আবারও বাড়ছে ভোজ্যতেলের দাম

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৭:২৪ অপরাহ্ন, ০২ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৭:২৪ অপরাহ্ন, ০২ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত
  • ভোজ্যতেলের দাম বাড়াতে সরকারকে চাপ দিচ্ছে ব্যবসায়ীরা
  • আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে প্রতি লিটারে ১০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব
  • জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি যেন ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’: এস এম নাজের হোসাইন, সহসভাপতি-ক্যাব

বৃষ্টি-বন্যার অজুহাতে নিত্যপণ্যের বাজারে এমনিতেই আগুন জ্বলছে। তার ওপর আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণ দেখিয়ে আবারও ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১০ টাকা এবং পাম তেলের দাম ১৭ টাকা বাড়ানোর আবেদন এখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিবেচনায় রয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়বে নিম্ন ও সাধারণ মানুষ। এর ফলে তাদের দৈনন্দিন পারিবারিক খরচ বেড়ে যাবে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হবে।

জানা গেছে, ভোজ্যতেলের দাম বাড়লে সরাসরি বিপাকে পড়বে সাধারণ জনগণ, সীমিত আয়ের মানুষ এবং দিনমজুরেরা। এর ফলে তাদের দৈনন্দিন সংসার খরচ অনেক বেড়ে যাবে এবং খাদ্যতালিকা থেকে পুষ্টিকর খাবার বাদ দিতে বাধ্য হবেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় তেলের দাম বাড়লে কম আয়ের মানুষের সংসার চালানোর বাজেট এলোমেলো হয়ে যাবে। অনেকে বাধ্য হয়ে কম পরিমাণে তেল কিনবেন বা তুলনামূলক কম মানের খাবার খাবেন, যা পুষ্টিহীনতা বাড়াবে। অন্যান্য খরচে কাটছাঁট করে তেলের বাড়তি দাম জোগাতে গিয়ে চিকিৎসা, শিক্ষা বা অন্যান্য জরুরি খাতের ব্যয়ও কমিয়ে দিতে হবে। তবে নতুন করে ভোজ্যতেলের দাম বাড়াতে চাচ্ছে আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে এরই মধ্যে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১০ টাকা বাড়ানোর আবেদন জানিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে তারা। তবে এ ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

আরও পড়ুন: ১২ কেজি এলপিজির দাম ৭০ টাকা বৃদ্ধি

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে গত সপ্তাহে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের এক দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই তা শেষ হয়। বিষয়টি এখনো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আবারও আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

গত ৭ জুলাই বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া চিঠিতে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের খুচরা মূল্য ১৯৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০৯ টাকা করার দাবি জানানো হয়েছে। আর পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়িয়ে ১ হাজার ১৫ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৮৮ টাকা এবং খোলা পাম তেলের দাম ১৮৩ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম

সর্বশেষ ১১ জুলাই থেকে ভোজ্যতেলের দাম বাড়াতে সরকারকে চাপ দেন ব্যবসায়ীরা। অজুহাত হিসেবে দেখানো হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়াকে। এই দুই কারণে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। সেদিনই মন্ত্রণালয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একটি বৈঠক হয়। তবে বৈঠকে অনুমতি মেলেনি। পরে আরেকটি বৈঠকের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানানো হয়। তবে ভোজ্যতেলের দাম বাড়তে চলেছে, তার আঁচ মিলছে এখনই। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম কত হওয়া উচিত, তা নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু করেছে মন্ত্রণালয়।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ২৯ এপ্রিলও ভোজ্যতেলের দাম এক দফা বাড়ায় পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। ওই দফায় বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ৪ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। এতে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১৯৯ টাকা। যা আরও বাড়াতে চাইছেন ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, ডলার বিনিময় হার এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলে অতিরিক্ত ১৮ থেকে ২০ টাকা ব্যয় হচ্ছে। বর্তমান দামে বিক্রি করায় দীর্ঘদিন ধরে লোকসান গুনতে হচ্ছে, যা অব্যাহত থাকলে তেল আমদানি ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হবে।

