বুর্জোয়া রাজনীতি: রাষ্ট্র কার, স্বার্থ কার?

Sadek Ali
লেখক: এম এ মতিন
প্রকাশিত: ৯:০১ পূর্বাহ্ন, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১:৫৬ অপরাহ্ন, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

জনসেবার রাজনীতি যখন অর্থ, প্রভাব ও ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতায় বন্দী হয়

রাজনীতি রাষ্ট্র পরিচালনার কৌশলমাত্র নয়; এটি সম্পদ বণ্টন, অধিকার প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং সমাজে ক্ষমতার সম্পর্ক নির্ধারণের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। কিন্তু রাজনীতি যখন জনকল্যাণের পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং ক্ষমতার সুবিধা ভোগের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—রাষ্ট্র কি জনগণের স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে, নাকি জনগণের নামে পরিচালিত রাষ্ট্র ক্রমশ প্রভাবশালী একটি শ্রেণির স্বার্থরক্ষার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে?

আরও পড়ুন: উৎসবের রং বদলেছে, বদলেছি কি আমরা?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রশ্নটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর রাষ্ট্রের উন্নয়ন, অবকাঠামো, প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ নিয়ে বহু সাফল্যের দাবি রয়েছে। অথচ সুশাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং আইনের শাসন নিয়ে মানুষের উদ্বেগও অব্যাহত। রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন যদি রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক চরিত্র পরিবর্তন করতে না পারে, তাহলে ক্ষমতার পালাবদল আর কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র সংস্কার এক বিষয় নয়।

এই বাস্তবতা থেকেই বুর্জোয়া রাজনীতির প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রকৃত মূল্যায়ন নেতৃত্বের পরিচয় দিয়ে নয়, বরং রাষ্ট্রের নীতি ও সম্পদ কার স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা দিয়ে করতে হয়।

আরও পড়ুন: সামরিক নেতৃত্বে নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব-বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট

বুর্জোয়া রাজনীতি: তত্ত্ব ও বাস্তবতার ব্যবধান

মার্কসবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতিতে ‘বুর্জোয়া’ বলতে প্রধানত উৎপাদনের উপকরণ, পুঁজি ও সম্পত্তির মালিক শ্রেণিকে বোঝানো হয়। এই তাত্ত্বিক কাঠামোতে রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করা হয় অর্থনৈতিক ক্ষমতা, শ্রেণিস্বার্থ এবং সম্পদ বণ্টনের সম্পর্কের আলোকে। প্রশ্ন তোলা হয়—যে শ্রেণি অর্থনীতিতে প্রভাবশালী, সে কি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে?

এখানে একটি পার্থক্য স্পষ্ট করা জরুরি। বেসরকারি উদ্যোগ, ব্যক্তিগত সম্পত্তি, শিল্পায়ন কিংবা ব্যবসায়িক সাফল্য নিজে কোনো রাজনৈতিক অপরাধ নয়। একটি আধুনিক অর্থনীতির বিকাশে উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হয় তখন, যখন অর্থনৈতিক সাফল্য রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপান্তরিত হয়, রাজনৈতিক ক্ষমতা বিশেষ অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করে এবং সেই সুবিধা আবার রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর কাজে ব্যবহৃত হয়।

এভাবেই গড়ে উঠতে পারে একটি স্বার্থের চক্র—অর্থ থেকে রাজনৈতিক প্রভাব, রাজনৈতিক প্রভাব থেকে নীতিগত সুবিধা, আর নীতিগত সুবিধা থেকে আরও অর্থ ও ক্ষমতা।

এটি বুর্জোয়া রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনামূলক দিক। এখানে বিতর্কের বিষয় ধনী হওয়া নয়; বিতর্কের বিষয় হলো, সম্পদ কি রাষ্ট্রের নিয়মকে প্রভাবিত করার অসম ক্ষমতা প্রদান করছে? বাজারে প্রতিযোগিতা কি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কাছে পরাজিত হচ্ছে? সাধারণ নাগরিকের অধিকার কি প্রভাবশালীদের সুবিধার তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ছে?

রাষ্ট্র যদি সবার জন্য সমান নিয়ম প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অর্থনৈতিক বৈষম্য একসময় রাজনৈতিক বৈষম্যেও রূপ নিতে পারে।

রাজনীতিতে অর্থের আধিপত্য: যোগ্যতা কোথায়?

