ক্ষুধার যন্ত্রণায় নিষেধাজ্ঞা মানছে না সুন্দরবনের বনজীবীরা
ক্ষুধার যন্ত্রণায় নিষেধাজ্ঞা মানছে না বেশ কিছু বনজীবী। বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রবেশ করছে সুন্দরবনে মাছ কাঁকড়া আহরণ করতে। তাও শুধু হাতে নয়, রীতিমতো বিষ প্রয়োগ করে সুন্দরবন থেকে অহরহ মাছ শিকার করছে এক শ্রেণির বনজীবী। তাদের কথা— "আমরা তো এমনি আসছি না, ক্ষুধার যন্ত্রণায় বাড়ি থাকতে পারছি না। অভাবে তাড়নায় চুরি করে সুন্দরবনে প্রবেশ করছি।"
তবে বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবার অত্যন্ত তৎপর থাকায় প্রতিনিয়ত পশ্চিম সুন্দরবন ও পূর্ব সুন্দরবন থেকে অবৈধভাবে প্রবেশকারী মাছ কাঁকড়া আহরণকারীদের আটক করে বন মামলা দেওয়া হচ্ছে। এদিকে সুন্দরবনে ১লা জুলাই থেকে বিএলসি (বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট) নবায়ন কাজ চলমান রয়েছে, চলবে ৩১শে জুলাই পর্যন্ত। সুন্দরবন পশ্চিম ও সুন্দরবন পূর্ব বিভাগ থেকে জানা গেছে, ১৬টি স্টেশনে প্রায় বারো হাজার বিএলসি রয়েছে। এই বিএলসি-র বিপরীতে পাস পারমিট দেওয়া হয়। সেই পাস পারমিট নিয়ে বনজীবী, মৌয়ালি, বাওয়ালি, পর্যটক সুন্দরবনে প্রবেশ করে।
আরও পড়ুন: শহরের রাজগোবিন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চুরি
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জানা গেছে, সুন্দরবনের দুই বিভাগ থেকে নিষেধাজ্ঞার সময় বেশ কিছু অবৈধভাবে সুন্দরবনে প্রবেশকারীদের আটক করে তাদের বিরুদ্ধে বন মামলা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সুন্দরবনের ১৬টি স্টেশনে প্রায় চার হাজারের মতো বিএলসি নবায়ন হয়েছে। বাকি বিএলসি গুলো ৩১শে জুলাইয়ের মধ্যে নবায়ন হবে বলে বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।

আরও পড়ুন: অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিতে সেনাবাহিনী সর্বাত্মক প্রস্তুত: মেজর সাজ্জাদ
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, মৎস্যভান্ডার নামে খ্যাত সুন্দরবনে বাঘ, হরিণসহ বন্যপ্রাণী ও মাছের প্রজনন মৌসুমে তিন মাসের জন্য সব নদ-নদী ও খালে মাছ ও মধু আহরণ বন্ধ এবং দেশি-বিদেশি পর্যটক প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে সুন্দরবন বিভাগ। তবে বন বিভাগের এই সিদ্ধান্তে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলে, বনজীবী ও পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।
১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা সুন্দরবনের বাংলাদেশের অংশে বহাল থাকবে। গোটা সুন্দরবনে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে গত ২৪ মে থেকে জেলে, মৌয়ালি ও পর্যটকদের সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতিপত্র দেওয়া বন্ধ করা হয়েছে।
সুন্দরবনের পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ. জেড. এম. হাসানুর রহমান বলেন, এই তিন মাস সুন্দরবনে মাছ, কাঁকড়া ও বনপ্রাণীর প্রজনন মৌসুম হিসেবে সরকার চিহ্নিত করেছে। সে কারণে এই তিন মাস সুন্দরবনে সব ধরনের অধিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই নিষিদ্ধ সময় আইন অমান্য করে যারা সুন্দরবনে প্রবেশ করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে বন বিভাগের এই সিদ্ধান্তে সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল জেলে, বনজীবী ও পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।
সুন্দরবনে মৎস্য সম্পদ রক্ষায় ২০১৯ সাল থেকে বন বিভাগ প্রতিবছর ১ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত গোটা সুন্দরবনের সব নদী ও খালে মাছ আহরণ বন্ধ রাখে। ২০২১ সালে দুই মাস মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকলেও ২০২২ সাল থেকে তা আরও এক মাস বাড়ানো হয়েছে। এই সময়ে সুন্দরবনে সব ধরনের পর্যটকের প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়।