ব্যবসায়ীদের এমন অজুহাত মানতে নারাজ বাজার বিশেষজ্ঞরাও। তাদের মতে, ভোজ্যতেল এমন একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, যার দাম বাড়লে মানুষের ওপর খরচের চাপ বেড়ে যায়। শুধু তাই নয়, হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবারের দামসহ বিভিন্ন পর্যায়ে এর প্রভাব পড়ে। তা ছাড়া দাম বাড়ানোর সময় যে তৎপরতা দেখা যায়, দাম কমানোর বেলায় তেমনটা দেখা যায় না বলেও অভিযোগ তাদের।

ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের প্রতিক্রিয়ায় ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, দাম বাড়ানোর সময় আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দেওয়া হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে ওই পণ্যের দাম কমলে আমাদের ব্যবসায়ীদের তার খবর থাকে না। একদিকে বন্যার অজুহাতে সবজিসহ চালের বাজারে ব্যবসায়ীরা আগুন দিয়েছে, এই ফাঁকে তারা আবার সয়াবিন তেল নিয়ে মেতে উঠেছে। তেলের গুটিকয় আমদানিকারক ব্যবসায়ী কারসাজি করে দাম বাড়িয়ে জনগণের পকেট কাটতে চাইছে।

তিনি বলেন, নতুন করে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের ওপর তা ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হবে। কারণ, এমনিতেই নিত্যপণ্য নিয়ে ভোক্তাদের হিমশিম অবস্থা, সেখানে এটি বাড়তি যন্ত্রণা যোগাবে। ব্যবসায়ীদের ফ্রিস্টাইলে দাম বাড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বের করতে সরকারকে এখনই উদ্যোগী হতে হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের মূল্য হ্রাস-বৃদ্ধি থাকলেও বাংলাদেশে তার প্রভাব সব সময় উল্টোভাবে পড়ে। এতে করে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমছে না, বরং দিন দিন বাড়ছে।

এর আগে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, ভোজ্যতেলের দাম এক ফোঁটাও বৃদ্ধির আশঙ্কা নেই। কারণ, বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। তবে বাণিজ্যমন্ত্রী যখন বলছেন, বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুত আছে, ঠিক তখনই রাজধানীর একাধিক বাজারে সয়াবিন তেলের সরবরাহ একেবারে নেই বললেই চলে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের অধিকাংশ দোকানে তেল নেই বলে জানিয়েছেন বাজারের একাধিক দোকানদার। তাঁরা বলেন, কিছুসংখ্যক দোকানে হাতে গোনা কিছু তেল আছে। সরবরাহ-ঘাটতি তৈরি হওয়ায় তাঁদের কেউ কেউ সেসব তেল বাড়তি দামে বিক্রি করছেন।

তবে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে অনেক ভোক্তা সরকারের মূল্য তদারকির অভাব ও তেল প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতাকে দায়ী করছেন। ঢাকার নিম্ন আয়ের ভোক্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, মহামারির দুটি ঢেউয়ের মাঝে তেলের দাম বাড়ার বিষয়টি নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জন্য তৃতীয় একটি ধাক্কা হয়ে এসেছে। বেসরকারি চাকরিজীবী নজরুল ইসলাম জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় তার পক্ষে পরিবারের খরচ চালানো খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। এত চড়া দামে কীভাবে তেল কিনব আমি? এসব দেখার কি কেউ নেই—প্রশ্ন তোলেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি কোম্পানির কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে দেশে ভোজ্যতেলের যে দাম, তা আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সূত্রে জানা গেছে, বাজারে বর্তমানে ১ লাখ ৭০ হাজার টন ভোজ্যতেলের মজুত রয়েছে। আর পাইপলাইনে রয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার টন। এ ছাড়া ঋণপত্র (এলসি) খোলার কাজও চলমান।