নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতা: ৭০% আসামি খালাস

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৮:০৫ অপরাহ্ন, ০২ মে ২০২৬ | আপডেট: ৯:৩০ অপরাহ্ন, ০২ মে ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুতর কাঠামোগত দুর্বলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতার চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাক-এর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, এসব মামলার প্রায় ৭০ শতাংশে আসামিরা খালাস পাচ্ছেন, যেখানে দণ্ডের হার মাত্র ৩ শতাংশ—যা বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়।

শনিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক পরামর্শ সভায় ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং উক্ত প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিরসনের কার্যকর উপায় চিহ্নিতকরণ’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। গবেষণাটি দেশের ৩২ জেলায় ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত নিষ্পত্তিকৃত ৪ হাজার ৪০টি মামলার নথি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রণয়ন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: ৩ মে রবিবার থেকেই শুরু হাওরের কৃষকের কাছ থেকে ধান-চাল সংগ্রহ

গবেষণায় বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার অভাবকে প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে একটি মামলার গড় নিষ্পত্তিকাল দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৭০ দিন, অর্থাৎ প্রায় ৩.৭ বছর। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার করে শুনানির তারিখ পড়েছে, যা বিচারপ্রক্রিয়ার অস্বাভাবিক বিলম্ব নির্দেশ করে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, মোট মামলার ১৩ শতাংশ আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে—যা অনেক ক্ষেত্রে বিচারপ্রাপ্তির স্বচ্ছতা ও ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ করে।

আরও পড়ুন: চার দিনের ডিসি সম্মেলনে উঠছে ৪৯৮ প্রস্তাব

গবেষণায় বিচারপ্রক্রিয়ার বিলম্ব ও খালাসের উচ্চ হারের পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—অভিযোগকারী ও সাক্ষীর অনুপস্থিতি, ঘন ঘন সময় প্রার্থনা, তদন্তে অযৌক্তিক বিলম্ব, দুর্বল ফরেনসিক ও মেডিকেল প্রমাণ, এবং কার্যকর সাক্ষী সুরক্ষা ব্যবস্থার অনুপস্থিতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ত্রুটি বিচারব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ঘাটতির প্রতিফলন।

এ অবস্থায় আইন সংশোধনের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়ার সময়সীমা ১৮০ দিন থেকে কমিয়ে ৯০ দিন নির্ধারণ করা হলেও, বাস্তব কাঠামোগত দুর্বলতা অব্যাহত থাকলে এ ধরনের পরিবর্তন কার্যকর ফল বয়ে আনবে না বলে মত দেন সংশ্লিষ্টরা।

গবেষণার সুপারিশে বলা হয়েছে, আইনি সময়সীমার কঠোর তদারকি, অপ্রয়োজনীয় মুলতবি নিয়ন্ত্রণ, তদন্ত ও প্রসিকিউশনের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, সময়মতো ফরেনসিক ও মেডিকেল রিপোর্ট প্রাপ্তি, তদন্ত কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ভুক্তভোগীবান্ধব বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি অতিরিক্ত মামলার চাপ রয়েছে এমন জেলাগুলোতে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সহায়ক সেবা সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের মধ্যে বিচার বিভাগই সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত।” তিনি বাজেট বরাদ্দের বৈষম্য তুলে ধরে বলেন, বিচার বিভাগের সীমিত অর্থায়ন বিচারপ্রক্রিয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

তিনি আরও জানান, দেশে বিদ্যমান প্রায় ৪০ লাখ মামলা কমিয়ে ৪ লাখে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। তবে একটি মামলা থেকে একাধিক শাখা-প্রশাখা তৈরি হওয়া এবং দীর্ঘসূত্রতা এই প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে। বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়াতে কাঠামোগত সংস্কার, মানসিকতার পরিবর্তন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

সভায় সভাপতিত্বকারী আসিফ সালেহ বলেন, কেবল বাজেট বৃদ্ধি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; বরং জবাবদিহি, সুশাসন ও সমন্বিত দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তিনি ‘কালেকটিভ রেসপনসিবিলিটি’ বা সমষ্টিগত দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে বিচারব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের আহ্বান জানান।

স্বাগত বক্তব্যে শাশ্বতী বিপ্লব বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন, ২০০০ দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রণীত হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য ঘাটতি বিদ্যমান। কার্যকর ও সময়োপযোগী ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

গবেষণা উপস্থাপন করেন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ উম্মে কুলসুম। সভা সঞ্চালনা করেন ব্র্যাকের আইনি সহায়তা ও পলিসি অ্যাডভোকেসি বিভাগের লিড এ টি এম মোরশেদ আলম।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিসংখ্যান বিচারপ্রার্থীদের জন্য ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের প্রতিফলন, যা দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার ছাড়া নিরসন সম্ভব নয়।