সুন্দরবনের ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশের অংশে জলভাগের পরিমাণ ১,৮৭৪.১ বর্গকিলোমিটার, যা সমগ্র সুন্দরবনের আয়তনের ৩১.১৫ শতাংশ। সুন্দরবনের জলভাগকে বলা হয় মৎস্য সম্পদের ভাণ্ডার। এই জলভাগে ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া, ৪৩ প্রজাতির মালাস্কা ও ১ প্রজাতির লবস্টার রয়েছে। জুন থেকে আগস্ট এই তিন মাস মাছের প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনের নদী ও খালে থাকা বেশিরভাগ মাছের ডিম থেকে নতুন মাছ জন্ম নেয়। তাই এই সময়ে মাছ ধরা বন্ধ থাকলে সুন্দরবনের নদী-খালে মাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, তেমনি অন্যান্য প্রাণী, উদ্ভিদসহ সব জীবের জন্য ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে জানিয়েছে সুন্দরবন বিভাগ।
সুন্দরবন বিভাগ জানায়, মৎস্য সম্পদ রক্ষায় ইন্টিগ্রেটেড রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান (আইআরএমপি) এর সুপারিশ অনুযায়ী ২০১৯ সাল থেকে বন বিভাগ প্রতিবছর ১ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনের সব নদী ও খালে মাছ আহরণ বন্ধ রাখে। ২০২২ সাল থেকে এই সময় আরও এক মাস বাড়িয়ে (১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট) করেছে মন্ত্রণালয়। এই তিন মাসে সমগ্র সুন্দরবনের সব নদী ও খালে মাছ আহরণ বন্ধের পাশাপাশি পর্যটক প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সুন্দরবনে প্রবেশের সব ধরনের পারমিট বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সময়ে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় নদী-খালে মাছ বৃদ্ধি পাবে।
সুন্দরবনে তিন মাসের নিষেধাজ্ঞায় হতাশা প্রকাশ করে সাতক্ষীরা শ্যামনগর উপজেলার জেলে আনিসুর রহমান, মোহাম্মদ আলী, কিশোর দাসসহ অনেকে জানান, এই নিষেধাজ্ঞার সময় আমরা পরিবার নিয়ে কী খেয়ে বাঁচবো? মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিয়ে সারা বছর সুন্দরবনের নদ-নদী ও খালে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করি। এখন বন বিভাগ মাছ ধরা বন্ধ করায় আমাদের তিন মাস বেকার থাকতে হয়। সমুদ্রের মৎস্য আহরণ বন্ধের সময় মৎস্য বিভাগ যেভাবে জেলেদের খাদ্য সহায়তা দেয়, সেভাবে আমাদেরও প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। তা না হলে পেটের দায়ে অনেকে এই সময়ে অবৈধভাবে সুন্দরবনে ঢুকে মাছ আহরণ করতে বাধ্য হবে।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট এই ম্যানগ্রোভ বনে বাঘ, হরিণসহ বন্যপ্রাণী ও মাছের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের নদ-নদী ও খালে মাছ ও মধু আহরণ বন্ধসহ দেশি-বিদেশি সব পর্যটক প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এজন্য গত ২৪ মে থেকে জেলে, মৌয়ালি ও পর্যটকদের সুন্দরবনে প্রবেশের পারমিট দেওয়া বন্ধ করেছে।
এই তিন মাস সুন্দরবনে মাছ ও মধু আহরণসহ সব ধরনের পর্যটক প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই সময়ে সুন্দরবনে কেউ যেতে পারবেন না। এই নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগেই জেলে, মৌয়ালি ও সব পর্যটকদের সুন্দরবন থেকে বের করে আনা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে সুন্দরবন সন্নিহিত লোকালয়ে প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তবে, এবার সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল দরিদ্র বনজীবীদের তালিকা করে তাদের খাদ্য সহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়ার জন্য বন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
