যুক্তরাজ্যে এত ঘন ঘন প্রধানমন্ত্রী বদল হচ্ছে কেন?
বিগত দশ বছরের মধ্যে স্যার কিয়ের স্টারমার হলেন ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী, যিনি পদত্যাগ করেছেন অথবা ভোটারদের দ্বারা অপসারিত হয়েছেন। কেউ যদি এ বিষয়ে সন্দেহে থাকেন, তাহলে বলে রাখা ভালো- ব্রিটিশ রাজনীতিতে এটি স্বাভাবিক নয়।
যদি এখনো বিশ্বাস না হয়, তাহলে এটি বিবেচনা করুন- ১৮শ শতকে ব্রিটেনে প্রধানমন্ত্রী পদটি চালু হওয়ার পর থেকে গড়ে প্রত্যেকেই প্রায় পাঁচ বছর করে দায়িত্বে ছিলেন।
আরও পড়ুন: দুই দিনে ১৮ জনের মৃত্যু, তীব্র তাপপ্রবাহে পুড়ছে ইউরোপ
কিন্তু গত এক দশকে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র প্রায় ১৮ মাসে।
তাহলে এই অস্বাভাবিক দ্রুত পরিবর্তনের কারণ কী?
আরও পড়ুন: হরমুজ প্রণালী পেরোল বিএসসির ‘বাংলার জয়যাত্রা’
অবশ্যই, এই ছয়টি ক্ষেত্রে প্রত্যেকটির নিজস্ব কারণ রয়েছে।২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যুক্তরাজ্যের সদস্যপদ নিয়ে গণভোট ডেকে পরাজিত হওয়ার পর পদত্যাগ করেছিলেন ডেভিড ক্যামেরন।
টেরেসা মে-ও ব্রেক্সিটের শিকার হন; যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে তার প্রস্তাবিত চুক্তি সংসদ সদস্যরা বারবার প্রত্যাখ্যান করছিলেন, ফলে তার অবস্থান টেকসই থাকেনি।
বরিস জনসনকে অপসারণ করা হয় মূলত তার চরিত্র, সততা ও বিচক্ষণতা নিয়ে প্রশ্নের কারণে। সহকর্মী কনজারভেটিভ এমপিরা মনে করেছিলেন, তিনি আর আগের মতো নির্বাচনী সম্পদ নন, বরং দায়বদ্ধতা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
লিজ ট্রাসের পতন ঘটে তার কর কমানোর পরিকল্পনা নিয়ে আর্থিক বাজারের প্রতিক্রিয়ায়। বিনিয়োগকারীদের মতে, সেই করছাড়ের অর্থ জোগাতে প্রয়োজনীয় ব্যয়সংকোচন প্রস্তাবিত ছিল না।
এই তালিকার শেষ কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকই একমাত্র, যাকে নির্বাচনের মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়া হয়; ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনে ক্লান্ত ভোটাররা তাকে প্রত্যাখ্যান করেন।
সর্বশেষ ব্যক্তি স্যার কিয়ের স্টারমার, তিনি বিদায় নিচ্ছেন কারণ ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির এমপিরা তার ওপর আস্থা হারিয়েছেন। তাদের মতে, তার তীব্র অজনপ্রিয়তা দলের জন্য বড় ধরনের হুমকি।
তবে এই ব্যক্তিগত পতনের ঘটনাগুলোর পাশাপাশি, যুক্তরাজ্যে আরও বড় কিছু পরিবর্তন ঘটছে, যা রাজনীতিকে আরও কঠোর এবং সংঘাতপূর্ণ করে তুলছে, আর ভোটারদের আরও অনমনীয় ও বিভক্ত করে দিচ্ছে।
তাহলে আরও কী ঘটছে?
