মুজিবের নামে হলের নামফলক পুনঃস্থাপনের প্রতিবাদে ডাকসু নেতাদের বিক্ষোভ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কর্তৃক ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নামফলক সরিয়ে পুনরায় ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ নামফলক স্থাপনের উদ্যোগের প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও ব্রিফিং করেছেন ডাকসু নেতৃবৃন্দ। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলপাড়ায় ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলীর আহ্বানে এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
এর আগে বুধবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলটির প্রধান ফটক থেকে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ লেখা নামফলক সরিয়ে ফেলার কাজ শুরু হয়। সেখানে পুনরায় ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ নামফলক স্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী জানিয়েছেন, সিনেটে স্থাপনাগুলোর আগের নাম বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং সে অনুযায়ী নামফলক পরিবর্তন করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাংকিংয়ে দেশ সেরা জাবি
বিক্ষোভ ও ব্রিফিংয়ে ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ফ্যাসিবাদের আইকন মুজিবের নামে হলের নামফলক পুনঃস্থাপনের অপচেষ্টা করছে। শিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেটের পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা আজ কথা বলতে দাঁড়িয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের নামে হল থাকা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে আপত্তি তৈরি হয়েছে, তার অন্যতম কারণ হলো, বর্তমানে এই নামের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একটি রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী কোথাও নিজেদের শেখ মুজিবুর রহমান হলের শিক্ষার্থী পরিচয় দিলে তাদের ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে তারা নানা ধরনের হয়রানি, মারধর, নির্যাতন ও অস্বস্তির মুখে পড়ছেন। তাই শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থেই হলটির নাম পরিবর্তনের দাবি উঠেছে।’
আরও পড়ুন: ‘মেয়েদের সঙ্গে অবাধ বিচরণ’সহ অভিযোগে শিবিরের ‘সাথী’ পদ হারান রাকসু জিএস আম্মার
তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে গণস্বাক্ষরের মাধ্যমে অধিকাংশ শিক্ষার্থী নাম পরিবর্তনের পক্ষে মতামত দিয়েছেন। আমরা কোনো নির্দিষ্ট নাম চাপিয়ে দিতে চাই না; শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে হলটির নাম পরিবর্তন করা হোক, এটাই আমাদের দাবি।’
মুসাদ্দিক আলী আরও বলেন, ‘১৬ ডিসেম্বর স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক দিতে যাওয়ার সময় হলের ব্যানারে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম দেখে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেউ মনে করে পুলিশ সেটি সরিয়ে নিয়েছিল এবং হেনস্তা করেছিল। এ ধরনের ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে অপমানবোধ তৈরি হয়েছে।’
নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘৯ জানুয়ারি ২০২৬-এর খবরে প্রকাশিত হয়েছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম শহীদ ওসমান হাদির নামে পরিবর্তনের সুপারিশ করেছিল। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি সিনেটে পাঠানো হয় এবং আবার সিন্ডিকেটে ফেরত আসে। সিনেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নাম পরিবর্তনের দাবিতে ওয়াকআউটও করেছিলেন।’
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ করার সুপারিশের খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তবে সেটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। মুসাদ্দিক আলী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও আগে হলটির নাম পরিবর্তনের কথা জানানো হয়েছিল। তাই এখন কেন আগের নামে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।’
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কেন হঠাৎ মুজিববাদের পাহাড়াদার হয়ে উঠতে চাচ্ছে? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কেন ফ্যাসিবাদের পাহাড়াদার হয়ে উঠতে চাচ্ছে? এইটা আমাদেরকে যথেষ্ট ভাবাচ্ছে। এই বিষয়টি যথেষ্ট সন্দেহজনক।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষক সমিতি নির্বাচনে ভোট ভাগাভাগির ইস্যুতে নীল দলের সঙ্গে এই ইস্যুতে বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে ব্যাকডোরে কোনো লিয়াজোঁ হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে। কোনো অর্থনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুনরায় ফ্যাসিবাদী আইকনের নামে হলের নামফলক ফিরিয়ে আনার অপচেষ্টা চালাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও আমরা তুলছি।’
বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে তিনি দাবি করেন, ‘বিপুল অর্থ ব্যয় করে এখানে ফ্যাসিবাদের আইকনের নামে স্টিলের দামি নামফলক বসানো হবে। এটি অনেক টাকার ব্যাপার এবং এর জন্য বিপুল অঙ্কের বাজেট করা হয়েছে বলে চাউর হয়েছে। এই টাকা লীগ থেকে ফান্ডিং করেছে কি না, এই প্রশ্নও শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে।’
মুসাদ্দিক আলী বলেন, ‘বীরউত্তম জিয়াউর রহমানের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি হল রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে সেই হলে এখন পর্যন্ত কোনো নান্দনিক গেট নাই। ফ্যাসিবাদী লীগ কোনো গেট বানাতে দেয় নাই। আজকে বিএনপির ক্ষমতার ছয় মাস, অথচ এখন পর্যন্ত তারা জিয়া হলে একটি নান্দনিক গেট নির্মাণ করতে পারে নাই। অথচ তারা ফ্যাসিবাদী আইকনের নামে হলের নামফলক বসানোর জন্য এবং ফ্যাসিবাদের আইকনের নামকে চকচক করানোর জন্য অঢেল টাকা ঢালতে যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘এইখানে আমি দূরভিসন্ধি লক্ষ্য করছি। আমি মনে করি যে, এটি বিএনপি সরকার ও বিএনপি নিয়ন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে ব্যাকডোরে ফ্যাসিবাদীদের হওয়া কোনো লিয়াজোঁয়ের বহিঃপ্রকাশ হতে পারে।’
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের একাংশ শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রধান ফটকের নামফলক সরিয়ে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নাম লিখে দেয়। পরে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সিন্ডিকেটে নাম পরিবর্তনের সুপারিশ করা হলেও তা চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি।
বুধবার সেই নামফলক সরিয়ে পুনরায় ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ নাম ফিরিয়ে আনার কার্যক্রম শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সিনেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থাপনাগুলোর আগের নাম বহাল রাখা হচ্ছে। বিক্ষোভ ও ব্রিফিংয়ে বিভিন্ন হল সংসদের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।