সুন্দরবন ট্যুর অপারেটর এমাদুল জানান, তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটক প্রবেশ নিষেধাজ্ঞায় পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত দুই হাজারের অধিক পরিবার দারুণ অর্থসংকটে পড়েছে ও মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি সুন্দরবনের এই নিষেধাজ্ঞার সময় এক মাসে নামিয়ে আনার দাবি জানান।
উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনগামী নিবন্ধিত জেলেদের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। তবে অনিবন্ধিত জেলেসহ এই সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জেলেরা।
শ্যামনগর উপজেলার বাবুরা ইউনিয়নের আব্দুর রাজ্জাক (৪৫), আনোয়ার হোসেন (৩৬), আবুল হোসেন (৬৫), আজগার আলী (৫৩), মশিউর রহমান (৩৫), একরামুল হক (৩৩), মাজেদ গাজী (৩৫), বুড়িগাল ইউনিয়নের শামসুর রহমান (৪৫), আমিনুর রহমান (৫২), রেজাউল করিম (৩৩), আব্দুর রহমান (৬৫), মিজানুর রহমান (৪৪), আবুবক্কার (৩৬), মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের জালাল উদ্দিন (৪৪), মোস্তফা কামাল (৫৫), আরিফ হোসেন (৩৪), সাইফুল ইসলাম (৪২), কেনুচরণ (৩৫), অরবিন্দু (৪২), শওকত হোসেন (৩৫) — এরা সকলেই দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকাকে জানান, এই তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা থাকায় আমাদের সংসার চালানো খুব কষ্ট হয়ে পড়েছে। কারণ সরকারিভাবে যে সহায়তা দিচ্ছে, তাতে আমাদের অনেক পরিবারের ১৫ দিনেরও খাদ্য হচ্ছে না। তারপর নানান রোগব্যাধি, বাজারঘাট— সবকিছুতে আটকে গেছি। খুব কষ্টে জীবন কাটাচ্ছি। অনেকেই এই যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে চুরি করে সুন্দরবনে প্রবেশ করে মাছ কাঁকড়া আহরণ করছে। আবার অনেকে বন বিভাগ, স্মার্ট টিমসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে জেলহাজতে যাচ্ছে। তারা বলেন, আমাদের দাবি— সরকার শুধু কিছু খাদ্য সহায়তা দিয়ে দায় সেরে গেলে হবে না, অর্থসহতাও করতে হবে। তা না হলে সুন্দরবনে নিষেধাজ্ঞার সময় প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করা যাবে না। পেটের জ্বালায় বনজীবীরা বিভিন্ন কায়দায় সুন্দরবনে প্রবেশ করতে বাধ্য হবে।

এদিকে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তুষার মজুমদার জানান, শ্যামনগর উপজেলায় প্রায় ২৪ হাজার নিবন্ধিত জেলে রয়েছে, কিন্তু সরকারিভাবে বরাদ্দ পাওয়া গেছে মাত্র ৮ হাজার জেলের। বাকি ১৬ হাজার জেলে সরকারি সহায়তা না পেয়ে চারদিকে হট্টগোল শুরু করেছে। কেউবা সংসারে অভাবের অজুহাত দেখিয়ে চুরি করে সুন্দরবনে প্রবেশ করে মাছ কাঁকড়া আহরণ করছে, আবার কেউবা অন্য পেশায় চলে গেছে।
এ ব্যাপারে বাংলাবাজার পত্রিকার সাথে কথা হয় সাতক্ষীরা সহকারী বন সংরক্ষক ফজলুল হকের সাথে। তিনি বলেন, এই তিন মাস সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ রয়েছে। সরকারিভাবে সে কারণে সুন্দরবনে কোনোভাবেই প্রবেশ করা যাবে না। তিনি আরো বলেন, যে সমস্ত জেলেরা অবৈধভাবে সুন্দরবনে প্রবেশ করছে, তাদেরকে আটক করে আইনের আওতায় আনার জন্য বন বিভাগসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো অপরাধীকে আটক করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে।
মিস্টার ফজলুল হক আরো বলেন, বনজীবীদের এই তিন মাস সংসার চালাতে একটু কষ্ট হচ্ছে— আমরা জানি। সরকারিভাবে যে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তাতে তাদের অনেক পরিবারের চাহিদা মিটছে না। কিন্তু করার কিছু নেই। সরকারের জারি করা নীতিমালা আমাদের বাধ্যতামূলক পালন করতে হবে। সে কারণে বনজীবীদের এই তিন মাস কোনো অপরাধ ক্ষমা করা যাবে না।
সেজন্য তিনি গণমাধ্যমের মাধ্যমে আবারও একবার বনজীবীদের কাছে অনুরোধ করছেন এই তিন মাস যেন কোনো কায়দায় সুন্দরবনে প্রবেশ না করে।





