এলএনজি সংকটে অচল শিল্প, রান্নাঘরে হাহাকার—আর কতদিন এভাবে?

Sanchoy Biswas
এম এম লিংকন
প্রকাশিত: ৯:২২ অপরাহ্ন, ২৭ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ৩:১৯ পূর্বাহ্ন, ২৮ জুলাই ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

মহেশখালীর ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনালে (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটির পর দেশের জ্বালানি খাত এমন এক সংকটে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব এখন প্রতিটি পরিবারের রান্নাঘর, শিল্পাঞ্চলের উৎপাদন লাইন এবং নগর পরিবহনে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিনের পর দিন গ্যাসের চাপ না থাকায় চুলায় আগুন জ্বলছে না, শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে গেছে, বহু শ্রমিক কাজ না পেয়ে বসে আছেন। রাজধানীর সিএনজি স্টেশনগুলোতে দেখা গেছে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানবাহনের সারি। এ অবস্থায় সংকট কবে কাটবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের উৎকণ্ঠা বাড়ছে।

সংকটের মধ্যেই সরকারের দুই দায়িত্বশীল মন্ত্রীর বক্তব্যে সময়সীমা নিয়ে ভিন্ন বার্তা সামনে এসেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, আগামী সপ্তাহে এলএনজি সরবরাহের প্রায় ৫০ শতাংশ পুনরুদ্ধার হতে পারে এবং পরবর্তী সপ্তাহে শতভাগ সরবরাহ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে। ফলে সংকটের প্রকৃত সময়কাল নিয়ে মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

আরও পড়ুন: ২০১৮ সালের নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা ৩২ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাল সরকার

রাজধানীর রান্নাঘরে নেমেছে নীরব দুর্ভোগ: 

রাজধানীর পুরান ঢাকা, লালবাগ, হাজারীবাগ, ওয়ারী, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মিরপুর, উত্তরা, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, সবুজবাগ, খিলগাঁও, নতুনবাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে একই চিত্র। অধিকাংশ বাসায় দিনের বড় অংশজুড়ে গ্যাস থাকে না। কোথাও ভোরে আধাঘণ্টা, কোথাও এক ঘণ্টা গ্যাস এলেও দিনের বাকি সময় চুলা সম্পূর্ণ নিভে থাকে।

আরও পড়ুন: নিজেকে ছোট ভাববে না, নিজেকে গড়ে তোলো: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

ফলে গৃহিণীদের অনেকেই ভোররাতে ঘুম থেকে উঠে রান্না করতে বাধ্য হচ্ছেন। কেউ রান্না শেষ করতে পারছেন না, কেউ আবার না খেয়েই কর্মস্থলে যাচ্ছেন। স্কুলগামী শিশুদের সময়মতো নাশতা দেওয়া যাচ্ছে না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভর করছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

হাজারীবাগের গৃহিণী রেহানা বেগম বলেন, "রাত তিনটা থেকে ঘুম ভেঙে যায়। কখন গ্যাস আসবে, সেটার অপেক্ষায় থাকি। অনেক দিন শুধু ডাল-ভাত রান্না করেই দিন পার করছি।"

মিরপুর-১০ নম্বরের বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, "গ্যাস না থাকায় বাচ্চাদের নাশতা বানাতে পারছি না। অফিসে দেরি হচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন করে দুর্ভোগ শুরু হয়।"

লালবাগের নাসিমা আক্তার বলেন, "দুপুরের রান্না করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। বৃদ্ধ মা আর ছোট বাচ্চাকে নিয়ে খুব কষ্টে আছি।"

যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা আবদুল করিম বলেন, "গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে অফিসে দেরি হচ্ছে। এখন সংসারের সময়সূচিই বদলে গেছে।"

শিল্পে উৎপাদনের চাকা ধীর, ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে: 

গ্যাস সংকট সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে শিল্প খাতে। গ্যাসনির্ভর টেক্সটাইল, ডাইং, সিরামিক, কাচ, স্টিল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও অন্যান্য ভারী শিল্পে উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক কারখানায় বয়লার প্রয়োজনীয় চাপ না পাওয়ায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে।

