নিষ্পাপ মুখগুলোর নীরব আর্তনাদ ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন
কত সুন্দর, কত নিষ্পাপ এই মুখগুলো- এই ধরনের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে কোনো স্বাভাবিক মানুষের পক্ষেই নির্লিপ্ত থাকা সম্ভব নয়। শিশুর হাসি, তাদের চোখের সরলতা আর স্বপ্নে ভরা সেই ছোট ছোট জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবনের সবচেয়ে নির্মল অধ্যায়কে। কিন্তু সেই নিষ্পাপ জীবনেরই যখন অকাল সমাপ্তি ঘটে সহিংসতা, নির্যাতন কিংবা হত্যার মাধ্যমে, তখন শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজই এক গভীর নৈতিক সংকটে পড়ে যায়। এই মৃত্যু শুধু একটি খবর হয়ে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা নয়, বরং প্রতিটি ঘটনার ভেতরে লুকিয়ে থাকে রাষ্ট্র, সমাজ এবং আমাদের বিবেকের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন- আমরা কি সত্যিই আমাদের শিশুদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলতে পেরেছি?
এই প্রশ্নটা নতুন না। সমাজ যত আধুনিক হচ্ছে, যত প্রযুক্তি এগোচ্ছে, ততই যেন এই প্রশ্ন আরও ভারী হয়ে উঠছে। কারণ উন্নতির গল্পের পাশে পাশে ভয়, অনিরাপত্তা আর সহিংসতার ঘটনাও একইভাবে জায়গা করে নিচ্ছে। কোনো গ্রাম বা শহরে যখন একটি শিশুর ওপর নির্যাতন বা হত্যার ঘটনা ঘটে, তখন সেটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকে না। তা পুরো সমাজের ভেতরে ঢেউ তোলে। কিছুদিন মানুষ কথা বলে, প্রতিবাদ হয়, মিডিয়ায় আলোচনা চলে, তারপর ধীরে ধীরে সব থেমে যায়। কিন্তু ভুক্তভোগী পরিবারের জীবনে সেই ঘটনা কখনো থামে না। তাদের জন্য সময় আর আগের মতো চলে না।
আরও পড়ুন: নাম পরিবর্তনের কবলে দেশ
সমাজে অপরাধ নতুন কিছু নয়। কিন্তু অপরাধের সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তার বিচার নিশ্চিত করা। বিচার যদি দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং দৃশ্যমান না হয়, তাহলে সমাজে একটি ভয়ংকর বার্তা যায়। সেই বার্তা হলো- অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়। আর এই ধারণা তৈরি হলে অপরাধের ঝুঁকি কমে না, বরং বাড়ে। মানুষ তখন আইনকে ভয় নয়, বরং ফাঁকি দেওয়ার একটি ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে শুরু করে। এখানেই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি হয়।
শিশুদের ওপর সহিংসতা এই বাস্তবতাকে আরও তীব্র করে তোলে। কারণ শিশুদের কোনো প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই, তারা অসহায়। তাদের নিরাপত্তা পুরোপুরি নির্ভর করে প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর—পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের ওপর। কিন্তু যখন সেই সুরক্ষার জায়গাগুলোই ভেঙে পড়ে, তখন ভয়টা বহুগুণে বেড়ে যায়। শুধু একটি পরিবার নয়, আশেপাশের অনেক পরিবারও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। বাবা-মায়েরা সন্তানদের বাইরে পাঠাতে দ্বিধা করতে শুরু করেন, স্বাভাবিক জীবনযাপন বাধাগ্রস্ত হয়। এভাবে ধীরে ধীরে একটি সমাজের ভেতরে অদৃশ্য এক অনাস্থা তৈরি হয়।
আরও পড়ুন: আইনের শাসনের সংকট: অপরাধ যখন সমাজের প্রতিচ্ছবি
এই অনাস্থার পেছনে বিচার ব্যবস্থার ভূমিকা অনেক বড়। আমাদের বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক মামলা দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকে। তদন্তে দেরি হয়, সাক্ষ্য সংগ্রহে জটিলতা তৈরি হয়, আর প্রক্রিয়ার ধীরগতি ন্যায়বিচারকে অনেক সময় দূরের বিষয় করে তোলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সাক্ষীদের নিরাপত্তাহীনতা। অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষীরা ভয় পান, চাপে পড়েন বা পিছু হটেন। ফলে একটি শক্ত মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে। বিচার