এইচএসসির পাসের হার ২০ বছরে সর্বনিম্ন

Shahrier Islam Pallab
খোদাকাত হাসান
প্রকাশিত: ১০:২৯ অপরাহ্ন, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১২:২৬ পূর্বাহ্ন, ০১ নভেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। এ বছর ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে মোট ৪০ হাজার ৮৪ জন পরীক্ষার্থী। গত বছর পাসের হার ছিল ৫৮.৮৩ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৬৯ হাজার ৯৭ জন। গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার ৬.৭১ শতাংশ কমেছে এবং জিপিএ-৫ ২৯ হাজার ১৩ জন কম পেয়েছে।

গতকাল শনিবার সকাল ১১টায় সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ফল প্রকাশের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন ফলাফলের বিস্তারিত তুলে ধরেন।

আরও পড়ুন: ইংরেজি ভার্সনে পাসের হার ১০০%, গড় পাসের হার ৯৯.৮৩%

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এ বছর দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। উত্তীর্ণদের মধ্যে ২ লাখ ৯০ হাজার ১৫৭ জন ছাত্র এবং ছাত্রী ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৫২৮ জন। অর্থাৎ, সব শিক্ষা বোর্ডে উত্তীর্ণ মোট ছাত্রদের চেয়ে ৬৬ হাজার ৩৭১ জন বেশি ছাত্রী উত্তীর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ এবার উত্তীর্ণ হতে পারেননি।

এবারের ফলাফলে পাসের হার গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে নিচে নেমে এসেছে।

আরও পড়ুন: এক-দুই বিষয়ে ফেল করা ৪ লাখ ২২ হাজার শিক্ষার্থীর পরীক্ষা এক মাসের মধ্যে

৯টি সাধারণ বোর্ডের ফলাফলের চিত্র: ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে মোট ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে পাস করেছে ৫ লাখ ৪১ হাজার ২৪৯ জন। পাসের হার ৫১.৬২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩৫ হাজার ৯৪৮ জন। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডেও ছাত্রদের চেয়ে ৮৫ হাজার ৬৭১ জন বেশি ছাত্রী পাসের সাফল্য দেখিয়েছে। উত্তীর্ণদের মধ্যে ছাত্র ২ লাখ ২৭ হাজার ৭৮৯ জন এবং ছাত্রী ৩ লাখ ১৩ হাজার ৪৬০ জন।

এ বছর মোট কেন্দ্রসংখ্যা ছিল ২ হাজার ৭৬০টি এবং মোট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯ হাজার ৩৯০টি। গত বছরের তুলনায় মোট প্রতিষ্ঠান ৮৮টি বাড়লেও কেন্দ্র কমেছে ৪০টি। এ ছাড়া শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবার ১৩৯টি এবং শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৯৩টি। গত বছরের চেয়ে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯১টি বেড়েছে। অন্যদিকে, ৮টি বিদেশ কেন্দ্রে মোট ২৩০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২০৯ জন পাস করেছে। পাসের হার ৯০.৮৭ শতাংশ।

এ বছর ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন শুধু এইচএসসি পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ। তবে মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ড মিলিয়ে ১১টি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ।

সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে—ঢাকা বোর্ডে ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছেন। গত বছর ৬৪ দশমিক ৬২ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছিলেন। রাজশাহী বোর্ডে পাসের হার ৪৫ দশমিক ০৬ শতাংশ, কুমিল্লা বোর্ডে ৪৮ দশমিক ০৪ শতাংশ, যশোর বোর্ডে ৪৪ দশমিক ৯২ শতাংশ, চট্টগ্রাম বোর্ডে ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ, বরিশাল বোর্ডে ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ, সিলেট বোর্ডে ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশ, দিনাজপুর বোর্ডে ৪৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে পাসের হার ৫১ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

কারিগরিতে পাসের হার ৪৯.৪৩%: এ বছর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি (বিএম/বিএমটি), এইচএসসি ভোকেশনাল ও এইচএসসি ডিপ্লোমা ইন কমার্স পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ। আর ফলাফলের সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৮৮৬ জন পরীক্ষার্থী।

এ বছর এইচএসসি (বিএম/বিএমটি), এইচএসসি ভোকেশনাল ও এইচএসসি ডিপ্লোমা ইন কমার্স পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৯৪৭ জন পরীক্ষার্থী। এর মধ্যে পাস করেছেন ৫০ হাজার ৮৮৯ জন। তাঁদের মধ্যে ছাত্র ৩৩ হাজার ৯৯ এবং ছাত্রী ১৭ হাজার ৭৯০ জন। অন্যদিকে জিপিএ-৫ পাওয়া পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্র ১৮০ এবং ছাত্রী ৭০৬ জন।

মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে আলিম পরীক্ষায় পাসের হার ৬১.০৭ শতাংশ: এ বছর মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন আলিম পরীক্ষায় গড়ে ৬১ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করেছেন। আর ফলাফলের সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩ হাজার ২৫০ জন। পাসের হার ও জিপিএ-৫-এ উভয় সূচকেই এগিয়ে ছাত্ররা। আলিমে এবার পরীক্ষা দিয়েছিল ৮৯ হাজার ৩২১ জন। এর মধ্যে পাস করেছেন ৫৪ হাজার ৫৪৭ জন। তাঁদের মধ্যে ছাত্র ২৯ হাজার ২৬৯ এবং ছাত্রী ২৫ হাজার ২৭৮ জন। অন্যদিকে জিপিএ-৫ পাওয়া পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্র ২ হাজার ২৮ এবং ছাত্রী ১ হাজার ২২২ জন। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন মোট ৪৬০টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে অংশ নিয়েছেন ২ হাজার ৭০৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। ফলের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আলিম পরীক্ষায় পাসের হারে ছাত্রীরা এগিয়ে থাকলেও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যায় ছাত্রদের সংখ্যা বেশি।

মানবিকে ফেল করেছে সর্বোচ্চ: ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ। এবার মানবিক বিভাগ থেকে ফেল করেছে সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থী। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মানবিক বিভাগে ছাত্র ছিল ২ লাখ ৫৮ হাজার ৯৩২ জন। সেখানে পাস করেছে ৯০ হাজার ৬৬৪ জন। এ ছাড়া ছাত্রী অংশ নিয়েছিল ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮০৩ জন। সেখানে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৪৭ জন পাস করেছে। সব মিলিয়ে পাসের হার ৪২.১৭ শতাংশ।

সবচেয়ে বেশি ফেল ইংরেজি-আইসিটিতে: এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে এবার বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা গেছে। এর মধ্যে ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়েই ফেল করেছেন ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন। গত ২১ বছরের মধ্যে এবারই এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার সর্বনিম্ন। বিষয়ভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইংরেজিতে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। এ বিষয়ে ফেল করেছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন। অন্যদিকে আইসিটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। দুই বিষয়ে মিলিয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন। ফলে ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা এবার সামগ্রিক ফলাফলেও বড় প্রভাব ফেলেছে।

অকৃতকার্যদের ১ মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হবে—শিক্ষামন্ত্রী: চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ এক মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

শনিবার সকালে সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। মন্ত্রী বলেন, অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা যাতে একটি বছর হারিয়ে না ফেলে এবং দ্রুত শিক্ষার মূল ধারায় ফিরতে পারে, সে জন্য সর্বোচ্চ এক মাসের মধ্যে তাদের সম্পূরক পরীক্ষা নেওয়া হবে।

তিনি জানান, সম্পূরক পরীক্ষায়ও যারা উত্তীর্ণ হতে পারবে না কিংবা যারা পরীক্ষায় অংশ নেবে না, তাদের বাদ দেওয়া হবে না। বরং তাদের কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার আওতায় এনে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ প্রকল্প ও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও আগের ফলাফল প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, উত্তরপত্র মূল্যায়নে যাতে কোনো ত্রুটি বা অস্বচ্ছতা না থাকে, সে জন্য এবার প্রতিটি পরীক্ষককে কমসংখ্যক খাতা মূল্যায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অতীতে খাতা পুনর্মূল্যায়নের পর হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্বলতা ও অনিয়মের কারণ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ফলাফল কমে যাওয়ার কারণ ও শিক্ষার ঘাটতি সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বছর পাসের হার ও জিপিএ-৫ কিছুটা কমেছে। এটি কোনো একটি বিষয়ের ঘাটতির কারণে হয়নি। বরং সামগ্রিক শিখন পদ্ধতি, পাঠ্যবই ও শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের যে ঘাটতি রয়েছে, তা পুনর্মূল্যায়ন করে দূর করতে হবে।

অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবসহ বিভিন্ন উপায়ে উত্তরপত্র মূল্যায়নে কারচুপির প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, খাতা মূল্যায়নে শিক্ষকদের দুর্বলতা ও অনিয়মের কারণে অতীতে বড় ধরনের ফল পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছিল। এমনকি একসময় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাও ঘটেছে। বর্তমান সরকার কঠোর হাতে এসব দমন করেছে।

ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে তুলনামূলক খারাপ ফলের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী জানান, এ দুই বিষয়ে ফলের অবনতি ঠেকাতে ইতিমধ্যে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। যেসব কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম বা পাসের হার শূন্য, সেগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে ভালো ফল করা পাশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এতে কোনো শিক্ষকের চাকরি যাতে না যায়, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত উপস্থিতি ও শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শুধু বড় শহর নয়, গ্রামের শিক্ষকদেরও নিয়মিত ক্লাস নেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য পরীক্ষার কেন্দ্রের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষেও সিসিটিভি স্থাপন ও নিয়মিত নজরদারির ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যাতে কেউ দায়িত্বে অবহেলা করতে না পারে।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন—প্রধানমন্ত্রী চান, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় যেভাবে লিখেছে, ঠিক সেভাবেই যেন তাদের মূল্যায়ন করা হয়। ভুল মূল্যায়নের কারণে কোনো শিক্ষার্থী যেন হতাশ বা অনুৎসাহিত না হয়। সবার জন্য স্বচ্ছ ও নির্ভুল ফলাফল নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে এবারের ফল বিপর্যয়কে কোনোভাবেই সন্তোষজনক মনে করছেন না শিক্ষামন্ত্রী। তাঁর ভাষায়, ফলাফলের এমন পতন বা বিপর্যয় কখনোই প্রশংসনীয় হতে পারে না।

মেধার প্রকৃত ও নির্মোহ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে—মাহদী আমিন: কৃত্রিমভাবে পাসের হার কিংবা জিপিএ-৫ বাড়িয়ে দেখানোর পুরোনো সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে এসে এবার উচ্চমাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষায় মেধার প্রকৃত ও নির্মোহ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মূল্যবান শিক্ষাজীবন রক্ষার্থে এক বা দুই বিষয়ে অনুত্তীর্ণদের এক মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং এসএসসি পরীক্ষার আদলে পূর্ণাঙ্গ খাতা পুনর্নিরীক্ষণের যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

শনিবার সকালে সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এইচএসসি ও সমমানের ফলাফল প্রকাশসংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

পরীক্ষার সার্বিক পরিবেশ ও মূল্যায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, বর্তমান নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষামন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভির আওতা বৃদ্ধি এবং ক্যামেরার ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে অত্যন্ত আনন্দমুখর ও ইতিবাচক পরিবেশে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।

খাতা মূল্যায়ন প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনায় নিশ্চিত করা হয়েছে যে, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন যেন শতভাগ নির্মোহভাবে সম্পন্ন হয়। জিপিএ-৫ কিংবা পাসের হার কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন এবং প্রশ্নপত্রের মান বজায় রেখে সততার সঙ্গে উত্তরপত্র মূল্যায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির জন্য যেমন অতিরিক্ত সময় ও পরিশ্রম দিতে হয়েছে, তেমনি এত বড় সিলেবাসের কারণে অনেকেই মানসিকভাবে চাপের মুখে পড়ে। এর ওপর গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে সব বোর্ডে অভিন্ন ও মানসম্মত প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হওয়ায় ফলে তার একটি স্পষ্ট প্রভাব দেখা গেছে। পাশাপাশি, খাতা মূল্যায়নে ঢালাওভাবে বাড়তি নম্বর না দিয়ে একদম যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরীক্ষা কেন্দ্রেও কঠোর নজরদারি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা হয়েছিল। এসব কারণেই মূলত এবার পাসের হার কিছুটা কমেছে বলে তাঁরা মনে করছেন।

তাঁরা আরও মনে করছেন, ফল বিপর্যয়ের পেছনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক পরিবেশও বড় একটি ভূমিকা রাখতে পারে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরপরই এসব শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তি হয়েছিল। ওই সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা চলছিল, তার প্রভাবে অনেকেই কলেজবিমুখ হয়ে পড়েন। ফলে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকা এবং পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকের ভেতরে একধরনের অনীহা তৈরি হয়—যা এবারের ফলে স্পষ্ট প্রভাব ফেলেছে।

প্রসঙ্গত, গত ২ জুলাই এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়ে লিখিত পরীক্ষা শেষ হয়েছিল ৮ আগস্ট। তবে বন্যার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়; যা পরবর্তীতে গ্রহণ করা হলে চূড়ান্তভাবে ৯ সেপ্টেম্বর পরীক্ষা সম্পন্ন হয়।

এদিকে প্রকাশিত ফলাফলে কোনো শিক্ষার্থী অসন্তুষ্ট হলে উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষার জন্য আগামীকাল ১ নভেম্বর থেকে আবেদন করতে পারবেন। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ৭ নভেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে এই আবেদন গ্রহণ করা হবে। পুনর্নিরীক্ষার বিস্তারিত নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডগুলোর ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে।