আলোচনায় নতুন আইজিপি দেলোয়ার, ডিএমপি কমিশনার কহিনুর মিয়া

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১২:৫৭ অপরাহ্ন, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৩:২৪ অপরাহ্ন, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিনই পুলিশের আইজিপি বাহারুল আলম পদত্যাগ করায় পুলিশের নতুন আইজিপি ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার নিয়োগ নিয়ে চলছে তোড়জোড়। জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা, পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতায় তলানিতে পৌঁছানো পুলিশ বাহিনীতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত চেইন অব কমান্ড প্রতিষ্ঠা ও জনমনে আস্থা তৈরির জন্য একটি দক্ষ পেশাদার পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যেই নতুন সরকার পুলিশের নেতৃত্ব বাছাই করছে। কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই বাছাই করা হচ্ছে পুলিশের প্রধান আইজিপি ও বড় অপারেশনাল ডিএমপি কমিশনার পদ।

পুলিশ বাহিনীর বর্তমান কর্মরত হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি দেলোয়ার হোসেন মিয়া ১২তম ব্যাচের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ। দীর্ঘ স্বৈরশাসনের সময় পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে অবশেষে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আবেদনের প্রেক্ষিতে তাকে আবারও চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়। চাকরি ফিরে পেলেও অন্তর্বর্তী সরকার জ্যেষ্ঠতার প্রেক্ষিতে তাকে যথাযথ সম্মান করেনি। নীরব পেশাদারিত্ব নিয়ে দেড় বছর ধরে হাইওয়ে পুলিশকে গড়ে তুলছেন। নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপির নতুন সরকারের আইজিপি নিয়োগের পছন্দের তালিকায় কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে সর্বজ্যেষ্ঠ হওয়ায় তাকেই চূড়ান্ত—এমন খবর পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন: বাংলাদেশ-সৌদি সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে: তারেক রহমান

বিসিএস পুলিশের ১২তম ব্যাচের একমাত্র তিনিই এখনো কর্মরত আছেন। অন্য সবাই অবসরে গেছেন। পরবর্তী ১৫তম বিসিএস পুলিশে আইজিপির দৌড়ে আছেন আর্মড পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি আলী হোসেন ফকির। তিনিও পদোন্নতির দীর্ঘ বঞ্চনার পর চাকরি হারিয়েছিলেন। ১৫তম ব্যাচের অতিরিক্ত আইজিপি সর্বজ্যেষ্ঠতায় আছেন আওলাদ হোসেন ও আকরাম হোসেন। পুলিশ বাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে আইজিপি নিয়োগের ক্ষেত্রে সবাই ঐক্যবদ্ধ। কর্মরত সদস্যরা বাহিনীতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিপক্ষে।

৫ আগস্টের পর কর্মরতদের মধ্য থেকে ময়নুল ইসলামকে আইজিপি ও মাইনুল ইসলামকে ডিএমপি কমিশনার নিয়োগের পর পালিয়ে যাওয়া ভেঙে পড়া পুলিশ বাহিনীকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুনর্গঠন করেন। পিলখানার মতো রাজারবাগে পুলিশ সদস্যদের বিদ্রোহ পরিস্থিতিতে অস্ত্রের মুখে হাজির হয়ে পেশাদারিত্ব ও দক্ষতায় কৌশলে কমান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেন। ধীরে ধীরে পুলিশ বাহিনী সক্রিয় হয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনে।

আরও পড়ুন: শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালুর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

হঠাৎ করেই অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে একটি চক্র বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শের অবসরে যাওয়া বাহারুল আলমকে আইজিপি ও শেখ সাজ্জাদ আলীকে দুই বছরের চুক্তিতে ডিএমপি কমিশনার নিয়োগ করে। সাবেক আইজিপি খুদা বক্স চৌধুরীকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে বিশেষ সরকারি নিয়োগ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে শুরু হয় সরকারের প্রশ্রয়ে মব ভায়োলেন্স। পরবর্তী পুরো সময়টাই আইনশৃঙ্খলার অস্থিরতা ও পুলিশ বাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে।

নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পুলিশ বাহিনীকে পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলা পুনর্বহালে তৎপর হয়। কর্মরত ছাড়াও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে থেকে চুক্তিতে আইজি নিয়োগের তালিকায় আছেন আনসার উদ্দিন পাঠান ও এলপিআরে যাওয়া অতিরিক্ত আইজিপি মতিউর রহমান শেখ।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতম কাউকে আইজিপি নিয়োগ করা হলে বর্তমান ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাদ আলীকে উন্নীত বা সরিয়ে দিতে হবে। তিনি ৮৪ বিসিএস কর্মকর্তা ও সিনিয়র সচিব পদমর্যাদার। তিনিও আইজিপি হওয়ার তদবিরে আছেন। এক্ষেত্রে নতুন ডিএমপি কমিশনার নিয়োগ করাও জরুরি। পুলিশ বাহিনীর প্রধান অপারেশনাল ইউনিট এটি।

কর্মরতদের মধ্যে ডিএমপি কমিশনার তালিকায় শীর্ষে আছেন সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার ফারুক আহমেদ। ৫ আগস্ট-পরবর্তী পুলিশের পুনর্গঠনে তার ভূমিকা স্মরণীয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, ডিএমপি কমিশনার হিসেবে বর্তমান চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন কমিশনার হাসিব আজিজের নাম প্রধান আলোচনায়। তার বিগত দিনের কর্মকাণ্ড আলোচিত হচ্ছে। এছাড়াও চাকরির মেয়াদ থাকতেও অন্তর্বর্তী সরকার ১২তম ব্যাচের কর্মকর্তা কহিনুর মিয়াকে চাকরিতে যোগদান করতে দেয়নি। তার চাকরিতে যোগদান, পদোন্নতি-সহ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হিসেবে নিয়োগের বিষয়টি আলোচনায় জোরালো আছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বহিষ্কৃত এই কর্মকর্তা দীর্ঘ বঞ্চনা ও নির্যাতনের শিকার।

আইজিপির দৌড়ে এগিয়ে আসা অতিরিক্ত আইজিপি দেলোয়ার হোসেন মিয়া বাংলাদেশ পুলিশের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা, যিনি বর্তমানে হাইওয়ে পুলিশের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন (১৭ অক্টোবর ২০২৪ থেকে)। তিনি বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ১২তম ব্যাচের একজন কর্মকর্তা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার তাকে পুনরায় চাকরিতে পুনর্বহাল করে হাইওয়ে পুলিশের প্রধান হিসেবে পদায়ন করে।

দেলোয়ার হোসেন মিয়ার কর্মজীবন ও পরিচিতি:

বর্তমান পদ: প্রধান, হাইওয়ে পুলিশ (অতিরিক্ত আইজিপি)।

তিনি হাইওয়ে পুলিশের আইন প্রয়োগ ও বিশেষায়িত এই ইউনিটের দায়িত্বে আছেন। তিনি সব সময় জনমতকে সম্মান জানানোর কথা বলেছেন এবং বিগত অভ্যুত্থানের উদাহরণ দিয়ে জনমতের বিপক্ষে না যাওয়ার নীতিতে বিশ্বাসী।

তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট হাইওয়ে পুলিশের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আইজিপি পদে সম্ভাব্য হিসেবে যাদের নাম আলোচনায় রয়েছে, তাদের মধ্যে দেলোয়ার হোসেন মিয়া অন্যতম।

মহাসড়কে নিরাপত্তা, দুর্নীতিমুক্ত পুলিশিং: পুলিশ সদস্যদের সততা, স্বচ্ছতা এবং জনমুখী পুলিশিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।

ঈদ ও বিশেষ নিরাপত্তা: ঈদ বা উৎসবকালীন যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে তিনি ড্রোন সার্ভেইল্যান্স ও ইন্টেলিজেন্স মনিটরিংয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছেন।

দেলোয়ার হোসেন মিয়া ১৯৯১ সালের ২০ জানুয়ারি সহকারী পুলিশ সুপার (ASP) হিসেবে পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করেন। তার দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পালন করেছেন:

সহকারী পুলিশ সুপার (ASP): তিনি ২-আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (APBn), রাঙামাটি এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (SSF)-এ দায়িত্ব পালন করেন।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (Addl. SP): এই পদে তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (DMP), নওগাঁ, গোপালগঞ্জ এবং খুলনা জেলায় কর্মরত ছিলেন।

পুলিশ সুপার (SP): তিনি দিনাজপুর জেলার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, স্পেশাল ব্রাঞ্চ (SB), ডিএমপি, এপিবিএন এবং সিআইডি (CID)-তে স্পেশাল সুপার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।

২০২২ সালের ১৮ অক্টোবর তাকে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার থাকাকালীন বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। ২০২৪ সালের আগস্টের পর তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয় এবং ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে ডিআইজি ও পরবর্তীতে ২ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।