গণতন্ত্রের একটি মৌলিক প্রতিশ্রুতি হলো, নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার তার সম্পদের পরিমাণের ওপর নির্ভর করবে না। একজন নাগরিকের রাজনৈতিক মতামত, নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা কিংবা জনসেবার সামর্থ্য তার ব্যাংক হিসাব দিয়ে নির্ধারিত হওয়ার কথা নয়।

বাস্তবে নির্বাচনী প্রচার, দলীয় সংগঠন পরিচালনা এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের জন্য অর্থের প্রয়োজন হয়। কিন্তু নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যয় যখন এত বেশি হয়ে ওঠে যে সাধারণ পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ, শ্রমজীবী প্রতিনিধি কিংবা আর্থিকভাবে সীমিত অথচ যোগ্য নাগরিকদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের কাঠামোই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

সমস্যাটি শুধু নির্বাচনে অর্থ ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দলীয় মনোনয়ন, সাংগঠনিক পদ, নীতিনির্ধারণী পরিসরে প্রবেশ এবং ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক সামর্থ্য যদি অনানুষ্ঠানিক যোগ্যতায় পরিণত হয়, তাহলে রাজনীতি ক্রমশ নাগরিকের উন্মুক্ত ক্ষেত্র থেকে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রিত পরিসরে সংকুচিত হতে পারে।

এখানে একটি মৌলিক যুক্তি রয়েছে: যে ব্যবস্থায় রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের জন্য অর্থ অপরিহার্য হয়ে ওঠে, সেই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তও অর্থের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।

তবে এই ঝুঁকিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। নির্বাচনী ব্যয়ের নিরীক্ষা, দলীয় অর্থায়নের উৎস, প্রার্থীদের সম্পদ বিবরণী, মনোনয়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে স্বার্থের সংঘাতের তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমেই সমস্যার প্রকৃত ব্যাপ্তি নিরূপণ করা সম্ভব। অভিযোগ নয়, প্রমাণ ও জবাবদিহিই হওয়া উচিত সংস্কারের ভিত্তি।

রাষ্ট্র কি জনস্বার্থের রক্ষক, নাকি বিশেষ সুবিধার বণ্টনকারী?

রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো আইন প্রয়োগে সমতা নিশ্চিত করা, জনসম্পদ রক্ষা করা এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুযোগের ন্যায্য পরিবেশ সৃষ্টি করা। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি দলীয় আনুগত্য, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা বিশেষ গোষ্ঠীর প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে, তাহলে আইন ও নীতির নিরপেক্ষতা দুর্বল হয়ে যায়।

সরকারি ক্রয়, উন্নয়ন প্রকল্প, ব্যাংকঋণ, ভূমি বরাদ্দ, কর-সুবিধা, লাইসেন্স প্রদান এবং সরকারি নিয়োগ—এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব থাকলে জনসম্পদ অপচয়, প্রতিযোগিতা সংকুচিত হওয়া এবং অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ঝুঁকি মূল্যায়ন কিংবা ঋণ আদায়ে বৈষম্যের অভিযোগ গুরুতর উদ্বেগের জন্ম দেয়। কারণ ব্যাংকের অর্থ কেবল কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; আমানতকারী, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং বৃহত্তর অর্থনীতির সঙ্গে এর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। ঋণ বিতরণে যোগ্যতা ও ঝুঁকির পরিবর্তে প্রভাব কাজ করলে তার মূল্য শেষ পর্যন্ত বহন করতে পারে সাধারণ আমানতকারী ও অর্থনীতি।

একইভাবে উন্নয়ন প্রকল্পের মূল্যায়ন শুধু বরাদ্দের পরিমাণ বা নির্মিত অবকাঠামোর দৈর্ঘ্য দিয়ে করা যায় না। প্রকল্পের ব্যয় যুক্তিসংগত কি না, কাজের মান বজায় আছে কি না, নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হয়েছে কি না এবং জনগণ প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

জনগণের অর্থ ব্যয় করে নির্মিত কোনো প্রকল্প যদি অস্বাভাবিক ব্যয়, নিম্নমান কিংবা অকার্যকারিতার কারণে প্রত্যাশিত সুফল দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেটি শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়; তা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দায়িত্ব ও জবাবদিহিরও প্রশ্ন।

তবে প্রতিটি ব্যর্থতা দুর্নীতির প্রমাণ নয়। প্রকৃত দায় নির্ধারণ করতে হলে স্বাধীন নিরীক্ষা, তথ্য প্রকাশ, তদন্ত এবং প্রয়োজনে বিচারিক প্রক্রিয়া অপরিহার্য। আইনের শাসন মানে শুধু অপরাধের শাস্তি নয়; নিরপরাধ ব্যক্তির অধিকার সুরক্ষাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ।