শিল্পাঞ্চলের কয়েকজন উদ্যোক্তা জানান, অনেক শ্রমিককে উপস্থিত রেখেও কাজ দেওয়া যাচ্ছে না। উৎপাদন কমে যাওয়ায় রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শিল্প উৎপাদন দীর্ঘদিন ব্যাহত হলে শুধু উদ্যোক্তারাই নয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা: 

রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, ভোর থেকেই গাড়ির দীর্ঘ সারি। অনেক স্টেশনে গ্যাস না থাকায় মাইকিং করে চালকদের ফিরে যেতে বলা হচ্ছে। কোথাও সীমিত পরিমাণ গ্যাস এলেও কয়েকশ যানবাহনের সারি তৈরি হচ্ছে।

চালকদের অভিযোগ, গ্যাস সংগ্রহ করতেই দিনের অর্ধেক সময় চলে যাচ্ছে। এতে আয় কমে যাচ্ছে এবং যাত্রীদেরও চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

সংকটের মূল কারণ কী? 

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে।

দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু স্বাভাবিক সময়েও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয় মাত্র ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিনই প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি থাকে। এর সঙ্গে নতুন করে এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে ৯৫০ থেকে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়। মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

পেট্রোবাংলা কী বলছে: 

পেট্রোবাংলার জনসংযোগ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক তারিকুল ইসলাম সোমবার বাংলাবাজার পত্রিকা কে  বলেন, টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে সরবরাহ কমেছে। এটি পুরোপুরি সচল না হওয়া পর্যন্ত তিতাসের আওতাধীন এলাকার আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহকদের কম চাপের গ্যাস পেতে হবে। দ্রুত মেরামতের কাজ চলছে বলে তিনি জানান।

দুই মন্ত্রীর ভিন্ন বার্তা : 

এই সংকটের মধ্যে সরকারের দুই মন্ত্রীর বক্তব্য মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, এক্সিলারেট এনার্জি পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শেষ করতে পারলে আগামী সপ্তাহে সরবরাহের প্রায় অর্ধেক পুনরুদ্ধার হবে এবং তার পরের সপ্তাহে শতভাগ সরবরাহ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তিনি এটিও স্বীকার করেছেন যে এটি পুরোপুরি কারিগরি অগ্রগতির ওপর নির্ভরশীল এবং নির্দিষ্ট দিন-তারিখ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল পুরোপুরি সচল হতে এবং গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরতে আরও ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, দুই বক্তব্যের মূল লক্ষ্য একই হলেও সময়সীমা নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। সংকটের সময় সরকারের পক্ষ থেকে সমন্বিত বার্তা দেওয়া হলে জনমনে অনিশ্চয়তা কমে।

জ্বালানি আমদানির চাপ বাড়ছে: 

মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশকে এখন এলএনজি, এলপিজি ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানির ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। গত ছয় মাসে প্রায় ৩ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের জ্বালানি আমদানি করতে হয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে।

তিনি আরও জানান, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা বকেয়া বিল সরকারের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করছে।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রশ্ন : 

বর্তমান সংকট আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, একটি বড় অবকাঠামোতে কারিগরি সমস্যা দেখা দিলে পুরো দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা কীভাবে ঝুঁকির মুখে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার, এলএনজি অবকাঠামোর বিকল্প সক্ষমতা বৃদ্ধি, সংরক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ ছাড়া ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট এড়ানো কঠিন হবে।

মানুষের প্রশ্ন এখনো একটাই : 

সরকার আশ্বাস দিচ্ছে, মেরামত চলছে, সরবরাহ বাড়বে। কিন্তু রাজধানীর লাখো পরিবারের বাস্তবতা হলো—চুলায় এখনো আগুন জ্বলছে না, শিল্পে উৎপাদন পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি, সিএনজি স্টেশনের দীর্ঘ লাইনও কমেনি।

ফলে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন এখনো একই—সংকট কবে পুরোপুরি কাটবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু মেরামত শেষ হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ভবিষ্যতে যেন একটি কারিগরি ত্রুটিতে পুরো দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা অচল না হয়ে পড়ে, সেই সক্ষমতা গড়ে তোলাও এখন রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব।