শিক্ষার উন্নয়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা
১। ভূমিকা
পৃথিবী যদি বদলাতে চাও, শিক্ষাই সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র”- নেলসন ম্যান্ডেলা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জাতির মূল ভিত্তিকে সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশ ও জাতির শৃঙ্খলা ফিরে আনা, নৈতিক শিক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, প্রযুক্তিগত শিক্ষা এবং সামরিক শিক্ষা বিকাশে অবিরত ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। বাংলাদেশের উন্নতি, অগ্রগতি এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের জন্য অবশ্যই নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আবশ্যকতা রয়েছে। সার্বিকভাবে দেশকে এগিয়ে নিতে প্রথমেই প্রয়োজন শিক্ষার উন্নয়ন এবং বিকাশ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু সামরিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ না থেকে বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষা বিস্তার উন্মুক্তকরণের মাধ্যমে দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দিচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, পেশাগত শিক্ষা, প্রকৌশল শিক্ষা এবং দুর্যোগকালীন শিক্ষা। এছাড়া পার্বত্য অঞ্চলে অবহেলিত বিশাল জনগোষ্ঠীর শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
আরও পড়ুন: শুধু মতামত নয়, প্রয়োজন জ্ঞান, নেতৃত্ব ও কর্ম
বাংলাদেশের সংবিধানে শিক্ষা সংক্রান্ত প্রধান ধারা “অনুচ্ছেদ-১৭” অনুযায়ী অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার নিশ্চয়তা নিশ্চিতকল্পে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, শিশুকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রদান এবং নিরক্ষরতা দূরীকরণে দেশ ও জাতির প্রয়োজনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ও সুশিক্ষিত জনশক্তি তৈরি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো নাগরিকের প্রবেশাধিকারে ধর্ম বা বর্ণের কারণে বৈষম্য না রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে শিক্ষাকে একটি বাধ্যতামূলক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করে শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
২। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বিস্তারে সেনাবাহিনীর উদ্যোগ। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সেনাবাহিনীর সবচেয়ে প্রানিধানযোগ্য কর্তব্য। কিন্তু সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি জনগণকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার দায়িত্বও নিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। শিক্ষাকে একটি জাতির অগ্রগতি ও সার্বিক কল্যাণের ভিত্তিমূল ধরা হয়। শিক্ষা মানুষের চিন্তাশক্তি, নৈতিকতা ও নেতৃত্বগুণের বিকাশ ঘটায় এবং একজন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতে দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। একটি দেশের রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার জনগণের শিক্ষার মান, নৈতিকতা এবং দেশপ্রেমের উপর। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এ জাতিকে সুশিক্ষিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সুসংগঠিত প্রজন্ম হিসেবে গড়ে তুলে দেশকে উন্নয়নের শিখরে পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর। এই লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত স্কুল ও কলেজসমূহ জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশে বেকারত্বের ‘নীরব বিস্ফোরণ’: প্রবৃদ্ধির আড়ালে কর্মসংস্থানের গভীর সংকট
মানসম্মত শিক্ষা বিস্তারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর সদস্যদের পেশাগত প্রশিক্ষণের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বর্তমানে সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত হচ্ছে ১২টি ক্যাডেট কলেজ এবং ৪৪টি ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এছাড়াও সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত হচ্ছে ১৯টি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও কলেজ। