পাকিস্তান–তুরস্ক–সৌদি সামরিক জোটে বাংলাদেশের যোগদান পরিকল্পনা
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের পর পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবকে নিয়ে গঠিত একটি উদীয়মান শক্তিশালী সামরিক জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও জল্পনা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে একাধিক উচ্চপর্যায়ের সামরিক বৈঠক এবং পাকিস্তান–সৌদি আরবের বিদ্যমান কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এই আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে যে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে, এই সম্ভাব্য কৌশলগত অংশীদারিত্ব তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকার যদি এই জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেয়, তবে তা দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে।
আরও পড়ুন: ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে ইরানের শাসকরা
এই সম্ভাব্য সামরিক জোটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে। ওই চুক্তির মূল ধারায় বলা হয়েছে, কোনো এক দেশের ওপর হামলাকে উভয় দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে—যা ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নীতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তুরস্কও এই জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তান একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র এবং তুরস্কের রয়েছে ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী। এর সঙ্গে সৌদি আরবের বিপুল আর্থিক সক্ষমতা যুক্ত হলে একটি শক্তিশালী সামরিক ত্রিভুজ গড়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশের তিন পাশে ৫টি বিমানঘাঁটি সচল করছে ভারত
বাংলাদেশ এই জোটে যুক্ত হলে মূলত সামরিক প্রশিক্ষণ, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং যৌথ সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। জানা গেছে, বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী ইতোমধ্যে পাকিস্তান–সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা চুক্তির আদলে একটি খসড়া প্রণয়নে আগ্রহ দেখিয়েছে। গত এক বছরে পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্বের ঢাকা সফরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধানের পাকিস্তান সফরকালে জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান ক্রয়ের বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এই যুদ্ধবিমান ক্রয় বাংলাদেশের ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি পাকিস্তান বাংলাদেশকে দ্রুত সুপার মুশাক প্রশিক্ষণ বিমান সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা শুধু অস্ত্র ক্রয়-বিক্রয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং যৌথ সামরিক মহড়ার দিকেও বিস্তৃত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তবে এই জোটে বাংলাদেশের যোগদান অনেকাংশে নির্ভর করবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ওপর। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের সময়ে খসড়া চুক্তির কাজ অনেক দূর এগোলেও এর চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে পরবর্তী নির্বাচিত সংসদ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে এই জোট বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারে। তবে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারকে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে।
সবশেষে বাংলাদেশ এই চতুর্মুখী সামরিক জোটে যোগ দিলে তা মুসলিম বিশ্বের প্রধান দেশগুলোর মধ্যে এক নজিরবিহীন নিরাপত্তা সমন্বয়ের উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।





