আন্দোলন দমনে নেতৃত্ব দেওয়া মঞ্জুর চেয়ারম্যান এখনও বহাল তবিয়তে

Sadek Ali
আশিকুর রহমান নরসিংদী
প্রকাশিত: ২:৫৮ অপরাহ্ন, ২৭ অগাস্ট ২০২৫ | আপডেট: ৪:০০ পূর্বাহ্ন, ৩০ অগাস্ট ২০২৫
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সারাদেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে গণহত্যা ও গণগ্রেপ্তার, শিক্ষর্থীরদের ওপর হামলার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ২ আগস্ট গণমিছিল করছিল আন্দোলনকারীরা। এরই অংশ হিসেবে একই দাবিতে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার শ্রীরামপুর রেলগেইট এলাকায় আন্দোলন করছিলেন বৈষম্য বিরোধী ছাত্ররা। এসময় রায়পুরা উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ মঞ্জুর এলাহীর নেতৃত্বে ততকালীন সাবেক এমপি রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু ও সাবেক উপজেলার চেয়ারম্যান লায়লা কানিজ লাকি’র নির্দেশে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের কয়কশত নেতাকর্মী মিলে শ্রীরামপুর রেলগেইটে অবস্থানরত ছাত্রদের ওপর আর্তকিত হামলা চালিয়ে বহু ছাত্রকে আহত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও পরিষদের বিভিন্ন অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের অপরাধও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সেই সাথে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের সাথে ছবি তুলে তা আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে করছেন প্রচার। এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সময় মত চালাচ্ছেন পরিষদ, আছেন বহাল তবিয়তে। তবে তিনি এসব কথা মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেন।  স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, তৎকালীন স্থানীয় সাবেক এমপি, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুর হাত ধরে তিনি আওয়ামী রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। অল্পসময়ে রাজুর আস্থা অর্জন করেন তিনি। পেশীশক্তি ও প্রশাসনের ওপর ভর করে ভোট কেন্দ্র দখল এবং জোরপূর্বক একাধিকবার তাকে মির্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু। পরে তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ পদটিও ভাগিয়ে নেন। দলীয় ও এমপির প্রভাব দেখিয়ে তিনি পরিষদের বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাত, অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, জমিদখল এবং এলাকায় প্রভাববিস্তার ছিল চোখে পড়ার মত। 

স্থানীয় এলাকাবাসী বাংলাবাজার প্রতিনিধিকে জানান, ততকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি এতটাই প্রভাবশালী ছিলেন যে তার বিরুদ্ধে থানা পুলিশ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ করতেন না। সেই কারণে তিনি হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য। যখন যা ইচ্ছা তা তিনি করে বেড়াতেন। আর এগুলো করার সাহস পেতেন ততকালীন সাবেক এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানের কল্যাণে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাব বিস্তাররকে কেন্দ্র করে একাধিকবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হলেও থানায় হয়নি তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা অভিযোগ। ভুক্তভোগী অনেকেই তার বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলে ওই ভুক্তভোগী ও পরিবারের উপর চলে নানান অত্যাচার। ফলে ভয়ে কেও আর তার বিরুদ্ধে মামলা বা অভিযোগ করে সাহস পায় না। গত জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্ররা যখন তাদের ন্যায অধিকার আদায়ে রাজপথে। সেই আন্দোলন দমাতে ছাত্রদের ওপর হামলা চালিয়ে ছিল চেয়ারম্যান মঞ্জুর এলাহী। সে সাবেক এমপি রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান লায়লা কানিজ লাকি’র ছত্রছাঁয়ায় পুরো উপজেলায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। ওইসময় তার ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পেত না। বিগত সময়ে সে একক সিদ্ধান্তে ইউনিয়ন পরিষদ পরিচালনা করেছে। পরিষদের কোনো সদস্যকে সে মূল্যায়িত করেনি। বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। বিচারের নামে সে প্রহসন করেছে। অনেককে গ্রাম ছাড়া করেছে। ৫ আগষ্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর কয়েকদিন গা ঢাকা দিয়েছিলেন তিনি। পরে আবার স্থানীয় কয়েকজনকে মেনেজ করে আসেন গ্রামে। সেই সুবাদে চালাচ্ছেন পরিষদও।

আরও পড়ুন: শেরপুরে শিক্ষার্থী মায়মুনা হত্যার রহস্য উদঘাটন, গ্রেপ্তার মূল আসামী আপন ফুফা

ভিন্ন সূত্রে জানা যায়, মঞ্জুর এলাহী উপজেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োজিত। তিনি সদ্য গ্রেফতার হওয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও পূর্ণবাসন সম্পাদক লায়লা কানিজ লাকি’র অত্যন্ত বিশ্বস্ত লোক। সে সুবাদে লাকির যত অপকর্ম তিনি দেখবাল করতেন। লাকি গ্রেফতার হওয়ার আগে মঞ্জুর এলাহী বেশ কয়েকবার গোপন স্থানে তার সাথে একাধিক বার দেখা করেন এবং লাকির নগদ অর্থ ও সোনা-গহনা মঞ্জুর চেয়ারম্যানের কাছে গচ্ছিত রাখেন বলে জানা যায়।

জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহসীন হোসেন বিদ্যুৎ বাংলাবজার প্রতিনিধিকে বলেন, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহসিন হোসেন বিদ্যুৎ বলেন, সে (মঞ্জুর এলাহী) ভোটার বিহীন চেয়ারম্যান। সে ফ্যাসিস্ট হাসিনার দোসর। তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে তার ভূমিকা রয়েছে। তার নেতৃত্বে ছাত্র-জনতার উপর হামলা হয়েছে। বর্তমানে সে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দলের (বিএনপি) কিছু লোক তার সাথে ছবি তুলে পোস্ট করেছে। এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুর্ণ হচ্ছে। এধরণের কাজ যারা করছেন তাদের কোন ছাড় নয়। দল থেকে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্হা নেওয়া হবে। 

আরও পড়ুন: গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জে বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের সংঘর্ষ, আহত ২০ জন

উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান খোকন বলেন, তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে। সে ফ্যাসিস্ট হাসিনার দলের লোক। তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। যারা তাকে মদদ দিচ্ছেন তারা দলের কেও না। তার চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত লোক। এবিষয়ে আমি দলের প্রত্যেক নেতা-কর্মীদের সতর্ক করে দিয়েছি। স্পষ্ট ভাবে দল থেকে বল হয়েছে যারা আওয়ামী লীগের দোসরদের আশ্রয়-প্রশয় দিবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্হা নেওয়া হবে।

এবিষয়ে জানতে চেয়ারম্যান মঞ্জুর এলাহী’র সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, আমি আওয়ামী লীগ করি তা স্বীকার করছি। তবে কোনো দূর্নীতি করি নাই। আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা। ৫ আগষ্টের পর আর আওয়ামী লীগ করি না। ৫ তারিখের পর উপরে ম্যানেজ কর এলাকায় এসে পরিষদ চালাই। তাছাড়া আন্দোলনের সময় আমি ঢাকায় ছিলাম। আর চেয়ারম্যান হিসেবে উপজেলা চেয়ারম্যান ও এমপির ইশারায় চলতে হয়। তাদের ডাকে তখন সাড়া দিয়েছিলাম। এলাকার মানুষ আমাকে ভালোবাসে বলে এখনও পরিষদ চালাতে পারছি।