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাসমূহে শীর্ষস্থান বজায় রাখছে। পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সারাদেশে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সামরিক-অসামরিক পরিবারের ছেলেমেয়েরা উন্নত শিক্ষা ও দীক্ষা লাভের সুযোগ পাচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ফলাফল বেশ সন্তোষজনক ও শিক্ষা ব্যয়ও তুলনামূলক কম। সেনাবাহিনী পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পেলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রাইভেট শিক্ষক ও কোচিংয়ের পেছনেও ছুটতে হয় না। সারাদেশের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের আবাসিক ও অনাবাসিক এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফলের জন্য প্রতিবারই প্রশংসিত হচ্ছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত ক্যাডেট কলেজগুলো প্রতিবারই সব বোর্ডেই শীর্ষস্থান ধরে রাখছে। যথাযথ অধ্যবসায় ও সুশৃঙ্খল নিয়ম-কানুন মেনে চলাই তাদের এই সাফল্যের মূলমন্ত্র। দেশে শুধু সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা বিস্তারে কাজ করে থেমে থাকেনি সেনাসদস্যরা বরং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা যুগোপযোগী আধুনিক শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যেও কাজ করছে। দেশজুড়ে ক্যাডেট কলেজ, ক্যান্টনমেন্ট স্কুল এন্ড কলেজ, পাবলিক স্কুল পরিচালনার পাশাপাশি চিকিৎসা শিক্ষাদান, প্রযুক্তিগত শিক্ষা, মেডিকেল শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা এবং বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের পাঠদানে অর্থাৎ শিক্ষা ব্যবস্থার সকল শাখায় অনন্য ভূমিকা রাখছে সেনাবাহিনী। চতুর্দিকে বেড়ে চলেছে সুনাম। উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক দেশ জুড়ে ০৬টি মেডিক্যাল কলেজ, ০১টি বিশ্ববিদ্যালয়, ০৫টি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ০২টি ইনস্টিটিউট এবং ১৩টি বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (প্রয়াস) পরিচালিত হচ্ছে।
৩। প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় শিক্ষা সহায়তা। প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং শিক্ষা সহায়তা প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সর্বপ্রথম নজর দেয় যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর। বর্তমান সময়ে সেনা সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে প্রত্যন্ত ও দূর্গম পার্বত্য অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন হয়েছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতাবিশিষ্ট সড়ক খানচী-আলীকদম সড়ক, চিম্বুক-থানচি সড়ক, বাঙ্গালহালিয়া-রাজস্থলী সড়ক, বান্দরবান-বাঙ্গালহালিয়া-চন্দ্রঘোনা-ঘাগড়া সড়ক, খাগড়াছড়ি-দিঘীনালা-বাঘাইহাট সড়ক, দিঘীনালা-ছোটমেরণ-চঙ্গরাছড়ি-লংগদু সড়ক, বাঘাইছড়ি-মাসালং-সাজেক সড়ক ও দীঘিনালা-মারিশ্যা সড়ক সেনাবাহিনী কর্তৃক নির্মাণ করার কারণে পাহাড়ি জনপদে এসেছে উন্নয়ন, শিক্ষার বিস্তার ও প্রাণের স্পন্দন। যার ফলে সে অঞ্চলগুলোতে পূর্বের চাইতে ব্যাপক হারে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি বর্তমানে পার্বত্য দূর্গম এলাকায় সেনাবাহিনী কর্তৃক উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে।
৪। কারিগরি ও পেশাগত শিক্ষা উন্নয়নে অবদান। অর্পিত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশজুড়ে বিস্তৃত কারিগরি, পেশাগত শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে যশোর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, বগুড়া ও রংপুর দেশের ৫টি সেনানিবাসে ‘আর্মি মেডিকেল কলেজ’ যাত্রা শুরু করে। ২০১৫ সালে কলেজগুলোর পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা কার্যক্রম এবং ক্যাম্পাসেরও উদ্বোধন করা হয়। ৫টি মেডিকেল কলেজে ৫০ জন করে শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। ২০১৯ সালে এ ৫টি মেডিকেল কলেজ থেকে প্রথমবারের মতো চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি দেয়া হয়। আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ এবং আর্মি মেডিকেল কলেজ সশস্ত্র বাহিনীর আলাদা দুটি প্রতিষ্ঠান। দুটি প্রতিষ্ঠান থেকেই সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির সন্তানদের চিকিৎসা শিক্ষা দেয়া হয়।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্যও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘প্রয়াস’ চালু করা হয়েছে। ‘বিশেষ শিশু বিশেষ অধিকার’ এই স্লোগানকে ধারণ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের মানসিক বিকলতা, অটিজম, বুদ্ধি, বাক, শ্রবণ, দৃষ্টি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী সম্বলিত বিশেষ শিশুদের সেবা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাভাবিক শিশুদের ন্যায় উপযোগী করে গড়ে তুলছে।
