সাভারে পরপর বোমাসদৃশ বস্তু ও বিস্ফোরক উদ্ধার, আতঙ্কে স্থানীয়রা
ঢাকার সাভারে একেরপর এক বোমাসদৃশ বস্তু ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়েছে। মঙ্গলবার রাতে দক্ষিণ শ্যামপুরে একটি বাসা থেকে ১৫টি পাইপ বোমাসহ বিভিন্ন বিস্ফোরক ও রাসায়নিক উপাদান উদ্ধারের পর বুধবার সকালে সাধাপুরের একটি মসজিদের মাঠে কালো কসটেপে মোড়ানো একটি প্রেসার কুকার পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেটি বোমা কি না, তা নিশ্চিত করতে ঘটনাস্থলে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটকে খবর দিয়েছে পুলিশ। এর আগে আশুলিয়াতেও কসটেপে মোড়ানো প্রেসার কুকারসদৃশ বস্তু উদ্ধার করে নিষ্ক্রিয় করেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ৮টার দিকে সাভারের সাধাপুর গোপের বাড়ি লালটেক ঘোড়া মসজিদের খোলা মাঠে কসটেপে মোড়ানো প্রেসার কুকারটি পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পুরো মাঠ ঘিরে রাখে।
আরও পড়ুন: ময়মনসিংহের যৌনপল্লীর সর্দানী লাভলীর বিরুদ্ধে বিপুল সম্পদ ও নানা অপরাধের অভিযোগ
ভবানীপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ও সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ইমরান হোসেন বলেন, পুলিশের জরুরি সেবা নম্বরে কল পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে কালো কসটেপে মোড়ানো প্রেসার কুকারটি দেখতে পান। এটি বোমা হতে পারে সন্দেহে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটকে খবর দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পুরো মাঠ নিরাপত্তার মধ্যে রাখা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গভীর রাতে অজ্ঞাতনামা তিন ব্যক্তি একটি নীল রঙের প্লাস্টিকের ড্রাম মসজিদের মাঠে রেখে পালিয়ে যান বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পরে ড্রামের ভেতর কাপড়চোপড়, কোরআন শরিফসহ কসটেপে মোড়ানো প্রেসার কুকার দেখতে পান তারা। এরপর ড্রাম থেকে প্রেসার কুকারটি বের করে মাঠে রেখে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: রাঙ্গামাটিতে ছাত্রদল নেতার মুক্তির দাবীতে বিক্ষোভ মিছিল
এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে সাভারের তেঁতুলঝড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায় বিস্ফোরক উদ্ধারে অভিযান চালায় কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)।
অভিযানের আগে হেমায়েতপুর এলাকা থেকে আরিফ নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, তার কাছ থেকে বিশেষভাবে লুকানো ছয়টি পাইপ বোমা ও বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক উপাদান উদ্ধার করা হয়।
পরে আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দক্ষিণ শ্যামপুরের একটি বাড়ির তথ্য পায় সিটিটিসি। সেই তথ্যের ভিত্তিতে বাড়িটিতে অভিযান চালিয়ে আরও নয়টি পাইপ বোমা, গান পাউডার, সায়ানাইডসহ বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। সব মিলিয়ে ১৫টি পাইপ বোমা উদ্ধার করে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট সেগুলো নিষ্ক্রিয় করে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাড়িটির মালিক আব্দুল জলিলের কাছ থেকে চলতি মাসের ২ আগস্ট নিচতলার একটি কক্ষ ভাড়া নেয় একটি পরিবার। পরদিন থেকেই তারা সেখানে বসবাস শুরু করে। বাসা নেওয়ার সময় নিজেদের প্রকৃত পরিচয় গোপন করার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
বাড়ির মালিকের মেয়ে ইলমা জানান, আব্বাস আলী নামে একজনসহ আরও একজন প্রথমে বাসা ভাড়া নিতে আসেন। তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে পরিবার নিয়ে থাকার কথা জানান। একজন গাড়িচালক এবং অন্যজন স্থানীয় একটি স্কুলে শিশুদের পড়ানোর কাজ করবেন বলেও জানানো হয়েছিল। পরিবার নিয়ে থাকার কথা বলায় বাড়িওয়ালার সন্দেহ হয়নি।
তবে কয়েক দিনের মধ্যেই ওই বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় হতবাক স্থানীয়রা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, বাসাটি ব্যবহার করে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) সদস্যরা বোমা তৈরির কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন। আটক আরিফের কাছ থেকে জেএমবির দাওয়াতি ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের লিফলেটও উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্রের দাবি, ‘বোমারু মামুন’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তিরও ওই আস্তানায় যাতায়াত ছিল। বোমা তৈরিতে দক্ষ হিসেবে পরিচিত ওই ব্যক্তি সেখানে বোমা তৈরির কাজ তদারকি করতেন বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তার সংশ্লিষ্টতা ও পরিচয় নিয়ে তদন্ত চলছে।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, অভিযানের সময় পুরো এলাকা নিরাপত্তার মধ্যে রাখা হয়। বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট উদ্ধার করা বিস্ফোরকগুলো নিষ্ক্রিয় করেছে।
কী উদ্দেশ্যে ওই বাসায় বোমা তৈরি করা হচ্ছিল, বিস্ফোরক ও রাসায়নিক উপাদানগুলো কোথা থেকে আনা হয়েছিল এবং এর সঙ্গে আর কারা জড়িত, এসব বিষয়ে আটক আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এদিকে সাধাপুরের মসজিদের মাঠে পড়ে থাকা প্রেসার কুকারটি বোমা কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের পরীক্ষা শেষে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এর আগে আশুলিয়াতেও কসটেপে মোড়ানো প্রেসার কুকারসদৃশ বস্তু উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয় করার ঘটনা ঘটেছে। ফলে সাভার-আশুলিয়া অঞ্চলে অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক বোমাসদৃশ বস্তু ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। তবে এসব ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।





