তদন্ত দাবি এলাকাবাসীর

চিকিৎসকের অবহেলায় নিকলীতে ইউপি সদস্য মোহনের মৃত্যু

Any Akter
নিকলী প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১২:২৫ অপরাহ্ন, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ১২:২৮ অপরাহ্ন, ০৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

৫০ শয্যা বিশিষ্ট নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি  বিভাগে চিকিৎসার ক্ষেত্রে  অবহেলার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। নিকলী হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা না পেয়ে অকালে ঝরে যাচ্ছে  অনেক প্রাণ।  সর্বশেষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও জনপ্রতিনিধি  আনিসুজ্জামান মোহন নিকলী হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা না পেয়ে অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। সুইপার আর মালি দিয়ে আর কতকাল চলবে নিকলী হাসপাতালের জরুরী বিভাগ। এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী নিকলীবাসী ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।

সৎ, নির্ভীক, সদালাপী ও পরোপকারী হিসেবে পরিচিত আনিসুজ্জামান মোহন গত ২৭ জানুয়ারি দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে হঠাৎ অসুস্থতা অনুভব করেন। নিকলী থানা জামে মসজিদ সংলগ্ন হারিছ মিয়ার চায়ের দোকানে বসে তিনি জানান, বুকে ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন নিকলী উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মোঃ খাইরুল ইসলামের চাচা মাহবুবুর রহমান (মবু মিয়া)।

আরও পড়ুন: বরিশাল-১ আসন: হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে ধানের শীষ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী

অবস্থা ক্রমেই খারাপ হতে থাকলে মোহন মুখে স্প্রে ব্যবহার করেন এবং ঢাকার এক চিকিৎসকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। কিন্তু তাতেও স্বস্তি মেলেনি। অবস্থা বেগতিক দেখে তাৎক্ষণিকভাবে রিকশায় করে তাকে নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়।

সেখানেই শুরু হয় অবহেলার নির্মম অধ্যায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের ভাষ্যমতে, সেদিনও জরুরি বিভাগে কোনো চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। দায়িত্বে ছিলেন একজন মালি বা ওয়ার্ড বয়। তিনি মোহনের পকেটে থাকা চারটি ট্যাবলেট খেতে দেন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য ভাগলপুর মেডিকেলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি নিকলী ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ইসিজি করানোর কথাও বলেন। ইসিজি রিপোর্ট নিয়ে পুনরায় জরুরি বিভাগে গেলে অনেকক্ষণ পর ফোন পেয়ে চিকিৎসক সেখানে আসেন। রিপোর্ট দেখেই তিনি ভাগলপুর মেডিকেলে রেফার্ড করেন। অ্যাম্বুলেন্সে করে মোহনকে নেওয়ার সময় তার জ্ঞান ছিল, তিনি কথাও বলছিলেন। কিন্তু পথিমধ্যে তিনি অভিযোগ করেন, অক্সিজেন সিলিন্ডার থেকে গ্যাস ঠিকমতো তার মুখে পৌঁছাচ্ছে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন। ভাগলপুর হাসপাতালে পৌঁছালে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

আরও পড়ুন: আগে প্রজ্ঞাপন, পরে নির্বাচন—কাশিয়ানীতে সরকারি কর্মচারীদের বিক্ষোভ

মোহনের আকস্মিক মৃত্যুর খবরে পুরো নিকলী উপজেলায় নেমে আসে শোকের ছায়া। জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতার এমন মৃত্যু শুধু শোক নয়, জন্ম দিয়েছে অসংখ্য প্রশ্নের। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে দীর্ঘদিন ধরেই চিকিৎসকের অনুপস্থিতি নিয়মে পরিণত হয়েছে। দুর্ঘটনা, শ্বাসকষ্ট বা স্ট্রোকের রোগী এলেও আগে চিকিৎসককে ফোন করে ডেকে আনতে হয়। অনেক সময় চিকিৎসক ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে থাকায় হাসপাতালে আসতে দেরি হয়, ততক্ষণে রোগীর অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে।

তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হয়েও যদি জরুরি মুহূর্তে একজন চিকিৎসকের সেবা না পান, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? মোহন কি বেঁচে ফিরতে পারতেন যদি সময়মতো চিকিৎসক ও কার্যকর জরুরি সেবা পেতেন? অ্যাম্বুলেন্সের অক্সিজেন সিলিন্ডার সচল ছিল কি না এই প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে। সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

মোহন মেম্বারের মৃত্যুর জন্য দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। জরুরি বিভাগে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকের চরম গাফিলতি ও এম্বুলেন্সে অক্সিজেনের ভয়াবহ সংকটই একটি তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। ভাজতি জামাই যুবদল নেতা রাজন আহমেদ  রফিকুলের(৪০) অভিযোগ স্পষ্ট যে  সময়ে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পেলে মোহন মেম্বার আজ বেঁচে থাকতে পারতেন। সাধারণ রোগীদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে পঃপঃ কর্মকর্তা ডাঃ সজীব ঘোষের উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতার ফলেই এই মৃত্যু। এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, এটি অবহেলাজনিত মৃত্যু। দায়ীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

মরহুম ইউপি সদস্য আনিসুজ্জামান মোহনের স্ত্রী মোছাঃ রুবিনা আক্তার (৩৮) অভিযোগ করে বলেন, যথাসময়ে সঠিক চিকিৎসা পেলে তার স্বামী আজ বেঁচে থাকতেন। তিনি বলেন, নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের অব্যবস্থাপনা ও গাফিলতির কারণেই তার স্বামীর তাজা প্রাণ ঝরে গেছে। এসব কথা বলতে বলতে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

নিকলী উপজেলা বিএনপির নেতা মোঃ আলমগীর হোসেন বলেন, কয়েক মাস আগে ডাঃ সজীব ঘোষ রফিকুল নামে এক রোগীকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিবার বাধ্য হয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। শুধু তাই নয়, হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রেও ডাঃ সজীব ঘোষের দায়িত্বহীন ও উদাসীন আচরণ বারবার লক্ষ্য করা গেছে, যা সরাসরি সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা সেবার জন্য হুমকিস্বরূপ বলে মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সজীব ঘোষকে একাধিকবার মুঠোফোনে কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। কিশোরগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ অভিজিত শর্মা   বলেন, নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তারের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যাবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।