সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামীণ ঐতিহ্য, গরুর হালে জমি চাষ এখন শুধুই স্মৃতি
সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা। আধুনিকতার ছোঁয়া, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দ্রুত উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার চিরচেনা গ্রামীণ ঐতিহ্য। একসময় উত্তরবঙ্গের গ্রামবাংলায় কৃষকের ঘরে ঘরে দেখা যেত গরুর হাল, কাঠের লাঙল ও জোয়াল। ভোরের আলো ফুটতেই কৃষক জোড়া গরু নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন মাঠের পথে। গরুর হালের টানে মাটির বুক চিরে তৈরি হতো নতুন ফসলের স্বপ্ন। সেই পরিচিত দৃশ্য এখন অনেকটাই অতীতের স্মৃতি।
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার সারপুকুর ইউনিয়নের একটি গ্রামীণ এলাকায় এখনও সেই পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন কৃষক জামাল হোসেন। আধুনিক কৃষিযন্ত্রের দাপটের মধ্যেও তিনি গরু দিয়ে জমি চাষ করছেন। তার হালের দৃশ্য যেন চোখের সামনে ফিরিয়ে আনে কয়েক দশক আগের গ্রামবাংলার কৃষিজীবনের চিত্র।
আরও পড়ুন: রূপগঞ্জে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছেই, আগস্টেই আক্রান্ত ৪৯ জন
কৃষক জামাল হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমি গরু দিয়েই জমি চাষ করে আসছি। আগে আশপাশের অনেক কৃষকই গরু দিয়ে জমি চাষ করতেন। এখন পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টর সহজলভ্য হওয়ায় গরুর হালের ব্যবহার অনেক কমে গেছে। তারপরও আমার কাছে গরু দিয়ে জমি চাষের বিষয়টি ঐতিহ্য ও অভ্যাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।’
গ্রামের প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় একটি কৃষক পরিবারের অন্যতম প্রধান সম্পদ ছিল গরু। জমি চাষ, মই দেওয়া, ধান মাড়াইসহ কৃষিকাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গরুর ব্যবহার ছিল অপরিহার্য। কৃষকের ঘরের গোয়ালঘরে একাধিক গরু থাকত। ভোরে ঘুম থেকে উঠে কৃষক গরুকে খাবার খাওয়াতেন, জোয়াল কাঁধে নিয়ে মাঠে যেতেন এবং দিনের বড় একটি সময় কাটাতেন কৃষিকাজে।
আরও পড়ুন: সিরাজগঞ্জে বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগ ডিলারদের বিরুদ্ধে
গরুর হালে জমি চাষ করতে সময় ও শ্রম দুটোই বেশি লাগত। একটি জমি চাষ করতে কয়েক দফা হাল দিতে হতো। এরপর মই দিয়ে জমি সমান করে বীজ বা চারা রোপণের উপযোগী করা হতো। এতে কৃষকের শারীরিক পরিশ্রম যেমন বেশি ছিল, তেমনি কৃষক, গবাদিপশু ও জমির মধ্যে গড়ে উঠেছিল এক নিবিড় সম্পর্ক।
তবে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণের ফলে সেই চিত্র দ্রুত বদলে গেছে। পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, রিপার, হারভেস্টারসহ বিভিন্ন আধুনিক কৃষিযন্ত্র কৃষকের সময় ও শ্রম অনেক কমিয়ে দিয়েছে। আগে যে জমি চাষ করতে দীর্ঘ সময় লাগত, আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে তা তুলনামূলকভাবে অল্প সময়েই চাষ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে কৃষকের কাছে গরুর হাল দিন দিন কম সুবিধাজনক হয়ে উঠছে।
কৃষকেরা বলছেন, বর্তমানে গরু পালন করাও আগের তুলনায় ব্যয়বহুল। গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধি, শ্রমিকের সংকট এবং কৃষিকাজে দ্রুততার প্রয়োজনীয়তার কারণে অনেক কৃষক গরু দিয়ে হালচাষ ছেড়ে যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেকেই গরুর হাল, কাঠের লাঙল কিংবা জোয়ালের ব্যবহার সরাসরি দেখার সুযোগও পাচ্ছে না।
শুধু কৃষিকাজের একটি পদ্ধতিই নয়, গরুর হাল ছিল গ্রামীণ সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্ষার কাদামাটিতে গরুর পায়ের শব্দ, কৃষকের হাতে লাঙল, মাঠের আল ধরে গরু নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য কিংবা শীতের কুয়াশা ভেদ করে ভোরে কৃষকের মাঠে যাওয়ার স্মৃতি—এসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গ্রামবাংলার মানুষের জীবন ও আবেগ।
একসময় হালচাষকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ সমাজে নানা ধরনের সামাজিক সম্পর্কও গড়ে উঠত। প্রতিবেশীরা একে অন্যের কাছ থেকে গরু ধার নিতেন, প্রয়োজনে হালচাষে সহযোগিতা করতেন। কৃষকেরা একে অপরের সঙ্গে শ্রম বিনিময় করতেন। সেই সহযোগিতা ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সংস্কৃতিও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার কারণে অনেকটাই কমে এসেছে।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, আধুনিক কৃষিযন্ত্র কৃষকের জন্য আশীর্বাদ। এতে সময় ও শ্রম কমে, উৎপাদন বাড়ে এবং কৃষিকাজ সহজ হয়। তবে এর পাশাপাশি গ্রামীণ ঐতিহ্যের হারিয়ে যাওয়া দিকগুলো সংরক্ষণ করাও প্রয়োজন। কারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এসব ঐতিহ্যই গ্রামবাংলার অতীত জীবনযাত্রার পরিচয় বহন করবে।
লালমনিরহাটসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় এখনও বিচ্ছিন্নভাবে গরু দিয়ে জমি চাষের দৃশ্য দেখা যায়। তবে আগের তুলনায় এর সংখ্যা অনেক কম। কোথাও শখ বা ঐতিহ্য ধরে রাখতে, আবার কোথাও ছোট জমি চাষের প্রয়োজনে কৃষকেরা এখনও গরুর হাল ব্যবহার করছেন।
কৃষিবিদদের মতে, কৃষির আধুনিকায়ন ও যান্ত্রিকীকরণ সময়ের দাবি। তবে একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী কৃষি সংস্কৃতি সংরক্ষণ করা গেলে তা গ্রামীণ ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থাকবে। পুরোনো কৃষি সরঞ্জাম, হাল-লাঙল, জোয়ালসহ গ্রামীণ কৃষিজীবনের নানা উপকরণ সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এসবের ইতিহাস তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
আজকের প্রজন্মের কাছে গরুর হালে জমি চাষ হয়তো কেবল একটি পুরোনো ছবি বা গল্প। কিন্তু প্রবীণ কৃষকদের কাছে এটি শুধু কৃষিকাজের একটি পদ্ধতি নয়—এটি তাদের শৈশব, যৌবন, পরিশ্রম, জীবনসংগ্রাম এবং অসংখ্য স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বাংলার মাটির এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।
আদিতমারীর মাঠে কৃষক জামাল হোসেনের গরুর হাল তাই নিছক জমি চাষের দৃশ্য নয়। এটি যেন সময়ের স্রোতে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ বাংলার একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি—যেখানে লাঙলের ফলা মাটিকে শুধু উর্বর করে না, একই সঙ্গে স্মৃতির পাতায় আঁকে বাংলার কৃষকজীবনের এক অনন্য ইতিহাস।