এছাড়াও, সেনাবাহিনীর আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট (অডঞ) কর্তৃক পরিচালিত ট্রাস্ট টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (ঞঞঞও) কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে সাধারণ নাগরিক ও সেনাসদস্যদের জন্য ইলেকট্রিক্যাল হাউস ওয়ারিং, মোবাইল ফোন সার্ভিসিং, মোটরসাইকেল রিপেয়ারিং, কম্পিউটার অফিস অ্যাপ্লিকেশন, অটোক্যাড (২উ ্ ৩উ), এবং রেফ্রিজারেশন ও এয়ার কন্ডিশনিং ইত্যাদির উপর বিভিন্ন স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী কোর্স পরিচালনা করছে। উচ্চতর প্রকৌশল ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার জন্য এমআইএসটি (গওঝঞ), মিরপুর সেনানিবাসে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটি সিভিল, মেকানিক্যাল এবং এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংসহ উন্নত কারিগরি শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বর্তমানে বিবেচিত। বিএইউইটি (ইঅটঊঞ), নাটোরের কাদিরাবাদ সেনানিবাসে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটিতে সিভিল, সিএসই, ইইই এবং আইসিই-তে বিএসসি করার সুযোগ রয়েছে। বিএইউএসটি (ইঅটঝঞ), সৈয়দপুর, কুমিল্লা ও খুলনায় অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কম্পিউটার সায়েন্স, আইসিটি এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ও প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়াও ইতিমধ্যে পরিচালিত স্কুল কলেজ সমূহে সাংবাদিক ক্লাব, ইংরেজি ভাষা শিক্ষা কোর্স, কম্পিউটার ক্লাব ইত্যাদি বিষয় চালু করে সামরিক ও বেসামরিক পর্যায়ে প্রশংসিত হচ্ছে।
৫। ডিজিটাল শিক্ষা ও আধুনিকায়ন। বর্তমানে ডিজিটাল শিক্ষা এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কেবল বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দক্ষতা বৃদ্ধিই নয় বরং দেশকে সার্বিক ডিজিটাল রূপান্তরেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আধুনিক শিক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহৃত করে প্রযুক্তি-নির্ভর শিক্ষা প্রদানে ব্যাপক উন্নয়ন করছে। আধুনিক বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের পর্যায়ে নিয়ে যাবার লক্ষ্যে সরকারের নির্দেশনায় ১৯৯৮ সালে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অগ্রসরমান বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা এবং আধুনিক জ্ঞান চর্চার জন্য ২০১৩ সালে মিরপুর সেনানিবাসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)। এছাড়াও কারিগরি বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্র ও ব্যবসায় প্রশাসন বিষয়ে শিক্ষা প্রসারিত করার লক্ষ্যে কুমিল্লা, সৈয়দপুর ও কাদিরাবাদ সেনানিবাসে তিনটি আর্মি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাভার ও সিলেট সেনানিবাসে আর্মি ইন্সটিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (অওইঅ) নামে দুইটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
৬। খেলাধুলার সাথে শিক্ষার যুগপথ কার্যক্রম। আর্মি স্পোর্টস এন্ড ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (অঝচঞঝ) এ বিভিন্ন খেলাধুলা সংক্রান্ত বিষয়ে উন্নততর প্রাতিষ্ঠানিক এবং পুরাকৌশলগত প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এছাড়াও ইকঝচ (বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান)তে দেশের প্রান্তিক সন্তানেরা পড়াশোনা করতে পারে- যেখানে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে পছন্দসই যে কোন খেলাধুলাকে নিবীড়ভাবে অঙ্গীভূত করা হয়েছে। খেলাধুলার সাথে প্রচলিত শিক্ষার এমন যুগপত কার্যক্রমের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বিরল। বাংলাদেশের অনেক কৃতি খেলোয়াড় যারা বিশ্বের দরবারে আমাদের দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন তাদের বেশিরভাগ/উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত ইকঝচ থেকে শিক্ষা লাভ করেছেন। মূল কার্যক্রম ঢাকার সাভার হতে পরিচালিত হলেও সকল বিভাগীয় শহরগুলোতে এই বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শাখা রয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই ইকঝচ’র শাখা আরও বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে।
৭। সামাজিক প্রভাব ও মানব সম্পদ উন্নয়ন। সামাজিক প্রভাব বিস্তার এবং মানব সম্পদ উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি হলো মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা, কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি, নারী শিক্ষার অবদান, নারীর ক্ষমতায়ন, সকল স্তরের শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ ইত্যাদি। শিক্ষার ক্ষেত্রে অবদান রাখার মাধ্যমে দেশের জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী প্রযুক্তিগত কারিগরি জ্ঞান সম্পন্ন মানব সম্পদ তৈরি, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বেকারত্ব দূরীকরণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
সুশিক্ষা ও সামাজিক শৃঙ্খলার উন্নয়ন তথা মানব সম্পদের উন্নয়ন করে বেকারত্ব হ্রাস করছে, যার ফলে সামাজিক সংঘাত কমছে, সামগ্রিক নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক সংহতি বৃদ্ধির মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে এবং আইনের শাসন ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হচ্ছে। দক্ষ মানব সম্পদ ভৌত সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে দেশের জাতীয় আয় ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিতে সাহায্য করে, যা উন্নত মানব সম্পদ এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনের মূল চাবিকাঠি।
