পিডিদের বেপরোয়া দুর্নীতিতে কৃষি উৎপাদনে ভাঁটা
বিএডিসি এখনো আওয়ামী দোসরদের লুটপাটের আখড়া
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনে (বিএডিসি) এখনো বহাল তবিয়তে আছে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ও আওয়ামী লীগের প্রভাব বিস্তারকারী কর্মকর্তারা। বিএডিসির আওতায় প্রকল্প পরিচালকদের বেপরোয়া দুর্নীতি ও পরিকল্পিত কারসাজিতে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সময়মতো সার, কীটনাশক, বীজ ও সেচসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা না করায় রাষ্ট্রীয় লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হচ্ছে এবং নতুন সরকার চাপে পড়তে যাচ্ছে। নতুন সরকারের নীতি-আদর্শ ও লক্ষ্যমাত্রা মানছে না পিডি কর্মকর্তারা।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের স্মারক নং: ০৪.০০.০০০০.০০০.৫১৪.০৬.০০০৩.২৫.১৯৪, তারিখ: ১২ এপ্রিল ২০২৬ অনুসারে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য সকল প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট সভা ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে আয়োজন করার নির্দেশ প্রদান করা হয়। কিন্তু সরকারি আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে বিএডিসির মোঃ আবীর হোসেন, মহাব্যবস্থাপক (সীড), সম্প্রতি ঢাকা থেকে কক্সবাজারে গিয়ে বিশাল বহর নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করেন। মহাব্যবস্থাপক (বীজ) মোঃ আবীর হোসেন বিএডিসিতে অপ্রতিরোধ্য। পতিত সরকারের এমন কোনো প্রভাবশালী মন্ত্রী নেই, যার সঙ্গে তাঁর আর্থিক ও ক্ষমতার সংশ্লিষ্টতা ছিল না।
আরও পড়ুন: চাকরির জন্য তরুণদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না: সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মোঃ আবীর হোসেনকে কেন্দ্র করে বিএডিসিতে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যাদের কাজ জামায়াত ও বিএনপির দুর্নীতিবাজ নেতাদের আর্থিকভাবে লাভবান করে স্বপদে বহাল থাকা। মোঃ আবীর হোসেনের সঙ্গে যুক্ত আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী হুমায়ুন কবির—প্রকল্প পরিচালক, জামায়াত নেতা মাহবুবর রহমান—যুগ্ম পরিচালক (বীজ), এবং নাজমুল হোসেন মানিক—প্রকল্প পরিচালক।
এই সিন্ডিকেট বিএডিসিকে আওয়ামী লীগের সরকারি অর্থ আত্মসাতের একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ দিয়েছিল, যা এখনো বহাল রয়েছে। মোঃ আবীর হোসেন পতিত সরকারের সাবেক মন্ত্রী ফারুক খানের নির্বাচনী এজেন্টের দায়িত্ব পালন করতেন। বিএডিসিতে সৎ কর্মকর্তা ও জাতীয়তাবাদী আদর্শের কর্মকর্তারা এই মহাব্যবস্থাপকের কাছে জিম্মি। কোনো অদৃশ্য শক্তির সহায়তায় বিএডিসির বর্তমান চেয়ারম্যানও এই সিন্ডিকেটের কাছেই জিম্মি। অফিস সংশ্লিষ্টদের জনশ্রুতি অনুযায়ী, আর্থিক লেনদেন রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
আরও পড়ুন: প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ডিপিইর নতুন নির্দেশনা
এছাড়া আরও জানা যায়, আর্থিক লেনদেনের কারণে এগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এ্যাব)-এর একটি অংশ এই সিন্ডিকেটকে সমর্থন করে। সরকারি নির্দেশ অমান্য করে বিশাল বহর নিয়ে সুদূর কক্সবাজারে কর্মশালার আয়োজনে আরও সংযুক্ত ছিলেন মজিবর রহমান, সদস্য পরিচালক; সেলিম হায়দার, অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (বীজ);সহ কয়েকজন।
এছাড়া সরকারকে বিব্রত করতে এই সিন্ডিকেট তৎপর। বিভিন্ন বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কেন্দ্রে পদায়ন করা হয়েছে আওয়ামী লীগের ধূসর সহযোগী ও সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের। অভিযোগ আছে, সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের ভাগিনা বিএডিসির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় পেঁয়াজের বীজ নিয়ে একটি কেলেঙ্কারি এই অপতৎপরতার একটি প্রমাণ। এছাড়া খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএডিসির বড় দুটি খামারের বীজ উৎপাদন, প্রসেসিং এবং মার্কেটিংয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সবাই আওয়ামী লীগ, নতুবা জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এই সংঘবদ্ধ চক্র বর্তমান নির্বাচিত সরকারকে বিব্রত করতে বদ্ধপরিকর। বিএডিসির সাধারণ কর্মকর্তাদের দীর্ঘশ্বাস—হাসিনার পতন হলেও হাসিনার এলাকার লোক, বিএডিসির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চেয়ার মহাব্যবস্থাপক (বীজ) পদে এখনো মো. আবীর হোসেন।
সম্প্রতি বিএডিসির সরবরাহকৃত ধানবীজকে ঘিরে নেত্রকোণার কেন্দুয়ায় দেখা দিয়েছে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ। প্যাকেটজাত বীজে একাধিক জাতের মিশ্রণ ধরা পড়ায় চলতি বোরো মৌসুমে ভয়াবহ উৎপাদন বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব দৃশ্যমান হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশায় ভুগছেন কৃষকরা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ মৌসুমে কেন্দুয়ায় ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ২১০০ টন। কিন্তু ব্রি-৮৮ জাতের নামে বিতরণকৃত বীজের সঙ্গে ব্রি-৮৯, ব্রি-৯২ ও ব্রি-২৯ জাতের সংমিশ্রণ থাকায় অন্তত ৫০০ টন উৎপাদন কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায়, বীজ মহাব্যবস্থাপক মো. আবীর হোসেনের ব্যর্থতা, নতুবা সরকারের খাদ্য উৎপাদন বাধাগ্রস্ত করতে সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) অধীনে স্বৈরাচারী পতিত লীগ সরকারের দোসর প্রকল্প পরিচালক মুজিবুর রহমানের বেপরোয়া ঘুষ-দুর্নীতির কারণে প্রকল্পের আওতায় সকল কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুধুমাত্র পিডির আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে।
সূত্রে আরও জানা যায়, লীগ সরকারের আমলে দাপট দেখিয়ে সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের ছত্রছায়ায় প্রকল্প পরিচালক পদটি বাগিয়ে নেন এই মহাধূর্ত কর্মকর্তা। প্রকল্পের পিডির দায়িত্ব পেয়ে গড়ে তুলেছিলেন সুবিশাল ঠিকাদার সিন্ডিকেট বাহিনী। সেই সিন্ডিকেট বাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করে গোপন দর প্রদান করে ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতেন তিনি। বিনিময়ে উক্ত কার্যাদেশের বিপরীতে অগ্রিম ১০% হারে কমিশন বাণিজ্য চালিয়ে গেছেন পিডি মুজিবর। 'মিস্টার ১০%' নামে পরিচিত বিএডিসির সাধারণ ঠিকাদারদের নিকট পিডি মুজিবের নাম। প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন নির্মাণকাজের দরপত্রের মাধ্যমে ঘুপচি টেন্ডারের কারসাজি করে বেপরোয়াভাবে ঘুষ-বাণিজ্য চালিয়ে গেছেন পিডি মুজিবর রহমান খান। অনেক জায়গায় নামমাত্র কাজ করে সমুদয় টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা যায়।
সূত্রে আরও জানা যায়, বিএডিসির বিদ্যমান সার গুদামসমূহের রক্ষণাবেক্ষণ, পুনর্বাসন এবং নতুন গুদাম নির্মাণের মাধ্যমে সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম জোরদারকরণ প্রকল্প (২য় পর্যায়) বিএডিসির “বিদ্যমান সার গুদামসমূহের রক্ষণাবেক্ষণ, পুনর্বাসন এবং নতুন গুদাম নির্মাণের মাধ্যমে সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম জোরদারকরণ” প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) মো. মজিবর রহমান খানের বেপরোয়া দুর্নীতি চালিয়ে গেছেন দেদারসে। রাতকে দিন আর দিনকে রাত বানানোই ছিল তাঁর কাজ। নিজের আখের গুছিয়ে লাগামহীন দুর্নীতির মাধ্যমে প্রকল্প থেকে সুবিধা নিয়েছেন। প্রকল্পের বিবরণ ও তথ্য অনুযায়ী, উক্ত প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল জুলাই ২০১৯ থেকে এবং জুন ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পের পিডি মুজিবরের অদক্ষতার কারণে পুরোপুরি ১০০% শেষ হয়নি আজও পর্যন্ত বলে একাধিক কর্মকর্তারা জানান। প্রকল্পের মোট বরাদ্দ প্রায় ৩৫০.৮৮ কোটি টাকা। বরাদ্দ থাকলেও সিংহভাগ টাকা পিডির পকেটে গেছে অতি নিম্নমানের সংস্কার ও মেরামতের কাজ করে, যা সরেজমিনে তদন্ত করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে মনে করেন বিএডিসির সাধারণ কর্মকর্তারা।
সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল—সার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ কার্যক্রম জোরদারকরণের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষির সামগ্রিক উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন। গুদাম নির্মাণের মাধ্যমে বিএডিসির সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের নন-নাইট্রোজেনাস সার সংরক্ষণক্ষমতা বর্তমান পর্যায়ের চেয়ে ৫০% বৃদ্ধির মাধ্যমে সার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম জোরদারকরণ। সুষ্ঠুভাবে ও সময়মতো প্রান্তিক কৃষকের দোরগোড়ায় সার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং গুদাম, অফিস রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি সরবরাহের মাধ্যমে সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। প্রকল্পের আওতায় সকল উন্নয়নমূলক কার্যক্রম দৃশ্যমান না হলেও পিডি মুজিবের আর্থিক সুবিধা নেওয়ার কারণে ডুবতে বসেছে প্রকল্পের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড।
মহা ঘুষখোর, দুর্নীতিপরায়ণ লীগের দোসর প্রকল্প পরিচালক মো. মজিবর রহমান খানের বিরুদ্ধে বেপরোয়াভাবে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ছেলের মাধ্যমে সেই সকল অভিযোগ আজও পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থাকলেও বিএডিসির কর্তৃপক্ষের নীরবতা ও অদৃশ্য শক্তির কারণে এখনো বহাল তবিয়তে আছেন তিনি। রাতারাতি ভোল পাল্টে বর্তমানে বিএনপিপন্থী দাবি করে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন দেদারসে বিএডিসিতে।
বিএডিসির সারা দেশে সার ব্যবস্থাপনা জোরদারকরণ এবং কৃষকের দোরগোড়ায় সার পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বিদ্যমান গুদাম সংস্কার ও নতুন গুদাম নির্মাণের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও পিডির আর্থিক দুর্নীতির কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রকল্পের আওতায় সকল উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড।
প্রকল্পের আওতায় যেসব স্থানে নতুন গুদাম নির্মাণ এবং পুরোনো গুদাম সংস্কারের কাজ সম্পন্ন হয়েছে, সেসব জেলায় নির্মাণ ও সংস্কারকাজে ব্যাপক কারচুপির হয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে। বিএডিসির সার গুদাম নির্মাণ ও সংস্কারকাজ যেসব জেলায় হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি জেলা হলো—রংপুর: রংপুরের আলমনগরে নতুন গুদাম নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। সেটিও ডিপিপির বাইরে হয়েছে।
দিনাজপুর: জেলার বিরামপুর উপজেলায় ৭২০০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার সার গুদাম ও অফিস ভবন নির্মাণ করা হয়েছে অতি নিম্নমানের।
ঠাকুরগাঁও: এখানে আধুনিক সার গুদাম নির্মাণ ও কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ: রায়গঞ্জে সাড়ে ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে অত্যাধুনিক সার গুদাম নির্মাণ করা হয়েছে। দরপত্রের চাহিদামাফিক হয়নি, সেখানেও দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা: বিএডিসি প্রাঙ্গণে আড়াই হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার নতুন গুদাম নির্মাণ করা হয়েছে। সেটাও একইভাবে অতি নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে নিজের আখের গুছিয়ে লাগামহীন দুর্নীতির মাধ্যমে প্রকল্প থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি।
নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ: এই দুই জেলায় সার মজুতের জন্য নতুন দুটি গুদাম নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মানিকগঞ্জ: বৃহত্তর ঢাকা সেচ এলাকা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নানা অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়েছে। সকল জায়গাতেই দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
বিএডিসি ওই প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশকে ২১টি অঞ্চলে বিভক্ত করে সার গুদাম রক্ষণাবেক্ষণ ও নতুন গুদাম নির্মাণে আর্থিক দুর্নীতি করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা।