উন্নয়নের পরিসংখ্যান বনাম মানুষের বাস্তবতা

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ ও বিনিয়োগ একটি দেশের অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানকে জনকল্যাণের পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি হিসেবে বিবেচনা করা অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের সীমাবদ্ধতা।

একটি অর্থনীতি বড় হতে পারে, অথচ তার সুফল সমানভাবে বণ্টিত নাও হতে পারে। জাতীয় আয় বৃদ্ধি পেলেও যদি মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হয়, জীবনযাত্রার ব্যয় মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে সংকুচিত করে, কিংবা শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ আয়ের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে প্রবৃদ্ধির সামাজিক তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা যুক্তিসংগত।

এখানে মূল বিষয় ধনসম্পদের অস্তিত্ব নয়, তার উৎপাদনশীল ব্যবহার এবং সুযোগের ন্যায্যতা। একজন উদ্যোক্তার সম্পদ বৃদ্ধি যদি নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, তাহলে তা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। কিন্তু সম্পদ বৃদ্ধির প্রধান পথ যদি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, একচেটিয়া সুবিধা, প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত করা কিংবা জনসম্পদের অসম বণ্টন হয়ে ওঠে, তাহলে অর্থনৈতিক সাফল্য ও সামাজিক কল্যাণের মধ্যে বিচ্ছেদ তৈরি হয়।

সুতরাং উন্নয়নের মূল্যায়নে প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থান, প্রকৃত মজুরি, দারিদ্র্য ও বৈষম্য, সরকারি সেবার মান, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা এবং সম্পদ বণ্টনের প্রবণতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

উন্নয়নের প্রকৃত পরীক্ষা হলো—রাষ্ট্রের সম্পদ কতটা বেড়েছে, শুধু তা নয়; সেই সম্পদ সৃষ্টির সুফল কতটা মানুষের জীবনে পৌঁছেছে।

পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নতুন নেতৃত্ব

রাজনৈতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো ক্ষমতার কেন্দ্রে কারা বসেছে, তা নয়; বরং ক্ষমতা ব্যবহারের নিয়ম ও আচরণ কতটা পরিবর্তিত হয়েছে।

নতুন রাজনৈতিক দল, নতুন নেতৃত্ব কিংবা নতুন প্রজন্মের উত্থান গণতন্ত্রে সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। কিন্তু নতুন পরিচয় মানেই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি নয়। অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব, নেতৃত্বের ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, বিরোধী মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা, প্রশাসনের দলীয় ব্যবহার এবং অস্বচ্ছ অর্থায়নের প্রবণতা নতুন সংগঠনেও পুনরাবৃত্ত হতে পারে।

একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতার বাইরে থাকাকালে যে নীতির পক্ষে কথা বলে, ক্ষমতায় গেলে সেই নীতি মানতে কতটা প্রস্তুত—সেখানেই তার প্রকৃত রাজনৈতিক চরিত্রের পরীক্ষা। বিরোধী অবস্থানে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান দাবি করা, কিন্তু ক্ষমতায় এসে সেই প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা সংস্কারের রাজনীতি নয়; এটি কেবল ক্ষমতার অবস্থান পরিবর্তন।

অতএব, রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যা কোনো ব্যক্তি বা দলের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। সরকার পরিবর্তিত হলেও নির্বাচনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন, দুর্নীতি দমন এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইন অনুযায়ী স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলকভাবে কাজ করতে হবে।

গণতন্ত্রের শক্তি কেবল ভালো শাসক পাওয়ার মধ্যে নয়; বরং এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্যে, যেখানে দুর্বল শাসকও ইচ্ছামতো রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন না।

উত্তরণের পথ: ক্ষমতার ওপর জনগণের কর্তৃত্ব

বুর্জোয়া রাজনীতির সমালোচনা তখনই কার্যকর হবে, যখন তা কেবল তাত্ত্বিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব সংস্কারের কর্মসূচিতে রূপ নেবে।

প্রথমত, রাজনৈতিক দল ও নির্বাচনী প্রচারের অর্থায়নের উৎস, ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক স্বার্থ সম্পর্কে কার্যকর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি ক্রয়, উন্নয়ন প্রকল্প, ঋণ বিতরণ ও নীতিনির্ধারণে স্বার্থের সংঘাত শনাক্ত এবং প্রতিরোধের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তৃতীয়ত, সরকারি নিয়োগ ও পদোন্নতিতে মেধা, যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতার নীতি কার্যকর করতে হবে।