৮। চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয়। শিক্ষা খাতে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ইতিবাচক হলেও মান বজায় রেখে সম্প্রসারণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বেসামরিক-সামরিক ভারসাম্য রক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে আরও বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণে ভবিষ্যতে আরো গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। সরকারী-বেসরকারী অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সমন্বিত উদ্যোগ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হতে পারে।
৯। উপসংহার। মানসম্পন্ন শিক্ষা একটি জাতির অগ্রগতির মূলভিত্তি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নয়, বরং শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমেও একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে কারিগরি, চিকিৎসা ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার প্রতিটি স্তরে সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত প্রতিষ্ঠানসমূহ দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে অনন্য মাত্রা সংযোজন করেছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য ‘প্রয়াস’-এর মতো উদ্যোগ এবং দূর্গম এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে সেনাবাহিনী একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
পার্বত্য অঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ স্থাপন এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে সেনাবাহিনী শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত করেছে, যা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক হচ্ছে। এছাড়া, শিক্ষার সাথে খেলাধুলার সংযোগের মাধ্যমে সেনাবাহিনী দেশের সুনাম দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে পৌঁছে দিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা রাখছে। ফলে, শিক্ষাক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর এই নিরলস প্রচেষ্টা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করছে এবং একটি উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকার ও জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত এসব শিক্ষা কার্যক্রম দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলতে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দেশের সার্বিক উন্নয়নের গর্বিত ও আনন্দিত অংশীদার হলো সেনাবাহিনী।
লেখক পরিচিতি: বিএ-৫৯৪৭ কর্নেল মোহাম্মদ সুরুজ মিয়া, বিজিবিএম, পিএসসি গত ০৮ জানুয়ারি ১৯৭৫ সালে নোয়াখালী জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি গত ৩০ ডিসেম্বর ১৯৯৭ তারিখে বাংলাদেশ মিলিটারী একাডেমীতে যোগদান করেন এবং ০২ ডিসেম্বর ১৯৯৯ তারিখে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অফিসার পদে ৪১তম দীর্ঘমেয়াদী কোর্সের সাথে সাঁজোয়া কোরে কমিশন প্রাপ্ত হন। তিনি চাকুরী জীবনে সেনাবাহিনীর ৯ বেঙ্গল ল্যান্সার্স, খোলাহাটিতে বিভিন্ন নিযুক্তিতে, নীলডুমুর ব্যাটালিয়ন (১ বিজিবি), রামগড় ব্যাটালিয়ন (৩৩ বিজিবি), কুমিল্লা ব্যাটালিয়নে (১১ বিজিবি), এ্যাডজুটেন্ট হিসেবে, পিজিআর, ঢাকায় কোম্পানী উপ অধিনায়ক হিসেবে, ১২ ল্যান্সার্স ঘাটাইলে স্কোয়াড্রন কমান্ডার হিসেবে, এএসইউ, রাজেন্দ্রপুরে অফিসার্স কমান্ডিং হিসেবে, র্যাব-১২, নারায়ণগঞ্জে কোম্পানী কমান্ডার হিসেবে, র্যাব-৪, মিরপুরে উপ অধিনায়ক হিসেবে, র্যাব-৬, খুলনায় উপ অধিনায়ক হিসেবে এবং এসিসিএন্ডএস, বগুড়ায় এএএন্ডকিউএমজি (রেকর্ড) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি গত ১৬ এপ্রিল ২০২০ তারিখে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী হতে প্রেষণে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এর চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৫৩ বিজিবি) এর অধিনায়ক হিসেবে, ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স গ্রুফ, রংপুর ও চট্টগ্রামে গ্রুপ কমান্ডার হিসেবে এবং পরবর্তীতে বিজিবি রিজিয়ন সদর দপ্তর, চট্টগ্রামে ডেপুটি রিজিয়ন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন ব্যানব্যাট-৩ (আনমিস), সুদানে কোম্পানী উপ-অধিনায়ক হিসেবে এবং ব্যানসিগ-১৪ (মনুস্কো), কঙ্গো’তে চীফ জি-২ (নর্দান সেক্টর) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি গত ০৯ অক্টোবর ২০২৫ তারিখ হতে বিজিবি, সেক্টর সদর দপ্তর, ঠাকুরগাঁও এর সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি চাকুরি জীবনে অত্যাবশ্যকীয় কোর্স সমূহ ছাড়াও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কোর্স সম্পন্ন করেন এবং বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত ও এক কন্যা সন্তানের জনক।





