বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে আবারো অস্থিরতা
# হল গুলোতে রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও শিবিরের গুপ্ত রাজনীতিতে সহিংসতার আশঙ্কা।
# ঢাকা-রাজশাহী-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা।
আরও পড়ুন: আরো কয়েকটি জ্বালানি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে, পাম্পে দীর্ঘ অপেক্ষায় ক্রেতারা
# শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতির সম্পর্কে নির্বাচিত সরকারের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
ঢাকা, চট্টগ্রাম রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের প্রধান প্রধান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল নিয়ে ক্যাম্পাস গুলোতে আবারো অস্থিরতা বিরাজ করছে। ক্যাম্পাস দখল নিয়ে যে কোন সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করছে গোয়েন্দারা। তাদের মতে, ছাত্ররাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অধিকার রক্ষা ও মেধার চর্চা। কিন্তু বর্তমানে তা রাজনৈতিক দলের লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত হওয়ার
আরও পড়ুন: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখবে সরকার
প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যকার এই সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত কয়েক দিনে দেশের তিনটি কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। যার সূত্রপাত শুরু হয় চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে। এর রেশ পড়ে দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাঙ্গন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার ডাকসু ও শিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ছাত্রদলের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। তবে ২৪ এর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ১৭ জুলাই ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগ বিতারিত হওয়ার পর থেকে বড় সংঘর্ষে জড়ায়নি কোন ছাত্র সংগঠনই। উত্তেজনা থাকলেও ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে নির্বিঘ্নে। কিন্তু দীর্ঘদিন পর আবারো ক্যাম্পাস আবারও উত্তপ্ত হওয়ায় শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত হবে বলে করছেন শিক্ষার্থীরা। তবে বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে সংঘাত ও আধিপত্য বিস্তারের পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। আশঙ্কাজনক এমন পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যে অপরাজনীতিকে মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছিল, তার পুনরাবৃত্তি রোধে সোচ্চার হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন রাজনীতি বিশ্লেষকেরা। একই সুর ধ্বনিত হচ্ছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদের কণ্ঠে। তারা ক্যাম্পাসে আধিপত্যবাদী মনোভাব পরিহার করার পাশাপাশি ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা না দিতে ছাত্রসমাজের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতি চলমান থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে বলে ধারণা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারকদের। তারা মনে করেন, আওয়ামী লীগের শেষ দিকে ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রলীগের একক আধিপত্য ছিল। সে সময় বিরোধী দলগুলো ক্যাম্পাসে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। তখন ছাত্রলীগের নিজেদের মধ্যে সংঘাতের পাশাপাশি বিরোধী দলের সঙ্গে খুব একটা সংঘাত হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্রদল এবং শিবির উভয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকায় কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না।
চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ১৭ জুলাই ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগ বিতারিত হওয়ার পর থেকে বড় সংঘর্ষে জড়ায়নি কোন ছাত্র সংগঠনই। উত্তেজনা থাকলেও ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে নির্বিঘ্নে। কিন্তু দীর্ঘদিন পর আবারো ক্যাম্পাস আবারও উত্তপ্ত হওয়ায় শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত হবে বলে করছেন শিক্ষার্থীরা। তবে কয়েকজন সাধারণ শিক্ষার্থী জানান, ছাত্র রাজনীতি কেন হয়? মূলত উন্নয়নের জন্য। আমাদের কথা সরকারের কাছে পৌঁছানোর জন্য। কিন্তু বর্তমানে যে ছাত্র রাজনীতি হচ্ছে, আধিপত্য বিস্তারের জন্য বা ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য। যে কারণে পড়ালেখার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। মেইন স্ট্রিম রাজনৈতিক দলগুলোর স্টুডেন্ট উইংগুলো আছে, তারা সবাই সহাবস্থানে থাকুক, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে থাকুক। তবে শিক্ষাবিদদের মতে, ক্যাম্পাস রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। কেননা বর্তমান প্রজন্ম প্রচলিত ধারার ছাত্র রাজনীতি পছন্দ করছে না। শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে না পারলে, তা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য শুভ হবে না।
