হাওরে অতি বৃষ্টিতে ডুবছে ফসল, কৃষকের কান্না

Any Akter
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ১:২১ অপরাহ্ন, ২৯ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ১:২২ অপরাহ্ন, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের বিভিন্ন জেলায় কয়েকদিন ধরে ভারী ও অতিভারী বৃষ্টি অব্যাহত। বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে কিছু নদ- নদীর পানি। কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা ও সুনামঞ্জসহ কয়েকটি এলাকায় গ্রামীণ সড়ক ও বাঁধ ভেঙে হাওরে ঢুকছে পানি । ফলে চোখের সামনেই ডুবছে কৃষকের স্বপ্নের ফসল। বাংলাবাজার পত্রিকার বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদন থেকে এমন কিছু চিত্রই দেখা গেছে, যা বন্যার আগাম বার্তা দিচ্ছে। সেই বার্তায় জেলাগুলোর নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী পরিবারগুলোর কপালে চিন্তার ভাজ। ঘর আর ফসল বাঁচানোর দুশ্চিন্তায় ঘুম হারাম তাদের। কিশোরগঞ্জে

টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে হাওরের পাকা ধান: দুদিন আগেও এ জেলায় বিস্তীর্ণ হাওরে বাতাসে পাকা ধানের দোল খাওয়া দেখে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল। ধান কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কৃষকরা। টানা বৃষ্টিতে সেই চোখ জুড়ানো ফসল তলিয়ে গেছে। গত রবিবার (২৬ এপ্রিল) থেকে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলসহ বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টিসহ তুফান ও বজ্রপাত চলছে। একদিকে বৃষ্টিতে পানি বাড়ছে অন্যদিকে বজ্রপাতের ভয়। ফলে ধান কাটতে মাঠে নামতে পারছেন না কৃষকরা। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ফসল বাঁচানো দুস্কর হয়ে পড়ছে। কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ও আদমপুর এলাকাসহ ইটনা ও মিঠামইন হাওরের কিছু এলাকায় দুই হাজারেরও বেশি হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। অষ্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর হাওরে দেখা যায়, কৃষকরা গলাডোবা পানিতে নেমে ধান কাটছেন। এরপর নৌকা দিয়ে সেগুলো পাড়ে আনছেন । এতে শ্রমিক খরচ অনেক বেশি হচ্ছে। কেউ আবার শেষ সম্বল হিসেবে ডুব দিয়ে কিছু পচা ধান কেটে কলাগাছের ভেলার ওপরে তুলছেন। তবে অনেক জমির ধান ইতোমধ্যে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। আর যে ধান কয়েক দিনের মধ্যে ঘরে তোলার কথা ছিল, তা এখন পানির নিচে। হাঁটু বা কোমরপানিতে নেমে কেউ কেউ ধান কাটলেও অনেক কৃষকই আশা ছেড়ে দিয়েছেন।

আরও পড়ুন: বরিশালে হাসপাতালে অশ্লীলতার অভিযোগে সমকামী দুই তরুণী আটক

নেত্রকোণায় বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তলিয়েছে বোরো ফসলি জমি: নেত্রকোণায় অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ বোরো ফসলি জমি তলিয়ে গেছে, যা স্থানীয় কৃষকদের বড় ধরনের দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টিতে এই জেলায় অন্তত ৫০৭ হেক্টর বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এর আগে মার্চের মাঝামাঝি শিলাবৃষ্টিতে আরও ৩২৩ হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। জেলার বিভিন্ন হাওরে পাহাড়ি ঢলের কারণে পানি জমে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। যার ফলে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে আছে অনেক পাকা ও আধাপাকা ধান ৷ যে সময়ে ধান ঘরে তোলার ব্যস্ততা থাকার কথা, সেখানে অকাল বন্যায় কৃষকরা দিশেহারা। এদিকে জলাবদ্ধতার কারণে অনেক জায়গায় কম্বাইন হারভেস্টার (ধান কাটার যন্ত্র) চালানো যাচ্ছে না। এছাড়া জ্বালানি তেলের সংকট ও কৃষি শ্রমিকের অভাবে ধান কাটা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পক্ষ থেকে কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

তবে স্থানীয়রা বলছেন, দ্রুত পানি না নামলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। সুনামগঞ্জে সড়ক ভেঙে হাওরে ঢুকছে পানি, ডুবছে ফসল:

আরও পড়ুন: ভারী বৃষ্টিতে নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে, বন্যার শঙ্কা

এই জেলার মধ্যনগর উপজেলায় বাঁধ ভেঙে এরন বিল হাওরে (ইকরাছই হাওর) পানি ঢুকে পড়ছে । গতকাল মঙ্গলবার (২৮এপ্রিল) সীমান্তের মনাই নদীতে চাপ বাড়ায় উপজেলার হামিদপুর গ্রাম পার্শ্ববর্তী গ্রামীণ সড়ক ভেঙে এই পানি প্রবেশ করছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এই হাওরে ১১৪ হেক্টর জমি রয়েছে। এর মধ্যে ৪০ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। বাকি জমিগুলোর ধান সড়ক ভেঙে ঢোকা পানিতে তলাতে শুরু করেছে। সেই পানি আটকাতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন স্থানীয়রা।

গাইবান্ধায় কালবৈশাখী ও বৃষ্টিতে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি

কয়েক দিনের অব্যাহত কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টিতে উঠতি বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে গাইবান্ধায়। এতে প্রায় সহস্রাধিক হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে কৃষকদের দাবি। এই জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে নানা ধরনের ফসলের ক্ষতির চিত্র । ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আহাজারি করতেও দেখা যায়। কৃষি ফসলের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত গাইবান্ধা। এ জেলার অধিকাংশ মানুষ কৃষি ফসলের ওপর নির্ভরশীল। ধানসহ বিভিন্ন ফসল ফলিয়ে তারা পরিবারের যাবতীয় চাহিদা পূরণের স্বপ্ন দেখেন। তবে কালবৈশাখীর ঝড় বেশ কিছু কৃষকের সেই স্বপ্ন নিমিষেই নষ্ট করে দিয়েছে।গাইবান্ধা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে- জেলার সাত উপজেলা দিয়ে বয়ে যাওয়া কালবৈশাখীর ঝড়ে এ পর্যন্ত ৩৬০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসবের মধ্যে বোরো ধান ২১২ হেক্টর, ৫৪ হেক্টর ভুট্টা, শাক-সবজি ৮১ হেক্টর, কলা ৫ হেক্টর ও ৮ হেক্টর আউশ বীজতলা। এ ক্ষতি নিরূপণে মাঠে কাজ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর।

এক ঘণ্টায় ১২৬ মিমি বৃষ্টি : ফেনীতে ‘মেঘ বিস্ফোরণ

বাংলাবাজার রিপোর্ট: অস্বাভাবিক প্রবল বর্ষণে ‘মেঘ বিস্ফোরণ’-সদৃশ পরিস্থিতিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ফেনীর জনজীবন। মাত্র এক ঘণ্টায় ১২৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে গেছে, সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও চরম ভোগান্তি । গতকাল বিকেলে হঠাৎ নেমে আসা ভারী বর্ষণে কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে ফেনী শহর । জেলা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বিকাল ৩টা পর্যন্ত এক ঘণ্টায় ১২৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক উচ্চমাত্রার বর্ষণ হিসেবে বিবেচিত। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় মোট বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে ১৫০ মিলিমিটারচলতি বছরের সর্বোচ্চ। প্রবল বর্ষণে শহরের ডাক্তারপাড়া, শহীদ শহিদুল্লা কায়সার সড়ক, পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস এলাকা, শাহীন একাডেমি সংলগ্ন সড়ক, পাঠানবাড়ি, নাজির রোড, মিজান রোড, সদর হাসপাতাল মোড় ও পেট্রোবাংলা এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। নিচু সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে গিয়ে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং বিভিন্ন দোকানপাটে পানি ঢুকে পণ্যসামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, অল্প সময়ের ভারী বর্ষণেই শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ফলে দ্রুত পানি নিষ্কাশন সম্ভব হয়নি এবং নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির উদ্দিন জানান, “টানা বর্ষণের কারণে ড্রেন ও খাল দিয়ে পানি ধীরগতিতে নামছে। এ কারণে সড়কে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পৌরসভার ১২টি টিম কাজ করছে। আশা করছি, দ্রুত পানি নেমে যাবে।” অন্যদিকে, জেলা আবহ- াওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান বলেন, “স্বাভাবিক লঘুচাপের প্রভাবে এই বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আগামী তিন দিন পর্যন্ত বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত ও কালবৈশাখী ঝড়ের আশঙ্কা রয়েছে।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক মাত্রার এ ধরনের বর্ষণ ‘ক্লাউডবার্স্ট” বা ‘মেঘ বিস্ফোরণ' হিসেবে পরিচিত। এতে অল্প এলাকায় খুব কম সময়ে ১০০ মিলিমিটার বা তার বেশি বৃষ্টিপাত ঘটে, যা আকস্মিক বন্যা ও নগর জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় । ফেনীর এই পরিস্থিতি নগর অবকাঠামো, বিশেষ করে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতাকে আবারও সামনে এনেছে । আবহ- াওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যান্য জেলার যে অবস্থা

অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় কালবৈশাখী ঝড়ে একটি মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক টাওয়ার ভেঙে পড়েছে। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকালে উপজেলার বিনাউটি ইউনিয়নের তিনলাখপীর বাস স্ট্যান্ডের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এতে ওই এলাকায় ব্যাহত হচ্ছে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট সেবা ।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস যা বলছে

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের পাশাপাশি নেত্রকোনার নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পূর্বাভাসে বলা হয়, বিগত ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকায় এবং দেশের উজানে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাত পরিলক্ষিত হয়েছে। এ অঞ্চলের হাওর অববাহিকায় আগামী তিন দিন ভারি থেকে অভিভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে হাওর অববাহিকার সিলেট ও সুনামগঞ্জের সুরমা-কুশিয়ারা, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের মনু-খোয়াই এবং নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের ধনু- বাউলাই ও ভুগাই-কংস নদীগুলোর পানি সমতল আগামী তিন দিন দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। এসময় ওই নদীগুলো ও এর প্রধান উপ-নদীগুলোর পানি বিপৎ- সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। ফলে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনার নদী সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে । এদিকে সারাদেশে আগামী আরও চার দিন বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাতের আভাস দিয়েছেন কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক বাংলাদেশি গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ। এছাড়া দেশের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ সংগঠন- বিডব্লিউওটি এক ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছে, আগামী ৪ মে পর্যন্ত ভারি ও অতিভারি বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাতের সংখ্যাও অনেক বেশি থাকবে। এই বজ্ৰপাত থেকে বাঁচতে বিশেষ সতর্কতার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।