জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন যুগোপযোগীকরণে সংস্কার জরুরি

স্বাস্থ্যকেন্দ্রভিত্তিক বাধ্যতামূলক নিবন্ধন চালুর সুপারিশ সাংবাদিক কর্মশালায়

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৮:১১ অপরাহ্ন, ০৪ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ৩:৫৮ পূর্বাহ্ন, ০৫ মার্চ ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

নাগরিকের আইনি পরিচয়, সাংবিধানিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইনকে যুগোপযোগী করে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রভিত্তিক বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবি উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যমান আইন ও বাস্তবায়ন কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে দেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের হার সন্তোষজনক নয়, যা নাগরিক অধিকার সুরক্ষা, জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা ও টেকসই উন্নয়ন ব্যবস্থাপনাকে ব্যাহত করছে। রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ভবনে অনুষ্ঠিত “বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন: অগ্রগতি, প্রতিবন্ধকতা ও করণীয়” শীর্ষক সাংবাদিক কর্মশালায় এসব মতামত তুলে ধরা হয়।

কর্মশালার আয়োজন করে প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান), গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই)-এর সহযোগিতায়। ৩ ও ৪ মার্চ অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী এই কর্মশালায় প্রিন্ট, টেলিভিশন ও অনলাইন গণমাধ্যমের ৩২ জন সাংবাদিক অংশগ্রহণ করেন। এতে বাংলাবাজার পত্রিকার সিনিয়র রিপোর্টার এম এম লিংকন ও অংশ গ্রহণ করেন। 

আরও পড়ুন: জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা: ব্যক্তিগত যানবাহন কমিয়ে গণপরিবহণ ব্যবহারের আহ্বান

নিবন্ধনের নিম্নহার : রাষ্ট্রীয় নথির বাইরে অর্ধেক নাগরিক

উপস্থাপিত তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে জন্ম নিবন্ধনের হার প্রায় ৫০ শতাংশ এবং মৃত্যু নিবন্ধনের হার ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রতিদিন অসংখ্য জন্ম ও মৃত্যু ঘটলেও তার প্রায় অর্ধেক রাষ্ট্রীয় রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এ বাস্তবতা নাগরিকদের একটি বড় অংশকে কার্যত রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা কাঠামোর বাইরে রেখে দিচ্ছে।

আরও পড়ুন: দুই রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও ৮ প্রতিমন্ত্রীর নতুন দায়িত্ব রদবদল

জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনকে নাগরিকের আইনি পরিচয় প্রতিষ্ঠার মৌলিক ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, নিবন্ধন সনদ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ, উত্তরাধিকার নির্ধারণ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তি এবং ভোটাধিকার প্রয়োগের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত। নিবন্ধনবিহীন অবস্থায় নাগরিকরা বাস্তবে ‘আইনগত অদৃশ্যতায়’ ভোগেন, যা শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, মানবপাচার ও সামাজিক বৈষম্যের ঝুঁকি বাড়ায়।

একই সঙ্গে নির্ভরযোগ্য জন্ম ও মৃত্যুর তথ্যের অভাবে জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা, জনসংখ্যাভিত্তিক বাজেট প্রণয়ন এবং প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় বলে মত দেন বক্তারা।

আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা ও সংস্কারের প্রস্তাব: 

আলোচনায় বলা হয়, বিদ্যমান আইনে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের দায়িত্ব মূলত পরিবারের ওপর ন্যস্ত। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিবন্ধন নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়নি। অথচ বর্তমানে দেশে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ শিশুর জন্ম স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হয়ে থাকে। স্বয়ংক্রিয় বা তাৎক্ষণিক নিবন্ধন ব্যবস্থা না থাকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জন্ম নিবন্ধনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার মালদ্বীপ, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা স্বাস্থ্যকেন্দ্রভিত্তিক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে প্রায় শতভাগ নিবন্ধন নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশেও একই ধরনের আইনি সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জরুরি।

তাদের মতে, আইন সংশোধনের মাধ্যমে—

স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত প্রতিটি জন্ম ও মৃত্যু তাৎক্ষণিকভাবে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা,

নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল স্বাস্থ্যতথ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত করা,

নিবন্ধন না করলে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নির্ধারণ করা,

—এগুলো নীতিগতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

‘আইন যুগোপযোগী ও কার্যকর বাস্তবায়ন অপরিহার্য’

ভাইটাল স্ট্র্যাটেজিস-এর কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “শতভাগ জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন অর্জনে বিদ্যমান আইন যুগোপযোগী করার পাশাপাশি আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।”

জিএইচএআই বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস বলেন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিবন্ধনের দায়িত্ব অর্পণ করা হলে জাতিসংঘের আঞ্চলিক সংস্থা United Nations Economic and Social Commission for Asia and the Pacific (ইউএনএসকাপ)-এর নির্ধারিত শতভাগ নিবন্ধন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে। একই সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ১৬.৯—সবার জন্য বৈধ পরিচয় নিশ্চিতকরণ—অর্জনে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

গণমাধ্যমের ভূমিকা: নীতিগত অগ্রাধিকার নিশ্চিতের আহ্বান

দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর ডেপুটি এডিটর সাজ্জাদুর রহমান বলেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন সংস্কারকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গণমাধ্যমকে তথ্যভিত্তিক ও ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। নিবন্ধনের বহুমুখী সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আইনি গুরুত্ব তুলে ধরার মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের ওপর ইতিবাচক চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কর্মশালায় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রজ্ঞা’র নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের। বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা করেন প্রজ্ঞা’র কর্মসূচি প্রধান হাসান শাহরিয়ার এবং কোঅর্ডিনেটর মাশিয়াত আবেদিন। 

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কেবল পরিসংখ্যানগত প্রক্রিয়া নয়; এটি নাগরিকত্বের স্বীকৃতি ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার মৌলিক ভিত্তি। আইন সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং প্রযুক্তিনির্ভর বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা গেলে দেশে সর্বজনীন নিবন্ধন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে—যা নাগরিক অধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনাকে অধিকতর শক্তিশালী করবে।