‘টাকা না দিলে সন্তান-নাতির লাশ সড়কে পড়ে থাকবে’—হোয়াটসঅ্যাপে হুমকি, তদন্তে পুলিশ

চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীকে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ

Shahrier Islam Pallab
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৭:৩৯ অপরাহ্ন, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৭:৩৯ অপরাহ্ন, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

চট্টগ্রামে আলোচিত এক ব্যবসায়ীকে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি এবং চাঁদার টাকা না দিলে তাঁর সন্তান ও নাতিকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিদেশে পলাতক হিসেবে পুলিশের নথিতে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের সহযোগী ‘রায়হান’ পরিচয়ে ওই হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ী মাকসুদ চৌধুরী। এ ঘটনায় তাঁর স্ত্রী মাহফুজা রুনা বাদী হয়ে বায়েজিদ বোস্তামী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। 

অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ

আরও পড়ুন: প্রতিমন্ত্রীর গাড়ির ধাক্কায় আহত বৃদ্ধার মৃত্যু

পুলিশ বলছে, হুমকিদাতাকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। হুমকির পেছনে কারা রয়েছে, তারা সত্যিই কোনো সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে যুক্ত কি না এবং চাঁদা দাবির ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—তদন্তের মাধ্যমে এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে। জিডি সূত্রে জানা যায়, গত ৩১ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার মোজাফফরনগর এলাকার ব্যবসায়ী মাকসুদ চৌধুরীর হোয়াটসঅ্যাপে একটি বিদেশি নম্বর থেকে ফোন আসে। ফোনে তাঁর কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে তাঁর ছেলে-মেয়েকে হত্যা এবং পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

‘আমি রায়হান, যা বলি তা করি’: 

আরও পড়ুন: নান্দাইলে আনওয়ারুল হোসেন খান চৌধুরী স্মৃতি ফুটবল টূর্নামেন্ট উদ্বোধন

জিডিতে হুমকিদাতার বক্তব্যের বরাত দিয়ে মাহফুজা রুনা উল্লেখ করেন, টাকা না দিলে মোজাফফরনগর এলাকায় ব্যবসায়ী মাকসুদের গতিবিধি নজরদারি করা হবে। তাঁর ছেলে ও পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়।

হুমকিদাতা নিজেকে ‘রায়হান’ পরিচয় দিয়ে টাকা না দিলে ‘কেউ রক্ষা করতে পারবে না’—এমন ভাষায় ভয়ভীতি দেখিয়েছে বলে জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি পরিবারের সদস্যদের লাশ নিয়ে কূল পেতে হবে না বলেও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারী পরিবারের ভাষ্য, একাধিকবার ফোন ও হুমকির কারণে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন তারা।

‘আমি এখন কোনো রাজনীতি করি না’

ব্যবসায়ী মাকসুদ চৌধুরী বলেন, তাঁকে একের পর এক ফোন করে হুমকি দেওয়া হয়েছে। হুমকির পর থেকে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। মাকসুদ বলেন, তিনি বর্তমানে কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন; ব্যবসা করেন। ফলে কারা কেন তাঁকে টার্গেট করে চাঁদা দাবি করছে, সেটি তাঁর কাছেও পরিষ্কার নয়।

তদন্তে পুলিশ

বায়েজিদ বোস্তামী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তফা কামাল বলেন, চাঁদা দাবি ও হুমকির ঘটনায় জিডি করা হয়েছে। পুলিশ ইতোমধ্যে বিষয়টি তদন্ত শুরু করেছে। হুমকিদাতাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর, কলের তথ্য এবং হুমকির ধরন বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। বিদেশি নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে কি না, নম্বরটির প্রকৃত ব্যবহারকারী কে এবং এর সঙ্গে স্থানীয় কোনো চক্রের যোগসূত্র আছে কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।

চট্টগ্রামে চাঁদাবাজির অভিযোগে ধারাবাহিক ঘটনা

চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে হোয়াটসঅ্যাপ ও মোবাইল ফোনে চাঁদা দাবির পর হামলা বা গুলি চালানোর অভিযোগ সামনে এসেছে। এর আগে গত ১১ আগস্ট নগরের হামজারবাগে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে একটি ভবনের ফটকে গুলি করার অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার আগে ভবন মালিকের ছেলেকে হোয়াটসঅ্যাপে অডিও বার্তা পাঠিয়ে এক ঘণ্টার মধ্যে ৫০ লাখ টাকা দেওয়ার আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছিল বলে মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়। পরে রাতে ভবনের ফটকে গুলির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করা হয়েছে।

এরও আগে গত ১৩ জুলাই দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বড় দিঘিরপাড় এলাকায় ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনের নির্মাণাধীন ভবনে ২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনাতেও একই ধরনের একটি চক্র জড়িত বলে অভিযোগ করা হয়েছিল।

অভিযোগের সত্যতা যাচাই করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় চাঁদাবাজির জন্য প্রথমে মোবাইল বা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে হুমকি এবং পরে হামলার অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে পৃথক ঘটনাগুলোর মধ্যে সাংগঠনিক বা প্রত্যক্ষ যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো তদন্তাধীন। এদিকে মাকসুদ চৌধুরীর বিরুদ্ধেও মোজাফফরনগর এলাকায় সাধারণ মানুষকে হুমকি দেওয়া, জমিজমা নিয়ে বিরোধে জড়ানোসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এবং কোনো মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে আইনগতভাবে প্রমাণিত দায় রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগকে হুমকির ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত করার সুযোগ নেই। পুলিশ বলছে, বর্তমান ঘটনায় কে বা কারা হুমকি দিয়েছে, তাদের উদ্দেশ্য কী এবং চাঁদা দাবির সঙ্গে কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সম্পৃক্ততা আছে কি না—তদন্ত শেষে তা স্পষ্ট হবে। অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকলে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।