প্রয়াণের ১৭ বছর পরও অমলিন মাইকেল জ্যাকসন, ৬৮তম জন্মদিন আজ
পপসংগীতের ইতিহাসে মাইকেল জ্যাকসনের মতো প্রভাবশালী শিল্পীর সংখ্যা খুবই কম। গান, নাচ, মঞ্চ পরিবেশনা ও নিজস্ব শিল্পীসত্তা দিয়ে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্ত তৈরি করেছিলেন তিনি। ২০০৯ সালে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার পরও তার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি। বরং গান, শো, অ্যালবাম ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মৃত্যুর পরও তার নাম ঘিরে তৈরি হয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। আজ ২৯ আগস্ট, পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের ৬৮তম জন্মদিন। ১৯৫৮ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গ্যারি শহরে জন্মগ্রহণ করেন মাইকেল জোসেফ জ্যাকসন।
ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, মৃত্যুর পর থেকে মাইকেল জ্যাকসনকে ঘিরে আয় হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শুধু ২০২৫ সালেই তার মৃত্যুর পরবর্তী আয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০৫ মিলিয়ন ডলার।
আরও পড়ুন: নেপালে হড়পা বান, নিরাপদে অপু বিশ্বাস ও ‘শিকার’ টিম
জন্মদিন উপলক্ষে মাইকেল জ্যাকসনের অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম পেজে জানানো হয়েছে, লাস ভেগাসে গত ১৩ বছরে ‘মাইকেল জ্যাকসন ওয়ান’ শোয়ের ৫ হাজারের বেশি প্রদর্শনী হয়েছে। ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত এসব শোর টিকিট বিক্রি চলবে।
সির্ক দ্যু সোলেইয়ের এই আয়োজনের মাধ্যমে মাইকেল জ্যাকসনের সংগীত ও মঞ্চ পরিবেশনার আবহ দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। জন্মদিন উপলক্ষে শোটির জমকালো মঞ্চ পরিবেশনার ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: মার্কিন কান্ট্রি মিউজিকের রানি ডলি পার্টন আর নেই
মাইকেল জ্যাকসনের জীবন ছিল সাফল্য ও বিতর্কে ভরা। তাকে ঘিরে নানা সময়ে নানা ধরনের গুঞ্জন ও আলোচনা হয়েছে। তবে নিজের শিল্পীসত্তাকে সবসময় এসব বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে চেয়েছেন তিনি।
এক পুরনো সাক্ষাৎকারে নিজের ত্বকের রঙ পরিবর্তন এবং তাকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন গুজব নিয়ে কথা বলেছিলেন মাইকেল। বিশেষ করে পেপসির বিজ্ঞাপনে তার ছোটবেলার চরিত্রে একজন শ্বেতাঙ্গ শিশুকে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন—এমন গুজবকে তিনি তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। মাইকেল বলেছিলেন, তিনি একজন কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান এবং নিজের পরিচয় ও বর্ণ নিয়ে তিনি গর্বিত।
ত্বকের রঙ হালকা হয়ে যাওয়া নিয়েও দীর্ঘদিন আলোচনা ছিল। এ বিষয়ে মাইকেল জানিয়েছিলেন, তিনি ত্বক ফর্সা করার জন্য ব্লিচ ব্যবহার করেননি; বরং তার ত্বকের একটি রোগের কারণে পিগমেন্টেশনে পরিবর্তন এসেছিল। মেকআপের মাধ্যমে তিনি ত্বকের দাগ ঢাকার চেষ্টা করতেন।
শিল্প নিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে মাইকেল এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, একজন শিল্পী কার সঙ্গে বাইরে গেলেন, তার চেয়ে তার শিল্পীসত্তা, অনুপ্রেরণা ও সৃজনশীলতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ১০ ভাইবোনের মধ্যে অষ্টম সন্তান ছিলেন মাইকেল জ্যাকসন। মাত্র ছয় বছর বয়সে ভাইদের সঙ্গে ‘জ্যাকসন ফাইভ’ ব্যান্ডের প্রধান গায়ক হিসেবে সংগীতজগতে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। শৈশবে বাবার কঠোর শাসনের মধ্যে বড় হতে হয়েছিল তাকে। সেই কঠোর পরিবেশ তার ব্যক্তিজীবনে নানা প্রভাব ফেললেও পরবর্তী সময়ে মঞ্চে তার অসাধারণ শৃঙ্খলা ও পারফরম্যান্স দক্ষতা বিশ্বকে মুগ্ধ করে।
একক শিল্পী হিসেবে একের পর এক সফল অ্যালবাম প্রকাশ করে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেন মাইকেল। ‘অফ দ্য ওয়াল’, ‘থ্রিলার’, ‘ব্যাড’, ‘ডেঞ্জারাস’ ও ‘হিস্টরি’—তার ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য অ্যালবামগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর মধ্যে ‘থ্রিলার’ সংগীত ইতিহাসের অন্যতম সফল এবং সর্বাধিক বিক্রীত অ্যালবাম হিসেবে স্বীকৃত।
শুধু সংগীত নয়, নৃত্যেও মাইকেল জ্যাকসন ছিলেন এক অনন্য শিল্পী। তার বিখ্যাত ‘মুনওয়াক’ নাচের মুদ্রা বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। মঞ্চে তার নাচ, পোশাক, অঙ্গভঙ্গি ও পরিবেশনা পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য শিল্পীকে প্রভাবিত করেছে। ক্যারিয়ারে তিনি পেয়েছেন ১৩টি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড এবং ২৬টি আমেরিকান মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা।
তার রেকর্ড বিক্রির সংখ্যাও বিস্ময়কর। বিশ্বজুড়ে তার ৫০ কোটিরও বেশি রেকর্ড বিক্রি হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়। সংগীতের বাইরেও মানবিক কর্মকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততা ছিল। দাতব্য কাজে তিনি প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার দান করেছেন বলে তথ্য রয়েছে।
২০০৯ সালের ২৫ জুন মাত্র ৫০ বছর বয়সে মাইকেল জ্যাকসনের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সংগীত, নাচ ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে তার প্রভাব এখনও দৃশ্যমান।
মাইকেল জ্যাকসন হয়তো নেই, কিন্তু তার গান, নাচ এবং সৃষ্টিশীলতার প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে আছে। আর জন্মদিনে বিশ্বের কোটি কোটি ভক্তের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা যেন আবারও মনে করিয়ে দেয়—পপসম্রাটের রাজত্ব শেষ হয়নি





