স্বস্তি নিম্ন আয়ের পরিবারে

আগের দামেই বিদ্যুৎ পাচ্ছেন লাইফলাইন গ্রাহকরা

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ১০:০১ অপরাহ্ন, ০৪ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১০:০১ অপরাহ্ন, ০৪ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘোষণার মাত্র একদিনের মাথায় দেশের প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আবাসিক গ্রাহকদের লাইফলাইন (০-৫০ ইউনিট) এবং প্রথম ধাপের (০-৭৫ ইউনিট) ব্যবহারকারীদের জন্য ঘোষিত বাড়তি দাম প্রত্যাহার করেছে কমিশন। ফলে এ দুই শ্রেণির গ্রাহকদের বিদ্যুতের বিল আগের হারেই পরিশোধ করতে হবে।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিইআরসির নতুন সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, বিতরণ কোম্পানিগুলোর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে লাইফলাইন ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের বর্ধিত মূল্যহার কার্যকর করা হবে না। এর ফলে দেশের লাখো নিম্ন আয়ের পরিবার, শ্রমজীবী মানুষ এবং সীমিত বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহক সরাসরি উপকৃত হবেন।

আরও পড়ুন: ‘ভাই, এত ব্যস্ত হইয়েন না’: ছুটির বিষয়ে প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুতের দাম আংশিকভাবে স্থিতিশীল রাখা গেলেও উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট, ভর্তুকির চাপ এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান লোডশেডিং পরিস্থিতি এখনও বিদ্যুৎ খাতের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

একদিনেই সিদ্ধান্ত বদল: 

আরও পড়ুন: আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ৬ নবজাতকের মৃত্যু: তদন্তে ‘অবহেলার’ প্রমাণ, আইনি ব্যবস্থার ঘোষণা

গত ৩ জুন বিইআরসি পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের নতুন দাম ঘোষণা করে। ওই ঘোষণায় লাইফলাইন গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা এবং ০-৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের জন্য ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

ঘোষণার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভোক্তা অধিকার সংগঠন এবং সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপের বিষয়টি সামনে আসে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং বিতরণ কোম্পানিগুলো বিইআরসির কাছে মূল্যহার পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। সেই আবেদনের ভিত্তিতেই কমিশন মাত্র একদিনের ব্যবধানে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা এবং প্রথম ধাপের ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীদের জন্য ৫ টাকা ২৬ পয়সাই বহাল থাকবে।

কারা পাচ্ছেন সুবিধা: 

বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, দেশের বিপুলসংখ্যক নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার মাসে ৭৫ ইউনিটের কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকা, মফস্বল শহর এবং স্বল্প আয়ের নগর পরিবারের বড় অংশ এই শ্রেণির আওতায় পড়ে।

ফলে সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রভাব ফেলবে কয়েক কোটি মানুষের ওপর। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্যের মধ্যে বিদ্যুতের অতিরিক্ত ব্যয় থেকে আপাতত মুক্তি পাবেন এসব গ্রাহক।

অন্যান্য গ্রাহকদের জন্য বাড়তি বিল: 

যদিও ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীরা স্বস্তি পেয়েছেন, তবে অন্যান্য স্লাবের গ্রাহকদের জন্য নতুন মূল্যহার বহাল থাকছে। বিইআরসি জানিয়েছে, ৩ জুন ঘোষিত বর্ধিত মূল্যহার অন্যান্য সব গ্রাহক শ্রেণির ক্ষেত্রে কার্যকর হবে।

ফলে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্য উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারমূল্যের ওপরও পড়তে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

কেন বাড়ানো হলো বিদ্যুতের দাম: 

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ হিসেবে উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতিকে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।

বিইআরসিতে দেওয়া আবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। এতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ দাঁড়াবে প্রায় ১২ দশমিক ৯১ টাকা।

এই ব্যয় মেটাতে পাইকারি পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি ১ দশমিক ২০ টাকা থেকে ১ দশমিক ৫০ টাকা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দেয় বিপিডিবি। গত ২০ ও ২১ মে এ বিষয়ে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত এলএনজি, কয়লা, ফার্নেস অয়েল এবং আমদানিকৃত জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ভর্তুকির বোঝা আরও বাড়বে: 

বিইআরসি বলেছে, লাইফলাইন ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য পুরোনো মূল্যহার বহাল রাখার ফলে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর আয় কমে যাবে। এই ঘাটতি সরকারকে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিয়ে সমন্বয় করতে হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ইতোমধ্যে কয়েক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে সেই চাপ আরও বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক নিরাপত্তা বিবেচনায় প্রান্তিক গ্রাহকদের সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন হলেও দীর্ঘমেয়াদে ভর্তুকিনির্ভর ব্যবস্থা বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ভারসাম্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

লোডশেডিংয়ের বাস্তব চিত্র: 

দামের আলোচনা যতই সামনে আসুক, সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন বিদ্যুৎ সরবরাহের নিরবচ্ছিন্নতা।

রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ছিটেফোঁটা লোডশেডিং অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যা ও রাতের পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লে অনেক এলাকায় সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে।

গ্রামীণ অঞ্চলে পরিস্থিতি তুলনামূলক বেশি চ্যালেঞ্জপূর্ণ। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোথাও কোথাও দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হচ্ছে। কৃষি সেচ, ক্ষুদ্র শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও এর প্রভাব অনুভব করছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় পরিস্থিতি অনেক উন্নত হলেও গ্রীষ্মকালীন উচ্চ চাহিদা, জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং সঞ্চালন ব্যবস্থার কিছু দুর্বলতার কারণে নির্দিষ্ট এলাকায় লোডশেডিং পুরোপুরি এড়ানো যাচ্ছে না।

চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধান: 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গ্রীষ্ম মৌসুমে দেশের বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে ওঠানামা করছে। যদিও স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেশি, কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ ও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে সব কেন্দ্র একসঙ্গে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হয় না।

ফলে কিছু সময় চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়। এই ঘাটতি পূরণে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট এলাকায় সীমিত পরিসরে লোডশেডিং করতে হয়।

ভোক্তাদের প্রত্যাশা: 

সাধারণ গ্রাহকদের মতে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আগে সেবার মান নিশ্চিত করা জরুরি। নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ, দ্রুত ত্রুটি মেরামত এবং নির্ভরযোগ্য গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করা গেলে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে মানুষের আপত্তি কম হবে।

ঢাকার এক বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, “দাম বাড়লেও যদি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, মানুষ তা মেনে নেবে। কিন্তু বিলও বাড়বে, আবার লোডশেডিংও থাকবে—এটা গ্রহণযোগ্য নয়।”

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ: 

জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, ভর্তুকি সংকোচন এবং ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদার মধ্যে বিদ্যুৎ খাতকে টেকসই রাখা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

বিইআরসির সর্বশেষ সিদ্ধান্তে প্রান্তিক গ্রাহকরা স্বস্তি পেলেও বিদ্যুৎ খাতের মৌলিক সংকট দূর হয়নি। বরং উৎপাদন ব্যয় ও ভর্তুকির ভারসাম্য রক্ষা, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং লোডশেডিং কমিয়ে আনা—এই তিনটি বিষয়ই আগামী দিনে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় পরিণত হতে যাচ্ছে।

অন্তত আপাতত দেশের লাখো পরিবারের জন্য স্বস্তির খবর হলো—মাসে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে বাড়তি দাম গুনতে হবে না।