স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ বন্ধে অকার্যকর তালাক গ্রহণযোগ্য নয়: হাইকোর্ট

Sadek Ali
বাংলাবাজার ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৩৬ অপরাহ্ন, ১৬ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২:১২ অপরাহ্ন, ১৬ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

আইনগতভাবে প্রমাণিত বা কার্যকর না হওয়া তালাকের অজুহাতে স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ কিংবা দেনমোহর সংক্রান্ত আদালতের ডিক্রি বাস্তবায়ন বন্ধ করা যাবে না বলে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

সম্প্রতি বিচারপতি আবদুর রহমানের একক বেঞ্চ এ রায় দেন। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রায়ের অনুলিপি প্রকাশ্যে আসে।

আরও পড়ুন: ওয়ালটনের সাড়ে ৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ, পরিবেশক শামীমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

রায়ে হাইকোর্ট বলেন, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণের অধিকার মা-বাবার বৈবাহিক বিরোধ বা তালাকের অবস্থার ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি শিশুর একটি স্বতন্ত্র ও সুরক্ষিত আইনগত অধিকার, যা কোনো পরিস্থিতিতেই খর্ব করা যাবে না।

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন, কেবল তালাকের দাবি করলেই স্ত্রী বা সন্তানের প্রাপ্য ভরণপোষণ ও দেনমোহর পরিশোধের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়া যাবে না। তালাক আইন অনুযায়ী কার্যকর ও প্রমাণিত না হলে তা ডিক্রি বাস্তবায়নে বাধা হিসেবে বিবেচিত হবে না।

আরও পড়ুন: বহুল আলোচিত এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ধর্ষণ মামলায় রায়

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায়ের ফলে ভরণপোষণ ও দেনমোহর সংক্রান্ত মামলাগুলোর নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা মিলবে এবং নারী ও শিশুর অধিকার সুরক্ষায় এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হবে।

যে কারণে মামলাটি

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১১ সালে এক দম্পতির বিয়ে হয়। পরে স্ত্রী ও তাদের নাবালক কন্যা সন্তানের পক্ষে দেনমোহর ও ভরণপোষণের দাবিতে মামলা করা হয়। এ সময় স্বামী দাবি করেন, তিনি আগেই স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। তবে ফ্যামিলি কোর্টে তিনি আইন অনুযায়ী সেই তালাক প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন। ফলে আদালত স্ত্রী ও সন্তানের পক্ষে দেনমোহর ও ভরণপোষণের ডিক্রি দেন।

পরবর্তীতে স্বামী নতুন করে একটি ঘোষণামূলক মামলা করে তালাক কার্যকর হয়েছে বলে দাবি করেন এবং সেই মামলার অজুহাতে ভরণপোষণ ও দেনমোহরের ডিক্রির বাস্তবায়ন স্থগিতের আবেদন জানান। নিম্ন আদালত আবেদনটি খারিজ করলে তিনি হাইকোর্টে যান।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

রায়ে হাইকোর্ট বলেন, কেবল নতুন একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে এ কারণেই আগে দেওয়া চূড়ান্ত ডিক্রির বাস্তবায়ন বন্ধ করা যাবে না। কোনো সক্ষম আদালত ডিক্রি স্থগিত না করা পর্যন্ত সেটি কার্যকর থাকবে এবং এক্সিকিউশন কোর্ট তা বাস্তবায়নে বাধ্য।

আদালত আরও বলেন, আইন অনুযায়ী প্রমাণিত বা কার্যকর নয় এমন তালাকের কোনো আইনগত মূল্য নেই। এ ধরনের তালাক বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটায় না এবং ভরণপোষণ বা দেনমোহরের ডিক্রি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারে না।

ফ্যামিলি কোর্টের এখতিয়ার

রায়ে আদালত পুনর্ব্যক্ত করেন, বিবাহ, তালাক, দেনমোহর, ভরণপোষণ ও বৈবাহিক অধিকারসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির একমাত্র এখতিয়ার ফ্যামিলি কোর্টের।

একই সঙ্গে হাইকোর্ট বলেন, এক্সিকিউশন কোর্টের দায়িত্ব কেবল বিদ্যমান ডিক্রি বাস্তবায়ন করা। তালাক বৈধ কি না বা বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল আছে কি না এসব বিষয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার তাদের নেই।

নাবালক সন্তানের অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য

রায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার। মা-বাবার মধ্যে তালাক নিয়ে বিরোধ থাকলেও সন্তানের ভরণপোষণ বন্ধ করা যাবে না। কোনো পিতা তালাকসংক্রান্ত বিরোধের অজুহাতে সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব এড়াতে পারেন না।

অকার্যকর তালাক নতুন তালাকের পথে বাধা নয়

আদালত আরও বলেন, পূর্বে দাবি করা তালাক আইনগতভাবে অকার্যকর প্রমাণিত হলেও, স্বামী চাইলে আইন অনুযায়ী নতুন করে তালাক দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এতে আগের ডিক্রির আওতায় সৃষ্ট দেনমোহর ও ভরণপোষণের দায় থেকে তিনি মুক্তি পাবেন না।

চূড়ান্ত আদেশ

হাইকোর্ট রুল খারিজ করে নিম্ন আদালতের আদেশ বহাল রাখেন। একই সঙ্গে স্বামীকে দেনমোহরের বকেয়া এবং স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের সব বকেয়া ভরণপোষণ পরিশোধের নির্দেশ দেন।

আদালতে স্বামীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. শহিদুল ইসলাম। স্ত্রীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী তানজিলা রহমান ও ইফাত হাসান শাম্মি।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, ‘এই রায় পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আইন অনুযায়ী প্রমাণিত নয় এমন তালাকের অজুহাতে স্ত্রী বা নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ এড়ানোর সুযোগ নেই। একই সঙ্গে ফ্যামিলি কোর্টের একচ্ছত্র এখতিয়ার এবং নারী ও শিশুর আইনগত অধিকারও এ রায়ের মাধ্যমে আরও সুদৃঢ় হয়েছে।’