরও বাড়তে পারে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের ১০টি পর্যবেক্ষণ স্টেশনে নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এসব নদীর প্রভাবে হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, ফেনী, খাগড়াছড়ি, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রাম—এই ১৮ জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি কিংবা বিদ্যমান বন্যার আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমের এ সময়ে পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির সম্মিলিত প্রভাবে নদীর পানি খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে যেতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি রাখা, স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণ করা এবং গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি রাখার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।





