‘আমি মরে গেলেও গানগুলো যেন বেঁচে থাকে'

চারবার স্ট্রোকের পর সংগীতকে বিদায় জানিয়ে নিভৃতে দিন কাটছে রিংকুর

Sanchoy Biswas
বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: ৮:৪৬ অপরাহ্ন, ০৭ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১১:০৭ অপরাহ্ন, ০৭ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

একসময় যার কণ্ঠে মুগ্ধ হতো দেশের লাখো শ্রোতা, সেই ক্লোজআপ ওয়ানখ্যাত লোকসংগীতশিল্পী মশিউর রহমান রিংকু আজ নিভৃত জীবনের বাসিন্দা। চারবার স্ট্রোকের ধাক্কায় বদলে গেছে তার জীবন, থেমে গেছে মঞ্চের আলো আর গানের ব্যস্ততা। শারীরিক সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে তিনি এখন গ্রামের বাড়িতেই কাটাচ্ছেন দিন। তবে জীবনের এই কঠিন সময়ে এসে তার সবচেয়ে বড় আক্ষেপ নিজের জন্য নয়, বরং নিজের সৃষ্টি করা গানগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে। শিল্পীর একটাই আকুতি—‘আমি না থাকলেও গানগুলো যেন হারিয়ে না যায়।’

বাংলা লোকসংগীতের পরিচিত মুখ মশিউর রহমান রিংকুর জীবনে এখন আর নেই আগের সেই ব্যস্ততা, নেই স্টেজ শো কিংবা নতুন গান নিয়ে শ্রোতাদের উচ্ছ্বাস। সময়ের নির্মম বাস্তবতায় তিনি আজ অনেকটাই আড়ালে। দীর্ঘদিন ধরেই সংগীতাঙ্গন থেকে দূরে থাকা এই শিল্পী বর্তমানে নিজ গ্রামের বাড়িতে নিভৃতে সময় কাটাচ্ছেন।

আরও পড়ুন: অস্ট্রেলিয়া সফর নিয়ে গুঞ্জনের জবাব দিলেন ফারুকী

একসময় যার গান গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই সমান জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, সেই রিংকু এখন নিজের শারীরিক অবস্থার কারণে সংগীতে ফেরার স্বপ্নও দেখেন না। চারবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর জীবন সম্পর্কে তার উপলব্ধিও বদলে গেছে অনেকখানি।

সম্প্রতি ‘পথের গল্প’ নামের একটি ট্রাভেল ডকুমেন্টারিতে অংশ নিয়ে নিজের বর্তমান জীবন, অসুস্থতা এবং সংগীতজীবনের নানা স্মৃতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন তিনি। সেখানেই আবেগঘন কণ্ঠে শিল্পী জানান, গানে ফেরার ইচ্ছা থাকলেও বাস্তবতা তাকে সেই সুযোগ দিচ্ছে না।

আরও পড়ুন: স্বরূপ বিশ্বাস গ্রেপ্তার: টলিউডের সংকট নিয়ে মুখ খুললেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য

রিংকু বলেন, “পুরোপুরি গানে ফেরার ইচ্ছা আমার নেই। ইচ্ছা করলেও সেই সম্ভাবনা নেই। কারণ, চারবার স্ট্রোক হয়েছে। এর মধ্যে একবার-দুবার তো কেউ জানতই না। চারবার যখন স্ট্রোক হয়ে গেল, তখন বুঝলাম সব আশা শেষ। এটা মেনে নিতেই হবে, কারণ এটাই সত্য।”

কথাগুলো বলতে গিয়ে যেন নিজের জীবনের কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। একসময় যে মানুষটি গানকে জীবন ভেবেছিলেন, আজ তিনিই বলছেন, অসম্পূর্ণভাবে ফিরে আসার চেয়ে দূরে থাকাই ভালো।

তার ভাষায়, “আমি যেভাবে ব্যাক করতে চাই, সেভাবে আর হবে না। পরিপূর্ণভাবে ফিরতে না পারলে ফেরারও প্রয়োজন নেই। আমি মরে গেলেও গানগুলো তো থাকবে। আমার একটাই আহ্বান, গানগুলো যেন নষ্ট না হয়।”

শুধু শারীরিক অসুস্থতাই নয়, জীবনের এই পর্যায়ে এসে মানুষের সম্পর্ক নিয়েও এক ধরনের হতাশা প্রকাশ করেছেন এই শিল্পী। বিশেষ করে শহুরে সম্পর্কের প্রতি তার আক্ষেপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কথায় কথায়।

রিংকু বলেন, “শহরের মানুষের ভালোবাসা অনেক সময় কাজের জন্য ভালোবাসা। আর গ্রামের মানুষের ভালোবাসা অরিজিনাল। তারাই এখন আমার বন্ধু। একটা কথা আছে—কাজ করলে কাজী, কাজ ফুরালে পাজি। শহরের অনেক সম্পর্কই এখন আমার কাছে তেমন মনে হয়। যদি কারও কাজ করে দিতাম, তাহলে ভালোবাসত; কাজ না করে দিলে আমি যেন আর কেউ নই।”

একসময় সংগীতাঙ্গনের অসংখ্য মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও এখন সেই চিত্র বদলে গেছে বলেও জানান তিনি।

“সেই সময়ের কোনো বন্ধুই এখন নেই। কেউ খোঁজ রাখে না। তবে আমি কারও প্রতি অভিযোগ রাখি না। যদি কারও জন্য কিছু করে থাকি, সেটা নিজের ইচ্ছায় করেছি। কিন্তু কারও সিমপ্যাথি আমি চাই না,”—বলেন তিনি।

২০২০ সালে প্রথম স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় তার দীর্ঘ শারীরিক সংগ্রাম। একাধিকবার স্ট্রোকের কারণে শরীরের একপাশ অনেকটাই অবশ হয়ে যায়। স্বাভাবিক চলাফেরা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজেও তাকে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়। যে মানুষটি একসময় মঞ্চে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গেয়েছেন, আজ তার জন্য স্বাভাবিক জীবনযাপনই বড় চ্যালেঞ্জ।

তবুও জীবনের প্রতি কোনো ক্ষোভ নেই তার। বরং গ্রামের সাধারণ মানুষের সান্নিধ্যে তিনি খুঁজে পেয়েছেন অন্যরকম প্রশান্তি। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, পরিচিত মুখ আর আপনজনদের ভালোবাসায় কাটছে তার দিন।

তবে সংগীত থেকে দূরে সরে গেলেও গান থেকে দূরে যেতে পারেননি রিংকু। কারণ গানই তার পরিচয়, গানই তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। তাই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়, তিনি বেশি ভাবেন নিজের সৃষ্টি নিয়ে।

একজন শিল্পীর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় চাওয়া—মানুষ তাকে ভুলে গেলেও তার গান যেন মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। আর সেই আকুতিই যেন ফুটে উঠেছে রিংকুর কণ্ঠে—“আমি না থাকলেও আমার গানগুলো যেন বেঁচে থাকে, মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, হারিয়ে না যায়।”