পোশাক শ্রমিকদের নতুন মজুরি বাস্তবায়ন ডিসেম্বরে

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১১:৩২ অপরাহ্ন, ০৪ নভেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১২:২৪ পূর্বাহ্ন, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

আগামী ডিসেম্বরের প্রথম দিন থেকে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি কার্যকর করার বিষয়ে একমত হয়েছেন মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিগণ। সে অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ডিসেম্বর মাসের বেতনের সঙ্গে নতুন কাঠামোর বর্ধিত মজুরি পাবেন শ্রমিকেরা। 

গতকাল বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় নিম্নতম মজুরি বোর্ডের কার্যালয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য গঠিত  অষ্টম নিম্নতম মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা শেষে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিগণ সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। 

আরও পড়ুন: সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিক গ্রেপ্তারে আদালতের অনুমতি নিতে হবে

সভায় শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার বলেন, নতুন মজুরি পয়লা ডিসেম্বর থেকে কার্যকর এবং জানুয়ারিতে ডিসেম্বর মাসের বেতনের সঙ্গে শ্রমিকদের তা পরিশোধের বিষয়ে মালিকপক্ষের প্রতিনিধির সঙ্গে তাদের ঐকমত্য হয়েছে। এ বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য নেই। 

তিনি বলেন, শ্রমিকদের পক্ষ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি নির্ধারণের কার্যক্রম সম্পন্ন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সভায় শ্রমিকপক্ষের লিখিত প্রস্তাব জমা দেওয়া হবে। সব শ্রমিক সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি যৌক্তিক মজুরি প্রস্তাব তৈরি করে বোর্ডে উপস্থাপনের আহ্বান জানান তিনি। 

আরও পড়ুন: শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণে সরকার আন্তরিক: শ্রমমন্ত্রী

মালিকপক্ষের প্রতিনিধি ও বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক এ বি এম সামছুদ্দিনও ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি নির্ধারণের কার্যক্রম সম্পন্ন করার বিষয়ে ঐকমত্যের কথা জানান। তিনি বলেন, মালিক ও শ্রমিকপক্ষ অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা করেছে। উভয় পক্ষের সম্মতিতে ডিসেম্বরের মধ্যে এ কার্যক্রম শেষ করার বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, যেন শ্রমিকেরা জানুয়ারিতে ডিসেম্বর মাসের বেতনের সঙ্গে বর্ধিত মজুরি পান। সভায় সভাপতিত্ব করেন নিম্নতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ আজাদ সুবহানী।

সভা শেষে তিনি বলেন, গত পয়লা নভেম্বর সরকার তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ড গঠনের মাত্র তিন দিনের মধ্যে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ায় মজুরি নির্ধারণের কার্যক্রম দ্রুত শুরু করা সম্ভব হয়েছে। 

সৈয়দ আজাদ সুবহানী বলেন, সভায় বোর্ড সদস্যদের পরিচিতি পর্বের পাশাপাশি মজুরি নির্ধারণের আইনগত পদ্ধতি ও করণীয় বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিগণ তাদের অভিজ্ঞতা ও মতামত তুলে ধরেছেন। পরবর্তী সভায় উভয় পক্ষের কাছ থেকে লিখিত প্রস্তাব পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। 

আগামী সপ্তাহে বোর্ডের পরবর্তী সভা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সাধারণত শিল্প খাতের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য ৬ মাসের একটি সময়সীমা থাকে। তবে বর্তমান সরকার দ্রুততম সময়ে বোর্ড গঠন করেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকারের কাছে সুপারিশ প্রণয়ন ও তা জমা দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। 

শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে সৈয়দ আজাদ সুবহানী বলেন, বোর্ডের সদস্যরা শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়েই কাজ করছেন। আজকের সভায় মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের প্রতিনিধিগণ অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের মতামত দিয়েছেন। বোর্ডের সুপারিশ শ্রমিকদের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সভায় শ্রমিক প্রতিনিধিগণ মজুরি ছাড়াও শ্রমিকদের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। এর মধ্যে শ্রম আইন বাস্তবায়ন, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, ছুটি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয় রয়েছে। এসব সমস্যা পর্যায়ক্রমে সমাধানে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারা। 

শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতার বলেন, মজুরি নির্ধারণের পাশাপাশি শ্রমিকদের অন্যান্য অধিকার ও সুযোগসুবিধা নিশ্চিত করাও জরুরি। শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া, গ্রেপ্তার হওয়া শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের মুক্তি এবং তাদের প্রতি কোনো ধরনের নির্যাতন না করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। 

কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বাবুল আখতার বলেন, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দায়িত্ব সরকারের মজুরি বোর্ডের। শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করতে মালিক ও শ্রমিকপক্ষ একসঙ্গে কাজ করতে চান। এ জন্য কারখানার উৎপাদন বন্ধ রেখে আন্দোলন না করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। 