ঢাবির শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, ছাত্র রাজনীতির কৌশর পরিবর্তন করতে হবে। তাদের পরিকল্পনা ও কার্যক্রম ছাত্রদের কল্যাণমুখী হতে হবে। আমাদের শিক্ষার্থীরা ও জেন-জি এখন অত্যন্ত সচেতন। কোনো নেতিবাচক কৌশল তাদের থাকলে তারা পরাজিত হবে। মূল দলের জন্য সেটি ক্ষতিকর হবে। আর রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে ভূমিকা রাখা সব দলকে সংযত আচরণ করতে হবে। একই সাথে তারা বলছেন, সরকার ও প্রশাসনকে এসব ঘটনায় নীরব ভূমিকা রাখা যাবে না, কারণ বিভেদ বাড়লে তা আদতে সুবিধা দেবে পতিত শাসকদের।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিজিটিং ফেলো মোজাহেদুল ইসলাম বলেন, সংঘাত সংহিসতায় রূপ নিলে অবশ্যই আওয়ামী লীগ সেখানে একটি সুযোগ নিতে পারে। গণঅভ্যুত্থানের সময় যখন প্রতিষ্ঠিত সরকার পড়ে যায়, তখনই সামরিক সরকার ক্ষমতা দখলে নেয়। আবার কোনো কোনো জায়গায় দেখেছি বিরোধীদল বা অন্যান্য দল সরকার গঠন করে। ফলে রাজনৈতিক হানাহানি যেকোনো সময় যেকোনো দলকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বৈরাচার বিরোধী লড়াইয়ের গ্রাফিতি এখনো মুছে যায়নি, অথচ রাজনৈতিক সতীর্থরা এখন পরস্পর বিরোধী লড়াইয়ের ভূমিকা নিচ্ছে। এটি রাজনীতি ও দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয় বলেও মত বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, দ্রুত ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে শৃঙ্খলা ও শিষ্টাচার না ফিরলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ পুরোপুরি বিপন্ন হবে। গত কয়েক দিন ধরে ‘গুপ্ত’ শব্দ ব্যবহার ও ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুখোমুখি ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। চট্টগ্রাম সিটি কলেজের সংঘর্ষের রেশ কাটতে না কাটতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজধানীর শাহবাগ, পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ ও কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে দুই সংগঠনের সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। শাহবাগের ঘটনার পর ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ ও শোডাউন দিয়েছে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির। অভিযোগের আঙুল তুলেছে একে অপরের দিকে। তবে চলমান বিরোধ ছড়িয়ে পড়েছে ছাত্রদল ও শিবিরের অভিভাবক সংগঠন বিএনপি-জামায়াতের মধ্যেও। বিষয়টি গড়িয়েছে জাতীয় সংসদেও। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও উত্তপ্ত বিষয়টি ঘিরে। গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধের পাশাপাশি ছাত্রশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিও তুলছেন ছাত্রদলের অনেকে। টানা উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি অনড় অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। রাজনীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে যে বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা সহজে মিটবে না। দিন যত গড়াবে, সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটবে। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অস্থিতিশীল হওয়ার পাশাপাশি সরকারও চাপে পড়বে। দেশের রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র জাতীয় সংসদ। সম্প্রতি সংসদ অধিবেশনে জনপ্রতিনিধিদের পরস্পরবিরোধী উসকানিমূলক মন্তব্য ও অশোভন ভঙ্গি ছাড়িয়ে যাচ্ছে সংসদীয় শিষ্টাচারের সীমা। এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। শীর্ষ নেতাদের এমন মারমুখী অবস্থান কেবল সংসদেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এর নেতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে তৃণমূল পর্যায়ে। নেতাদের সন্তুষ্ট করতে এবং তাদের ‘মান বাঁচাতে’ কর্মীরা লিপ্ত হচ্ছেন পেশিশক্তির লড়াইয়ে। সংসদের এই উত্তাপ সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্কের সৃষ্টি করার পাশাপাশি বিশেষ করে দেশের ছাত্ররাজনীতির অঙ্গনকে চরম অস্থিতিশীল করে তুলেছে। বিশেষ করে ‘গুপ্ত’ শব্দটিকে কেন্দ্র করে হঠাৎ তেতে উঠেছে গোটা দেশ। বিশেষ করে ক্যাম্পাসগুলো। এই শব্দ প্রয়োগের জেরে সরকার ও বিরোধী দলের ছাত্র সংগঠন রীতিমতো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মেতে উঠেছে। গত তিন দিনে এ নিয়ে ১০টিরও বেশি ক্যাম্পাসে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আর ঢাবি ক্যাম্পাসে আরেকটু হলে তো খুনোখুনিই হয়ে যেত। পরিস্থিতি এমন, যে কোনো মূল্যে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে মরিয়া উভয় দল। বিশেষ করে সংসদে বসে থাকা মূল নেতাদের থেকে শুরু করে ওপরের ছাত্রনেতাদের মন পেতে নিচের দিকের পাতি নেতা ও কর্মী-সমর্থকরা রীতিমতো যেন ‘প্রাণহানির’ লড়াইয়ে মেতেছে।