জনমত জরিপ, ফোকাস গ্রুপ এবং বিভিন্ন অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বোঝা যায়, ভোটারদের মধ্যে একটি অনুভূতি আছে যে, রাজনীতিকরা অসন্তোষের তিনটি মৌলিক কারণ মোকাবিলা করতে পারছেন না।
প্রথমটি হলো স্থবির জীবনমান। এই কষ্টদায়ক প্রবণতার শুরু ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট থেকে। ফলে, কেন ২০১৬ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে ছয়জন প্রধানমন্ত্রী হয়েছে তা বোঝার জন্য সময়রেখা সেখান থেকেই শুরু করা যায়।
এই বিষয়টি প্রেক্ষাপটে রাখতে গেলে বলা যায়, ১৯শ শতকের গোড়ায় নেপোলিয়নিক যুদ্ধের পর থেকে এমনভাবে আর জীবনমান স্থবির হয়ে পড়েনি।
যখন মানুষ আর্থিকভাবে চাপে থাকে এবং মনে করে যে, পরবর্তী প্রজন্ম আগের চেয়ে ভালো অবস্থানে থাকবে- এই অঘোষিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি সরকার পূরণ করতে পারছে না, তখন নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
রাজনীতিবিদদের জন্য আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জরিপে দেখা যাচ্ছে ১৯৭৮ সালে যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও শিল্পসংক্রান্ত অস্থিরতা, এরপর এখন অর্থনৈতিক হতাশা সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
দ্বিতীয় কারণ হলো এই অনুভূতি যে, যুক্তরাজ্যে কিছুই ঠিকমতো কাজ করছে না - পরিবহন, বিচারব্যবস্থা বা অন্য যেকোনো জনসেবা প্রত্যাশিত মানে কাজ করছে না।
এটি আংশিকভাবে একই নিম্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফল, যা জীবনমানের স্থবিরতা সৃষ্টি করছে। অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য খাতে সরকারগুলো বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে।
তৃতীয় কারণ হলো, সামাজিক সংহতি নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ, বা অনেকের মতে এর অভাব। জরিপে দেখা যায়, ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ মনে করেন দেশটি বিভক্ত।
অনেকেই এই বিভক্তির অনুভূতির জন্য গত কয়েক দশকের উচ্চ অভিবাসন এবং কিছু সম্প্রদায়ের একীভূত হতে ব্যর্থতাকে দায়ী করেন।
আর সঠিক হোক বা ভুল, অনেক ভোটার মনে করেন সাম্প্রতিক প্রধানমন্ত্রীরা যুক্তরাজ্যের পরিবর্তন নিয়ে তাদের ক্ষোভ বুঝতে পারেন না।
অন্যভাবে বলতে গেলে, অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের মতো যুক্তরাজ্যও এখনো এই প্রশ্নের সঙ্গে লড়ছে- একটি বহুজাতিক, বহু-জাতিগত, বহুসাংস্কৃতিক সমাজে সবাই কীভাবে একসঙ্গে থাকবে।
আরেকটি পরিবর্তন হলো, মানুষ এখন শুধু ক্ষুব্ধই নয়, তারা সেই ক্ষোভ প্রকাশ করার ক্ষেত্রেও কম সংযত, যুক্তরাজ্যেও সেটা হচ্ছে।
সামাজিক মাধ্যম বা অন্য যেকোনো কারণেই হোক, মানুষ এখন খোলাখুলিভাবে নির্দিষ্ট রাজনীতিবিদদের ও প্রধানমন্ত্রীদেরও বিরোধিতা করছে, যা কয়েক বছর আগেও কল্পনাতীত ছিল।
শাসন করা কি অসম্ভব হয়ে উঠেছে?
তাহলে কি দেশটি এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে শাসন করা প্রায় অসম্ভব, এটাই কি কারণ যে সেখানে দশ বছরে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী দেখতে যাচ্ছি?
অধিকাংশ রাজনীতিবিদ এতটা দূর যেতে চান না। তাদের মতে, আরও জটিল ও বিভক্ত সমাজে শাসন কঠিন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু অসম্ভব নয়।
তবে যেহেতু ছয়জন প্রধানমন্ত্রীই ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট এবং ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের পর থেকে দেশের ওপর ভর করা হতাশার মেঘ সরাতে ব্যর্থ হয়েছেন, সপ্তম ব্যক্তি- তিনি যেই হোন না কেন, সফল হবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থাকাই স্বাভাবিক।





