পটুয়াখালীতে পায়রা নদীর তীব্র ভাঙন: বিলীনের পথে ৪ গ্রাম
উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর সদর উপজেলার ছোটবিঘাই ইউনিয়নে খরস্রোতা পায়রা নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ইউনিয়নের পূর্ব ও পশ্চিম পাশ দিয়ে ত্রিভুজাকারে বয়ে যাওয়া পায়রা নদী ও কুড়ালিয়া খালের অববাহিকায় অবস্থিত ফুলতলা, ভুতামমিয়া, তুষখালী ও ভাজনা—এই চারটি গ্রাম এখন নদীগর্ভে প্রায় বিলীন হতে চলেছে। ভাঙনের কবলে পড়ে ইতিমধ্যে ভিটেমাটি ও ফসলি জমি হারিয়েছে সহস্রাধিক পরিবার। সহায়-সম্বলহীন এসব মানুষ পটুয়াখালী, বরিশাল ও ঢাকাসহ বিভিন্ন শহর-নগরে আশ্রয় নিয়ে দিনমজুর, রিক্সাচালক ও ঠেলাওয়ালা হিসেবে কায়িক পরিশ্রম করে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ভাঙন রোধে দীর্ঘদিন ধরে শুধু আশ্বাস মিললেও দৃশ্যমান কোনো স্থায়ী পদক্ষেপ না নেওয়ায় ক্ষোভ ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই চার গ্রামের ভাঙন পরিস্থিতি নতুন নয়। ছোটবিঘাই ইউনিয়ন জেলে ঋণদান সমবায় সমিতির সভাপতি ও ইউনিয়ন শাখা জাতীয়তাবাদী মৎস্যদলের সভাপতি মো. জয়নাল মৃধা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, “বিগত সরকারের সময় স্থানীয় এমপি রুহুল আমিন হাওলাদার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন পার হয়ে গেলেও কাজের কাজ কিছুই হয় নাই। শুধু আশ্বাসের মধ্যেই আটকে আছে চার গ্রামের মানুষের ভাগ্য।” ভাঙনের তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের দ্বারস্থ হয়েছেন।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে: তথ্য প্রতিমন্ত্রী
ছোটবিঘাই ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও ৪ নং ওয়ার্ডের মেম্বর মো. আলমগীর হোসেন জানান, “ভাঙ্গনের ভয়াবহ খবরটি আমি পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে অবহিত করেছি। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, খুব শীঘ্রই ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় পাইলিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে।” তবে এই আশ্বাসের বাস্তবায়ন কবে হবে, তা নিয়ে সংশয়ে আছেন ভুক্তভোগীরা। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে প্রথমবার রিং হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি এবং দ্বিতীয়বার চেষ্টা করলে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
ইতিহাস ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ছোটবিঘাই ইউনিয়নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী। একসময় এই অঞ্চলের পায়রা নদী ছিল পর্তুগীজদের অভয়ারণ্য। নদীতে মাছ ধরাই ছিল যাদের একমাত্র পেশা—সেই জেলে সম্প্রদায়ের হাত ধরেই মূলত এই প্রাচীন জনপদ গড়ে ওঠে। অনতিদূরে পটুয়াখালী শহর গড়ে ওঠার কারণে প্রশাসনিক কাঠামোর বৃত্তের ভেতরেই একটি ছোট্ট ও সমৃদ্ধ পরিসরের সভ্যতা হিসেবে রূপ নেয় এই ছোটবিঘাই ইউনিয়ন। কিন্তু পায়রা নদীর রাক্ষুসে গ্রাসে আজ সেই ঐতিহ্য ও জনপদ চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
আরও পড়ুন: ফরিদপুরে বাসচাপায় ৫ নিহত, বিক্ষুব্ধ জনতার আগুনে পুড়ল ৪ যানবাহন
বর্তমানে ফুলতলা, ভুতামমিয়া, তুষখালী ও ভাজনা গ্রামের যারা এখনও কোনোমতে টিকে আছেন, তারা চরম ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। যেকোনো মুহূর্তে নদী তাদের শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নিতে পারে। নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া উদ্বাস্তু পরিবারগুলো এবং বর্তমানে ঝুঁকিতে থাকা বাসিন্দারা অনতিবিলম্বে স্থায়ী বেড়িবাঁধ ও কার্যকর ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন।