চতুর্থত, সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বাধীন নিরীক্ষা এবং প্রকল্পের ব্যয় ও ফলাফলের তথ্য জনগণের জন্য সহজলভ্য করতে হবে। পঞ্চমত, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্তে রাজনৈতিক পরিচয় যেন কারও জন্য ঢাল কিংবা অন্য কারও জন্য শাস্তির কারণ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

ষষ্ঠত, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতা এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। সপ্তমত, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম, তথ্য অধিকার এবং বিচারিক প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা নাগরিকের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ না হয়ে গণতান্ত্রিক অধিকারে পরিণত হয়।

এ সংস্কারের উদ্দেশ্য ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তাদের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়। বরং ব্যবসায়িক স্বার্থ ও জনস্বার্থের মধ্যে সুস্পষ্ট সীমারেখা প্রতিষ্ঠা করা, যাতে কেউ নিজের অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে অন্যায় সুবিধা অর্জন করতে না পারেন এবং কেউ রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রতিযোগীদের অধিকার খর্ব করতে না পারেন।

একই সঙ্গে রাষ্ট্রকে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে সততা ও যোগ্যতা রাজনৈতিক অগ্রগতির পথে বাধা হবে না এবং আর্থিক সামর্থ্যের অভাব নাগরিকের নেতৃত্ব দেওয়ার অধিকারকে অস্বীকার করবে না।

শেষ কথা: রাষ্ট্র জনগণের, ক্ষমতা আমানত

বুর্জোয়া রাজনীতি নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে: অর্থনৈতিক ক্ষমতা কি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে জবাবদিহিমূলক থাকছে, নাকি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোই ক্রমশ অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রভাবাধীন হয়ে পড়ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর কোনো রাজনৈতিক দলের স্লোগানে পাওয়া যাবে না। তা খুঁজতে হবে রাষ্ট্রের নীতি, সম্পদ বণ্টন, প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ এবং সাধারণ মানুষের অধিকার ও সুযোগের বাস্তব অবস্থায়।

রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা ধনী গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্রের ক্ষমতা জনগণের কাছ থেকে প্রাপ্ত একটি দায়িত্ব; জনসম্পদ জনগণের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য একটি আমানত। সেই আমানতের অপব্যবহার যে-ই করুন, তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় তাঁকে জবাবদিহি থেকে অব্যাহতি দিতে পারে না।

রাজনীতিতে অর্থ থাকবে, ব্যবসা থাকবে, পুঁজি ও বিনিয়োগেরও প্রয়োজন থাকবে। কিন্তু অর্থ যেন রাজনৈতিক অধিকার কেনার মাধ্যম না হয়, সম্পদ যেন আইনের ঊর্ধ্বে ওঠার সিঁড়ি না হয় এবং ক্ষমতা যেন ব্যক্তিগত সুবিধা সংরক্ষণের স্থায়ী লাইসেন্সে পরিণত না হয়।

কারণ, যে রাজনীতিতে অর্থ ক্ষমতা কেনে, ক্ষমতা বিশেষ সুবিধা সৃষ্টি করে এবং বিশেষ সুবিধা আবার অর্থের আধিপত্য বাড়ায়—সেখানে জনগণ ভোটার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ থাকলেও রাষ্ট্রের প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রান্তিক হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।

সেই ঝুঁকি থেকে উত্তরণের পথ কোনো শ্রেণির বিরুদ্ধে অন্ধ বিদ্বেষ নয়; বরং এমন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, যেখানে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু অর্থনৈতিক আধিপত্য থাকবে না; রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার থাকবে না; উন্নয়ন হবে, কিন্তু তার সুফল সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে আটকে থাকবে না।

শেষ পর্যন্ত রাজনীতির নৈতিকতা নির্ধারিত হবে ক্ষমতাবানরা কতটা সম্পদ অর্জন করলেন, তা দিয়ে নয়; বরং রাষ্ট্র কতটা ন্যায়সংগত হলো, প্রতিষ্ঠান কতটা জবাবদিহিমূলক হলো এবং সাধারণ মানুষ কতটা অধিকার, মর্যাদা ও সুযোগ পেলেন, তা দিয়ে।

প্রশ্নটি তাই শুধু বুর্জোয়া রাজনীতি নিয়ে নয়; প্রশ্নটি রাষ্ট্রের মালিকানা, গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ এবং ক্ষমতার চূড়ান্ত জবাবদিহি নিয়ে—রাষ্ট্র কার, স্বার্থ কার?