তখন শুধু বিলম্বিত নয়, অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধও হয়ে যায়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশাসনিক সক্ষমতা। প্রযুক্তির ব্যবহার, ফরেনসিক বিশ্লেষণ, তথ্যভিত্তিক তদন্ত- এসব আধুনিক পদ্ধতি অনেক উন্নত দেশে বিচার প্রক্রিয়াকে দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্য করেছে। আমাদের ক্ষেত্রেও সেই সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কারণ অপরাধ এখন আর আগের মতো সরল নয়, বরং অনেক বেশি জটিল এবং পরিকল্পিত।
গণমাধ্যম এই পুরো প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো ঘটনা ঘটলে মিডিয়া সেটিকে সামনে আনে, সমাজকে জানায়, প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই প্রভাব আরও দ্রুত এবং বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু এর একটি সীমাবদ্ধতাও আছে। অনেক সময় কোনো ঘটনা কিছুদিন আলোচনায় থাকে, তারপর নতুন ঘটনার ভিড়ে হারিয়ে যায়। অথচ বিচার প্রক্রিয়া তখনো শেষ হয়নি। ভুক্তভোগীর পরিবার তখনো অপেক্ষায় থাকে, কিন্তু সমাজের মনোযোগ সরে যায়।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো ধারাবাহিকতা এবং দায়িত্ববোধ। বিচার শুধু আদালতের কাজ নয়, এটি একটি সামগ্রিক সামাজিক অঙ্গীকার। রাষ্ট্র, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষ- সবাই যদি নিজেদের জায়গা থেকে দায়িত্বশীল না হয়, তাহলে ন্যায়বিচার শুধু একটি ধারণা হয়ে থেকে যায়।
অন্যদিকে সামাজিক সচেতনতা এই জায়গায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবার যদি শিশু সুরক্ষার বিষয়ে আরও সচেতন হয়, স্কুল যদি নিরাপত্তা নিয়ে আরও সক্রিয় হয়, এবং স্থানীয় সমাজ যদি একে অপরের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে অনেক ঘটনা আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। কারণ প্রতিটি অপরাধ ঘটার আগে কিছু না কিছু সংকেত থাকে, যা অনেক সময় আমরা উপেক্ষা করি।
এখন প্রশ্ন আসে, সমাধান কোথায়? সমাধান একক কোনো জায়গায় নেই। এটি একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া। তদন্ত ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে হবে, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে, বিচার প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করতে হবে এবং বিশেষ করে শিশু নির্যাতন ও গুরুতর সহিংসতার মামলাগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সাক্ষী সুরক্ষার বিষয়টি শক্তিশালী করতে হবে, যাতে মানুষ সত্য বলার জন্য নিরাপদ বোধ করে।
একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং বিচার বিভাগের মধ্যে সমন্বয় আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। অনেক সময় এই দুই স্তরের মধ্যে দূরত্ব বা সমন্বয়হীনতা পুরো প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। এই জায়গায় সংস্কার জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাষ্ট্রের ইচ্ছাশক্তি। একটি রাষ্ট্র যদি সত্যিই চায়, তাহলে ন্যায়বিচারকে দ্রুত এবং কার্যকর করা সম্ভব। এটি শুধু প্রযুক্তি বা কাঠামোর বিষয় নয়, এটি একটি অঙ্গীকারের বিষয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সহজ কিন্তু গভীর- আমরা কি এমন একটি সমাজ তৈরি করতে পারব, যেখানে কোনো নিষ্পাপ মুখ আর অকালে হারিয়ে যাবে না? যেখানে কোনো পরিবারকে আর সন্তানের নিথর দেহ নিয়ে বাঁচতে হবে না? যেখানে ন্যায়বিচার শুধু আশ্বাস নয়, বাস্তবতা হবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই আমাদের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে। আমাদের নিরাপত্তা, আমাদের ন্যায়বোধ, আর আমাদের মানবিকতার মানচিত্র শেষ পর্যন্ত এই উত্তরেই নির্ধারিত হবে।
লেখক: কলামিস্ট ও গণমাধ্যমকর্মী।