উল্লেখ্য, তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে গত ১ নভেম্বর ৬ সদস্যের বোর্ড গঠন করে সরকার। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। নতুন বোর্ডকে মালিক, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির সুপারিশ প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বন্ধ কারখানা খুলে দিন, নিরাপত্তাসহ সার্বিক সহযোগিতা করবে সরকার: মালিকদের শ্রমমন্ত্রী: শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে তৈরি হওয়া অস্থিরতা কাটিয়ে আজ বৃহস্পতিবার থেকে কারখানায় কাজে ফিরতে শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। একই সঙ্গে যেসব কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে, সেগুলো খুলে দিয়ে উৎপাদন স্বাভাবিক করতে মালিকদেরও অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া মজুরি বোর্ডে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দিয়ে মন্ত্রী বলেছেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি পূরণে সরকার আন্তরিক। বুধবার সচিবালয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। 

আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া আলোচনার জন্য এরই মধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বোর্ডের প্রথম সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। চার দিনের মাথায় আবারও বোর্ডের সভা বসবে। অতীতে কোনো দাবি নিষ্পত্তিতে তিন-চার বছর সময় লাগলেও বর্তমান সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে। 

তিনি বলেন, শনিবার রাতে শ্রমিক প্রতিনিধিরা মজুরি বোর্ড গঠনের বিষয়ে সরকারের কাছে দাবি জানান। এরপর রবিবার দুপুর ১২টার আগেই বোর্ড গঠন করা হয়েছে এবং একই দিন সন্ধ্যায় গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। এরপরও বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালানো হয়েছে। তবে সরকার থেমে থাকেনি। তিন দিনের মাথায় বোর্ডের প্রথম সভা হয়েছে। এখন চার দিনের মাথায় আবারও সভা হবে।

শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী বলেন, আমি আহ্বান করবো, আপনারা কলকারখানায় কালকে (বৃহস্পতিবার) ফিরে যান। আপনাদের সমস্ত দাবি সরকারের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয়েছে। এরই মধ্যে বোর্ড বসেছে, বোর্ডে আলোচনা হবে। আলোচনার ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান হবে, ইনশা আল্লাহ। 

তিনি বলেন, দাবি-দাওয়া জানানোর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। শ্রমিক নেতাদের মাধ্যমে অথবা মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে দাবি জানাতে হবে। মন্ত্রণালয় সেসব দাবির বিষয়ে সাড়া না দিলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কোনো ধরনের আবেদন বা আলোচনা ছাড়াই রাস্তাঘাট অবরোধ করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। 

মন্ত্রী বলেন, শিল্প বাঁচলে আয় বাড়বে, উৎপাদন বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তখন শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হবে। তাই শ্রমিক ও মালিক উভয় পক্ষকে শিল্পের স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। 

কারখানা খুলে দেওয়ার বিষয়ে মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যেসব মালিক কারখানা বন্ধ রেখেছেন, তারা যেন সেগুলো খুলে দিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন। শ্রমিক নেতাদেরও নিজ নিজ কারখানায় গিয়ে শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করার আহ্বান জানান তিনি। সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপত্তাসহ সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলেও আশ্বাস দেন। বৈঠকে সাম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলনে নিহত শ্রমিকের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর বিষয়েও কথা বলেন শ্রমমন্ত্রী। 

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে নিহত শ্রমিকের পরিবারের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে এক লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তার পরিবারের জন্য ভবিষ্যতে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া যায়, সে বিষয়েও সরকার কাজ করবে। 

মন্ত্রী বলেন, নিহত শ্রমিকের ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে, এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের ভিডিও ফুটেজসহ অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে আইনের আওতায় আনা হবে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

শ্রমিকদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, গাজীপুরের টঙ্গীতে শ্রমিকদের জন্য ১০০ শয্যার একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বুধবারই এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদিত সারসংক্ষেপ শ্রম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে হাসপাতাল নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।

তিনি বলেন, আমরা কাজ শুরু করেছি। এর আগে কোনো সরকার শ্রমিকদের জন্য এ ধরনের হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়নি। শুধু মুখে বললে হবে না, বাস্তবে কাজ করতে হবে। 

শ্রমিক অসন্তোষ কেন্দ্র করে শিল্প খাতে অস্থিতিশীলতা তৈরির অপচেষ্টা সম্পর্কে সতর্ক করে মন্ত্রী বলেন, একটি পক্ষ দেশের শিল্পকারখানা ধ্বংস করতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে চায়। এ ধরনের ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করতে হবে। যারা সহিংসতা ও নাশকতার সঙ্গে জড়িত, ভিডিও ফুটেজে যাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

তিনি আরও বলেন, কারও বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। তবে অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। বৈঠকে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের আন্তরিকতার প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, অল্প সময়ের নোটিশে শ্রমিক নেতারা এবং বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। এতে প্রমাণ হয়েছে, উভয় পক্ষই সংকট সমাধানে আন্তরিক। এই আন্তরিকতাকে কাজে লাগিয়ে শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং শিল্পকারখানায় দ্রুত স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। 

মন্ত্রী বলেন, আসুন সব ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে আমরা এগিয়ে যাই। দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাক, শিল্পকারখানা আরও উন্নত হোক। সবাই মিলে আগামীকাল থেকে কারখানাগুলোতে নতুন উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ফিরিয়ে আনি।