এদিকে, ক্যাম্পাসগুলোতে সহিংসতার ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, আবারও শিক্ষাঙ্গনে দখলদারিত্বভিত্তিক পুরোনো ছাত্ররাজনীতি ফিরে আসছে। তারা বলছেন, সংঘর্ষ, মারামারি ও আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতি শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশকে নষ্ট করছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি করছে অনিশ্চয়তা। তারা বলেন, যদি ক্যাম্পাস আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তাহলে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ও পিছিয়ে যাবে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে। সেশনজটের গ্যাঁড়াকলে পড়ে নষ্ট হবে তাদের জীবনের মূল্যবান সময়। এ জন্য তারা সব ছাত্র সংগঠনের প্রতি ধৈর্যশীল ও সহমর্মী আচরণ প্রত্যাশা করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধান দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার অভাবই বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের মূল কারণ। সংসদে যখন একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করার ঘোষণা আসে, তখন সংলাপের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে সহযোগী সংগঠনগুলোর ওপর। অস্তিত্ব রক্ষায় ছাত্রদল বা ছাত্র শিবিরের মতো মাঠপর্যায়ের সংগঠনগুলো ক্রমেই মারমুখী হয়ে উঠছে। সমঝোতার পরিবর্তে আধিপত্য বিস্তারের এই মানসিকতা তৃণমূল পর্যন্ত বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়ছে, যা সুস্থ ধারার রাজনীতির পথকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। তারা মনে করছেন,দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে সংসদের বাগযুদ্ধ বন্ধ করে সমঝোতার পথে হাঁটা জরুরি। সংসদের উচ্চকণ্ঠ যেন রাজপথের কর্মীদের উসকে না দেয়, সেদিকে জাতীয় নেতাদের বিশেষ নজর দিতে হবে। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মতো সংগঠনগুলোকে ধ্বংসাত্মক পথ পরিহার করে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে ফিরে আসতে হবে। অন্যথায়, সংসদের এই তপ্ত বাক্য বিনিময় এবং রাজপথের রক্তাক্ত লড়াই সাধারণ মানুষকে রাজনীতিবিমুখ করে তুলবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনবে। একইসুরে কথা বলেছেন দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ। তাদের মতে, ছাত্ররাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অধিকার রক্ষা ও মেধার চর্চা। কিন্তু বর্তমানে তা রাজনৈতিক দলের লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যকার এই সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংসদের ভেতর আলোচনার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং নেতাদের পরিশীলিত বক্তব্য ও আচরণ নিশ্চিত না হলে রাজপথের এই অস্থিরতা কমানো সম্ভব নয় বলে মনে করেন তারা।
এ বিষয়ে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কৌশলগত ঐক্য ও সহাবস্থানে ফাটল ধরতে শুরু করেছে। সম্প্রতি রাজপথ ও বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে এই দুই সংগঠনের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নিয়েছে, যা রাজনীতিতে পুনরায় পেশিশক্তির দাপটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই অপরাধ বিশেষজ্ঞের ভাষায়, এই সংঘাত কেবল জনজীবনকে বিপর্যস্ত করছে না, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে শিক্ষার পরিবেশকে করে তুলছে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত। তিনি মনে করেন, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের নেপথ্যে নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শন করার একটি সুপ্ত প্রতিযোগিতার অংশ হতে পারে। তিনি বলেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজপথে ছাত্ররাজনীতির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে সেই মনস্তাত্ত্বিক লড়াই থেকেই এই সংঘাতের সূত্রপাত হতে পারে। ছাত্রদল চাইছে দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে একক শক্তিতে মাঠে ফিরতে, অন্যদিকে ছাত্রশিবির তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি জানান দিতে মরিয়া। ফলে সামান্য উসকানিও বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আতিকুর রহমানের মতে, সংসদীয় শিষ্টাচার-বহির্ভূত আচরণ কিভাবে ক্যাম্পাস তথা রাজপথকে রক্তাক্ত করে, বর্তমান সংঘাত তারই প্রতিফলন। সংসদের উত্তাপ যখন রাজপথে অস্ত্রের ভাষায় অনূদিত হয়, তা গণতন্ত্রের জন্য চরম অশনিসংকেত। এদিনের সঙ্গে আলাপকালে এই বিশ্লেষক বলেন, সংসদে বিরোধী কণ্ঠ দমন বা ঢালাও আক্রমণের সংস্কৃতি কর্মীদের মাঝে শান্তিপূর্ণ পথ রুদ্ধ হওয়ার বার্তা দিচ্ছে। ফলে ছাত্র সংগঠনগুলো আদর্শিক লড়াই ছেড়ে সহিংসতাকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে বেছে নিচ্ছে। মূলত সংসদীয় অসহিষ্ণুতাই ছাত্ররাজনীতিকে পেশিশক্তির প্রদর্শনী কেন্দ্রে পরিণত করছে, যা গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য দীর্ঘমেয়াদী হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ৫ আগস্টের আগে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে, সেই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি তারা কখনোই চায় না। মানুষ এখন মৌলিক পরিবর্তন প্রত্যাশা করে, যা কেবল প্রশাসনিক সংস্কার বা কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই পরিবর্তন প্রতিফলিত হতে হবে মানুষের আচরণে, রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতাকর্মীদের কার্যক্রমে এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক চর্চায়। প্রকৃত পরিবর্তন কাঠামোতে নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আচরণগত রূপান্তরের মধ্যে নিহিত। তিনি বলেন, এই সময়ে এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত নয়, যা সরকারের স্থিতিশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।





