ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কল্যানে কাজ করে যাচ্ছেন শামীম আকতার

Sanchoy Biswas
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশিত: ৫:২০ অপরাহ্ন, ৩১ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৫:২০ অপরাহ্ন, ৩১ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য অধিকার আদায় এবং বিলুপ্তপ্রায় লৌকিক সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সংগীত রক্ষায় মাঠপর্যায়ে নিরলসভাবে কাজ করে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন সংগীতশিল্পী ও গবেষক এস এম শামীম আকতার। তিনি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের কষ্ট বুকে ধারণ করে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বৈষম্য দূর করতে বিভিন্নভাবে কাজ করছেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের উপ-পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একজন নৃবিজ্ঞানী, লেখক ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা হিসেবেও পরিচিত। তাঁর গবেষণার অন্যতম বড় একটি মাইলফলক হলো তাঁর রচিত বই ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তার লৌকিক সংস্কৃতি’। অর্জন প্রকাশন থেকে প্রকাশিত এই বইটিতে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তিক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজ সংস্কৃতি, প্রাচীন বিশ্বাস, উৎসব এবং তাদের জীবনযাত্রার গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। আজকে তাঁকে জড়িয়ে একটি কুচক্রী মহল নানাভাবে ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। এতে ক্ষুব্ধ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সংস্কৃতিকর্মীরা।

জানা গেছে, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির একজন কর্মকর্তা হিসেবে সংগীতশিল্পী ও গবেষক এস এম শামীম আকতার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক উৎসব ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে যুক্ত রয়েছেন। বিশেষ করে নেত্রকোণায় গারো সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ওয়ানগালা উৎসব এবং পার্বত্য অঞ্চলে মারমা লোকনাট্য ‘মাচয়ইং’-এর মতো আদিবাসী উৎসব আয়োজনে তিনি সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন। একজন সংগীতশিল্পী এবং সিনিয়র সংগীত ইন্সট্রাক্টর হওয়ার কারণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর গান ও সুরের ধারাকে তিনি খুব সহজে ধারণ করতে পেরেছেন। আদিবাসীদের লোকসংগীতের সুর সংগ্রহ ও তা বিশ্বদরবারে তুলে ধরার পেছনে তাঁর শিল্পীসত্তা বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। প্রামাণ্যচিত্র ও নৃবিজ্ঞানভিত্তিক কাজতিনি শুধু কাগজ-কলমেই তার কাজ সীমাবদ্ধ রাখেননি। একজন প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা এবং নৃবিজ্ঞানী হিসেবে ভিজ্যুয়াল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি ক্যামেরাবন্দী করেছেন। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে ক্ষুদ্র জাতিসত্তাদের জীবনসংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক গৌরব স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সংগীতশিল্পী এস এম শামীম আকতারের এই বহুমুখী গল্প ও গবেষণা দেশের মূল সংস্কৃতির শেকড় লুকিয়ে থাকা প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যের মাঝে রয়েছে এক অন্যন্য দেশপ্রেম। 

আরও পড়ুন: ক্লিন সিটি, গ্রিন সিটি’ পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর

রাজশাহী বিভাগীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর  কালচারাল একাডেমীর উপপরিচালক চালকের দায়িত্বে থাকাকালীন আমি সেখানে  নিজ স্থানীয় লিগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষায় নিজস্ব বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে প্রথাগত সংগীতের ১১১ টি গান নিয়ে ১১টি ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের অডিও অ্যালবাম তৈরি করেছি। তাদের জীবন ও সংস্কৃতি নির্ভর দশটি অডিও ভিজুয়াল ডকুমেন্টারি তৈরি করেছি ।দুইটি গবেষণাধর্মী বই প্রকাশ করেছি । একটি লাইব্রেরী তৈরি ভবন লাইব্রেরী ও সুভ্যেনির সপ গড়ে তুলেছি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ঐতিহ্য সংগ্রহশালা নির্মাণ করেছি যেখানে স্থানীয় নিগোষ্ঠীর সম্প্রদায়ের ব্যবহার্য বাদ্যযন্ত্র অলংকার আসবাবপত্র এবং পোশাক সংরক্ষণ করা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় বহুমাত্রিক ও বহুবর্ণিল। রাজধানী কিংবা দৃশ্যমান শিল্প-সাহিত্যের গণ্ডির বাইরে দেশের প্রত্যন্ত জনপদে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, গান, মৌখিক সাহিত্য, লোকজ জ্ঞান, আচার-অনুষ্ঠান ও ঐতিহ্যবাহী জীবনাচরণ। কালের প্রবাহে এই ঐতিহ্যের অনেকটাই আজ হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে। ঠিক এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে গবেষণা, নথিবদ্ধকরণ ও প্রকাশনার মাধ্যমে সংরক্ষণের কাজে দীর্ঘদিন ধরে নিবেদিত রয়েছেন নৃবিজ্ঞানী, লেখক, সাংস্কৃতিক গবেষক ও সংগীতশিল্পী এস এম শামীম আকতার। বগুড়ায় জন্ম নেওয়া গুনী এই শিল্পী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি গড়ে ওঠা তাঁর আগ্রহ পরবর্তী সময়ে তাঁর পেশাগত জীবনের প্রধান ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের উপপরিচালক এবং একই সঙ্গে একাডেমির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। এর আগে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টর (সংগীত) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তারও আগে তিনি শিল্পকলা একাডেমির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সেলে সহকারী পরিচালক এবং রাজশাহী বিভাগীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক একাডেমিতে উপপরিচালক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আরও পড়ুন: এসএসসি পরীক্ষা কবে হবে জানালেন শিক্ষামন্ত্রী

একাডেমিক শিক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের পাশাপাশি তাঁর কর্মকাণ্ডের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও লোকঐতিহ্য। ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, লোকজ্ঞান, ঐতিহ্যবাহী জীবনচর্চা এবং অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিষয়ে গবেষণা, ইনভেন্টরিং, নথিবদ্ধকরণ ও প্রকাশনার সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। শুধু তাই নয়, গবেষণার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতাও তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী থাকাকালীন বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামীণ ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে যে মাঠগবেষণার অভিজ্ঞতা তাঁর তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তা আরও বিস্তৃত ও গভীর হয়েছে। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক সংরক্ষণ কাঠামোর আলোকে দেখার সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষত কোনো ঐতিহ্যকে নথিবদ্ধ করা, সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ—এসব ক্ষেত্রে তাঁর আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পেশাগত কাজের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য শামীম আকতারের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড দেশের সীমানায় আবদ্ধ থাকেনি। জাপান, চীন, ভুটান, জার্মানি ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক উৎসব, সম্মেলন, প্রশিক্ষণ ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দীর্ঘ কর্মজীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরিচয় শেষ পর্যন্ত মানুষের কাজের মধ্যেই। এস এম শামীম আকতারের ক্ষেত্রেও তাঁর প্রকাশিত গবেষণা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে দীর্ঘ সম্পৃক্ততা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, শিক্ষকতা, লেখালেখি ও সংগীতচর্চার ধারাবাহিকতাই তাঁর পেশাগত জীবনের সবচেয়ে দৃশ্যমান দলিল। আর সেই দীর্ঘ পথচলার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে জানা, নথিবদ্ধ করা এবং আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস।