জীবনঝুঁকিতে চাকরি ছেড়ে রাস্তায় নামি, পলাতক দেখিয়ে বরখাস্ত দুঃখজনক: টুকু

ছাত্র আন্দোলনে সমর্থন জানানো অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামানের বরখাস্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৬:৩৬ অপরাহ্ন, ২৫ অগাস্ট ২০২৫ | আপডেট: ৬:৫২ অপরাহ্ন, ২৫ অগাস্ট ২০২৫
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান চলাকালীন বর্বর পুলিশের গুলিতে ছাত্র হত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করা পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামান টুকুকে বরখাস্ত করা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠেছে। আড়াই লাখ পুলিশ বাহিনীর মধ্যে কেবলমাত্র একজন অতিরিক্ত ডিআইজি, আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান ও ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ নেতা হওয়া সত্ত্বেও বর্বর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করে গণমাধ্যমে ছাত্র-জনতার প্রতি সমর্থন জানিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে রাজপথে নেমে আসেন।

ছাত্র-জনতার আন্দোলন সমর্থন ও পদত্যাগের ঘোষণার পর সিনিয়র কর্মকর্তারা তাকে গ্রেপ্তারের হুমকি-ধমকি দিলেও তিনি পুলিশের অনৈতিক ও বেআইনি কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করে রাজপথে থাকেন। গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পর তাকে পলাতক দেখিয়ে বরখাস্ত করা নিয়ে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। স্বরাষ্ট্র সচিব বরাবরে তিনি আবেদন করেছেন ন্যায়বিচারের জন্য।

আরও পড়ুন: নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছে কিছু পক্ষ: সালাহউদ্দিন

ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালীন পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিষ্ঠুরভাবে গুলিবর্ষণ করে গণহত্যা চালানোর প্রতিবাদে পুলিশ বাহিনীর মধ্যে একমাত্র মনিরুজ্জামান টুকুই প্রতিবাদ করেন। ১ আগস্ট ২০২৪ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি দীর্ঘ এক প্রতিবেদন লিখে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান। গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী সরকারের পতন হলে নতুন নেতৃত্বে পুলিশ আবার ঘুরে দাঁড়ায়।

নতুন সরকার গঠনের পর অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামান ১১ আগস্ট স্বরাষ্ট্র সচিব বরাবরের স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের জন্য আবেদন করেন। আবেদনপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, পবিত্র কোরআনের জ্ঞান ও ন্যায়-অন্যায় বুঝতে পারার কারণে এই পুলিশ বাহিনীতে চাকরি করা তার পক্ষে আর সমীচীন নয়, বিধায় তিনি অবসর গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

আরও পড়ুন: জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের সংঘর্ষ, সেনা মোতায়েন

ছাত্র-জনতার আন্দোলনসহ বিগত ১০ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের অবৈধ আদেশ ও অবৈধ সরকারকে সহায়তা করতে গিয়ে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের হিংস্র বর্বরাদেশে শিশু-কিশোর ছাত্র হত্যার প্রেক্ষিতে পুলিশ একটি ঘৃণিত বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। আবেদনের প্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামানের আবেদন গ্রহণ করেনি। এরপর থেকে তিনি টুরিস্ট পুলিশ থেকে ছুটিতে রয়েছেন। ছুটি থাকাকালীন গত এক বছর সরকার থেকে কোনো প্রকার বেতন-ভাতা গ্রহণ করেননি।

হঠাৎ করে ১৭ আগস্ট তাকে পলাতক দেখিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরখাস্ত করে। সরকারের অনুমতিতে ছুটি নেওয়ার পরও তাকে অন্যান্য পলাতক কর্মকর্তাদের সাথে দেখিয়ে বরখাস্ত করায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি ২৫ আগস্ট স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনির সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে অন্যায়ভাবে বরখাস্ত করার বিষয়টি অবহিত করেন। তিনি আবেদনের মাধ্যমে চাকরি থেকে স্বাভাবিক অবসর অথবা তার প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামান টুকু বাংলাবাজার পত্রিকাকে জানান, তিনি চাকুরীতে সবসময় সততা, নিষ্ঠা ও আইন অনুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করেছেন। তিনি লক্ষ্মীপুরে এসপি থাকাকালীন তৎকালীন বিরোধী দলীয় জামাত-বিএনপি নেতৃবৃন্দের হত্যাকাণ্ডেরও প্রতিবাদ করেছেন এবং এই জন্যই তাকে লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপার থেকে সরকার প্রত্যাহার করেছিল। আওয়ামী লীগ সরকার তাকে দীর্ঘদিন বরখাস্ত ও ওএসডি ও সর্বশেষ টুরিস্ট পুলিশে বদলি করে রেখেছিল। টুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজিপি হিসেবেই পুলিশের হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে চাকরি ছেড়ে ছাত্র আন্দোলনের সমর্থনে মিছিলে নেমেছিলেন।

তিনি আরও জানান, তাকে পলাতক দেখিয়ে বরখাস্ত করার প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে যে, সাময়িক বরখাস্তকালীন সময়ে তিনি বিধি মোতাবেক খোরপোষ ভাতা প্রাপ্য হবেন। তিনি আগস্ট ২০২৪ থেকে আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত ১৩ মাসের খোরপোষ ভাতা প্রদান এবং তার চাকরি ২৫ বছর পূর্ণ হওয়া ভাতা প্রদানের আবেদন করেছেন। তিনি বলেন, “আমি কিছু পাওয়ার জন্য ছাত্র আন্দোলনের সমর্থন করিনি এবং এখনো এর জন্য কোনো সুবিধা নিতে চাই না। নৈতিকতার কারণে ও আওয়ামী লীগের জঘন্য কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করেছি। আমি এখনো আর চাকরিতে যোগদান করতে চাইনি। তবে দুঃখ হল আমাকে পলাতক পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথে পলাতক দেখিয়ে বরখাস্ত করা দুঃখজনক।”

আলোচিত এই পুলিশ কর্মকর্তা অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামান টুকু ২০ ব্যাচের বিসিএস কর্মকর্তা। তার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহে। তার পিতা স্থানীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি। তার ছোট ভাই শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি। তার পিতা উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন আওয়ামী লীগ থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা করা মনিরুজ্জামান টুকু ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তাকে মুজিববাদী টুকু হিসেবে চিনতো।

চাকরিতে যোগদানের পর তাকে ২০০১ সালে চাকরিচ্যুত করা হয়। এক এগারোর পর চাকরিতে যোগদান করলেও আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম দিকে ভালোভাবে চাকরি করেন। পরবর্তীতে তিনি ধর্মীয় গবেষণায় নিয়োজিত হয়ে পবিত্র কোরআনের বাংলা অনুবাদ তাফসীরসহ ধর্মীয় কয়েকটি বই প্রকাশনা করেন। ট্রাফিক বিভাগে ঢাকা মেট্রোপলিটনের চাকরিকালীন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উপরে একটি বই লিখে প্রশংসিত হন। তিনি রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় বসবাস করেন। ওই এলাকার একটি বৃহৎ ভূমিদস্যু কোম্পানি তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে নানা অপপ্রচারে লিপ্ত। নানা অপকর্মের বিরুদ্ধে পুলিশের ভিতরে-বাইরে স্পষ্টবাদী হিসেবে প্রতিবাদ করায় তাকে অনেক হয়রানির শিকার হতে হয়েছে বলে জানা গেছে।