কুরআন শরিফের প্রথম বঙ্গানুবাদকারী
গিরিশ চন্দ্রের ভিটাবাড়ি ছাড়া সব সম্পত্তিই বেদখলে

বাংলা ভাষায় পবিত্র কুরআন শরিফের প্রথম বঙ্গানুবাদকারী ড. গিরিশ চন্দ্র সেন। শুধু বাংলাদেশে নয় সমগ্র উপমহাদেশেই গিরিশ চন্দ্র সেনের পরিচিতি রয়েছে। তিনি নরসিংদী জেলার পাঁচদোনা গ্রামে বিখ্যাত দেওয়ান বৈদ্য বংশে জন্মগ্রহণ করেন। দীর্ঘদিন অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকার পর তার বাড়িটিকে নতুন রূপ দিয়েছে সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ। ওই বাড়ির পাশেই গড়ে উঠেছে ভাই গিরিশ চন্দ্র সেন জাদুঘর। ইতিহাস ঐতিহ্যের অন্বেষণে প্রতিবছর অসংখ্য লোক তার স্মৃতিচিহ্ন দেখতে আসেন। তবে ওই বাড়িটি ছাড়া বাকি সম্পত্তি বেদখলে চলে গেছে। সেগুলো উদ্ধার করে সেখানে গিরিশ চন্দ্র সেনের নামে একটি লাইব্রেরিসহ আরও কিছু স্মৃতি রক্ষাকারী স্থাপনা করার পক্ষে মত স্থানীয়দের।
ভাই গিরিশ সেন ১৮৮৬ সালে কুরআনের প্রথম সম্পূর্ণ বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেন। যা বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য একটি মাইলফলক। তার এই অনুবাদ কর্মের জন্য আজও মানুষ তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
আরও পড়ুন: নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছে কিছু পক্ষ: সালাহউদ্দিন
জানা যায়, নরসিংদীর পাঁচদোনা গ্রামে ১৮৩৪ সালে জমিদার পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মাধবরাম সেন। পিতামহ ইন্দ্রনারায়ণ সেনের ভাই দর্পনারায়ণ নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর দরবারের প্রভাবশালী অমাত্য ছিলেন। নবাব তাকে রায় উপাধি প্রদান করেন। হিন্দু পরিবার হলেও তাদের সুনাম-সুখ্যাতি বা প্রভাব-প্রতিপত্তির কেন্দ্রবিন্দু ছিল আরবি-ফার্সি ভাষাসংশ্লিষ্ট পাণ্ডিত্য ও জ্ঞানে।
১৮৭৬ সালে লখনৌ যান গিরিশচন্দ্র সেন। ৪২ বছর বয়সে তিনি মৌলভী এহসান আলীর কাছে আরবি ব্যাকরণ জ্ঞান লাভ করেন। ১৮৭৮ সালে বন্ধু জালাল উদ্দিনের মাধ্যমে কুরআন শরিফ কিনে অধ্যয়ন আরম্ভ করেন। ৩ বছর কঠোর সাধনার পর ১৮৮১ সালে প্রথম পারা শেরপুর চারুচন্দ্র প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। পরে কলকাতায় মাসে মাসে মুদ্রিত হতে থাকে কুরআনের অনুবাদ। পরবর্তী ২ বছর পর পুরো কুরআন মুদ্রিত হয়।
আরও পড়ুন: জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের সংঘর্ষ, সেনা মোতায়েন
গিরিশ চন্দ্রের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩৩টি। তার মধ্যে বাংলায় পবিত্র কুরআনের অনুবাদসহ ইসলাম ধর্মবিষয়ক গ্রন্থ ২২টি। কঠোর পরিশ্রমের ফলে একপর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯০৯ সালে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং ১৯১০ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকায় মারা যান। তার ইচ্ছানুযায়ী গ্রামের বাড়িতে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
ইসলামে পাণ্ডিত্যের কারণে তিনি ‘ভাই’ ও ‘মৌলভী’ উপাধি পান। এলাকার কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ভুয়া আত্মীয়-স্বজন সেজে এবং ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে গিরিশ চন্দ্র সেনের ভিটাবাড়িসহ যাবতীয় সম্পত্তি দখল করে নিয়েছে। এ মহৎ মানুষটির স্মৃতি রক্ষায় নেই কোনো উদ্যোগ। তার মৃত্যুর ১১৫ বছর পরও তার জন্মস্থানে এ পর্যন্ত কোনো স্মৃতি ফলকও নির্মিত হয়নি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, তার স্মৃতিচিহ্ন বলতে এখন শুধু রয়েছে ১.৩৬ শতাংশ বসতবাড়ি। যা বর্তমানে ভাই গিরিশ চন্দ্র সেন জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে নরসিংদী সদর উপজেলার পাঁচদোনা মেহেরপাড়ায় অবস্থিত ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের বাড়িটি ২০০৮ সালে মূল কাঠামো অক্ষত রেখে সংস্কারে অনুদান দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে ভারতীয় হাইকমিশন। পরে ২০১৫ সালে নরসিংদী জেলা প্রশাসন ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা কেন্দ্র ঐতিহ্য অন্বেষণের মধ্যে বাড়িটি সংরক্ষণ ও একটি প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর নির্মাণের চুক্তি হয়। ২০১৭ সালে এর সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, ভারতীয় হাইকমিশন থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা অনুদানও পায় ঐতিহ্য অন্বেষণ। পুরোনো চেহারায় ফিরিয়ে এনে বাড়িটি একটি জাদুঘরে পরিণত করা হয়েছে। এখানে তুলে রাখা হয়েছে গিরিশ চন্দ্র সেনের ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও তার লেখা বই। তবে তার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী কেউ পালন করে না এখানে। এমনকি সরকারিভাবেও জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয় না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জমিদার মাধবরাম সেন রায়ের ৯ সন্তানের মধ্যে গিরিশ চন্দ্র সেন ছিলেন সবার ছোট। ১৮৫৬ সালে তিনি বর্তমান পলাশ উপজেলার বাগপাড়া গ্রামের জয়কালী দেবী নামে এক জমিদারের মেয়েকে বিয়ে করেন। সংসার জীবনে ১৮৬৯ সালে একটি মেয়ে সন্তান জন্ম নিলেও তা জন্মের ১৪ দিনের মাথায় মারা যায়। এরপর এক বছরের ব্যবধানে স্ত্রী জয়কালী দেবীও মারা গেলে গিরিশ চন্দ্র সেন আর বিয়ে করেননি। যার কারণে গিরিশ চন্দ্র সেন কোনো উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারেননি। তার প্রচুর জায়গা-জমি থাকলেও বাড়িটি ছাড়া সব সম্পত্তি বেদখল হয়ে গেছে।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে বাড়িটি দেখভাল করছেন গিরিশ চন্দ্র সেন জাদুঘরের পরিচালক কাউছারুল হক কানন। তিনি জানান, পণ্ডিত গিরিশ চন্দ্র সেনের বর্তমানে ১ দশমিক ৩৬ শতাংশ বাড়িটি ছাড়া বাকি সম্পত্তি বেদখলে চলে গেছে। সরকার যদি বেদখল হয়ে যাওয়া সম্পত্তিগুলো উদ্ধার করে দেয় তাহলে বাড়ির পাশে কিছু জায়গা সম্প্রসারিত করে সেখানে গিরিশ চন্দ্র সেন নামে একটি লাইব্রেরি, বাড়ির প্রধান ফটকসহ সীমানা প্রাচীর ও আরও কিছু প্রদর্শনী স্থাপন করা যেত।
মেহেরপাড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন জানান, গিরিশ চন্দ্র সেনের ভিটাবাড়িটি মূলত ২.৯৪ শতাংশের। পরে সরকার বাড়ির সামনে ব্যক্তিমালিকানা থেকে ২.৪৬ শতাংশ ভূমি অধিগ্রহণ করার প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন।
নরসিংদী সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী তামান্না আক্তার রাবেয়া বলেন, আমরা পাঠ্যপুস্তকে গিরিশ চন্দ্র সেনকে কুরআনের বাংলা অনুবাদক হিসাবে জেনেছি। কিন্তু এ মহান ব্যক্তির বাড়ি নরসিংদীতে হওয়া সত্ত্বেও তার জীবন ও কর্ম সম্পর্কে তেমন জানা সম্ভব হয়নি। আমরা সরকারের কাছে আশা করব এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
গিরিশ চন্দ্র সেন গণপাঠাগারের সভাপতি মোহাম্মদ শাহীনুর মিয়া বলেন, ভিটাবাড়ির প্রায় শতাধিক শতাংশ জমি রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে রয়েছে মাত্র ১.৩৬ শতাংশ জমি। বাকি যাবতীয় সম্পত্তি তার আত্মীয়-পরিজন সেজে ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে।
এ ব্যাপারে কথা বলতে একাধিকবার নরসিংদী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রাশেদ হোসেন চৌধুরী সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি অসুস্থ থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।