পোশাক শিল্পে স্বস্তি:কাজে ফিরেছেন শ্রমিকরা
টানা কয়েক দিনের শ্রমিক অসন্তোষ, সড়ক অবরোধ ও অনাকাক্সিক্ষত সংঘর্ষের অবসান ঘটিয়ে স্বস্তি ফিরেছে দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চল গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জে। সরকার গঠিত নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের বেতন বৃদ্ধির সুপারিশে মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষ সম্মতি দেওয়ার পর কর্মস্থলে ফিরছেন শ্রমিকরা। ফলে গাজীপুরসহ শিল্পাঞ্চলের কলকারখানা আবার চালু হতে শুরু করেছে। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠে দায়িত পালন করছে ৩৩ প্লাটুন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে কাজে ফিরেছেন পোশাক শ্রমিকরা।
গতকাল রবিবার এসব শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকদের উপস্থিতিতে উৎপাদন কার্যক্রমে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। এর মধ্য দিয়ে তৈরি পোশাকশিল্পে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরতে শুরু করেছে। এদিকে, গত ৫ নভেম্বর থেকে পোশাক শ্রমিকদের অক্টোবর মাসের বেতন পরিশোধ শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুন: মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ: লটারিতে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত ৩০০ জন
রবিবার অধিকাংশ কারখানায় বেতন পরিশোধ করা হবে বলে আশা করছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু।
শিল্প পুলিশের মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) মো. ইসরাইল হাওলাদার বলেন, শিল্পাঞ্চলগুলোর পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে। অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকরা কাজে যোগ দিয়েছেন। আশুলিয়ায় দু’একটি কারখানায় সমস্যা দেখা গেলে সেখানে ছুটি ঘোষণা করা হয়। এরপর শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে কারখানা ত্যাগ করে। মো. ইসরাইল হাওলাদার বলেন, শিল্পাঞ্চলগুলোতে কোনো বিক্ষোভ, সংঘর্ষ বা সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেনি। সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
আরও পড়ুন: প্রশিক্ষণ নিতে পাকিস্তান যাচ্ছেন সরকারের উচ্চপদস্থ ৩৪ কর্মকর্তা
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই কোনাবাড়ী, শফিপুর, পল্লী বিদ্যুৎ, চন্দ্রা, বাসন সড়ক, টঙ্গী, সালনা, ভবানীপুর ও বাংলাবাজারসহ সব এলাকায় সুশৃঙ্খলভাবে শ্রমিকরা কারখানায় প্রবেশ করেছেন।
এদিকে শিল্পাঞ্চলে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে এবং শ্রমিকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে টানা নবম দিনের মতো অভূতপূর্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
গতকাল রবিবার জেলার শিল্পাঞ্চলের দায়িত্বপালনকারী বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ের দায়িত্বে আছেন গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. শাহরিয়ার নাজির।
তিনি জানান, গত কয়েকদিনের মতোই সর্বমোট ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে মাঠে দায়িত্ব পালন করছে ২৫ প্লাটুন বিশেষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য। এর মধ্যে মোতায়েন রয়েছে ১২ প্লাটুন বিজিবি, ৫ প্লাটুন আনসার ও ৮ প্লাটুন এসআরবি। পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করেছে, গাজীপুর মহানগর পুলিশ, জেলা পুলিশ, শিল্প পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। শাহরিয়ার নাজির আরও বলেন, র্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কিংবা জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে না দেওয়ার ব্যাপারে প্রশাসন বদ্ধপরিকর।
গাজীপুর, সাভার, ঢাকার মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে গত কয়েক দিন ধরে পোশাক শ্রমিকদের মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ, বিভিন্ন কারখানায় ভাঙচুর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। অসন্তোষ চলাকালে পুলিশ বক্স, পুলিশের গাড়ি ও একটি কারখানার গুদামে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে শ্রমিক ও পুলিশ সদস্যসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। এর জেরে বিভিন্ন কারখানা কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ ও ছুটি ঘোষণা করে। এছাড়া বাংলাবাজার এলাকায় মুঠোফোনে বিক্ষোভ ও ভাংচুরের ভিডিও ধারণকে কেন্দ্র করে মারধরের শিকার হন পোশাক শ্রমিক তৌফিক হোসেন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। শিল্পাঞ্চলের সংকট নিরসনে ও শ্রমিকদের দাবি বিবেচনায় নিয়ে সরকার ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করে। মজুরি বোর্ড শিল্প খাতের বিদ্যমান বাস্তবতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা করে বেতন বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পেশ করে।
মালিক ও শ্রমিক—উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা ঘোষিত সুপারিশে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মতি প্রকাশ করে। সমঝোতার রূপরেখা অনুযায়ী, সরকার ও মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নতুন মজুরি কাঠামো আগামী ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করা হবে। শ্রমিককে আগামী জানুয়ারি থেকে সমন্বিত ও বর্ধিত বেতন হাতে পাবেন। এছাড়া পোশাকশ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে ঢাকার সাভারে কয়েক দিন ধরে চলা শ্রমিক অসন্তোষের পর সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে কারখানায় ফিরেছেন শ্রমিকরা।
শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। পরিস্থিতির উন্নতিতে আশাবাদী শিল্পাঞ্চল পুলিশও। তাদের ভাষ্য, শিল্পাঞ্চলে স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ অনেকটাই ফিরে এসেছে। আজ-কালের মধ্যে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করছে তারা।
শিল্প পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ছুটির পর আজই শিল্পাঞ্চলে প্রথম কর্মদিবস। সকালে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ছাড়াই শ্রমিকরা নিজ নিজ কারখানায় কাজে যোগ দিয়েছেন। সকাল ১১টা পর্যন্ত কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, বেলা ১১টার পর জামগড়া ও আশপাশের কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা কাজ ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে সড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। এছাড়া সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। অধিকাংশ পোশাক কারখানায় পুরোদমে উৎপাদন চলছে।
এদিকে, চলমান শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ৩৩ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করেছে সরকার। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রবিবার সকালে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিজিবি এ তথ্য জানিয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকার সাভার, আশুলিয়া ও মিরপুর এলাকায় বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের শিবু মার্কেট, জালকুড়ি, বিসিক শিল্পনগরী, চাষাঢ়া, কাঁচপুর ও শিমরাইল এবং গাজীপুরের চন্দ্রা, পল্লীবিদ্যুৎ, মৌচাক, আমবাগ, কাশিমপুর, নাওজোর, ভোগড়া বাইপাস, গাছা ও সালনা এলাকায় নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তারা। শিল্পাঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে বিজিবি সদর দপ্তর। এ জন্য সদর দপ্তরের মনিটরিং সেল থেকে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ও সরাসরি ভিডিও ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করছেন মোতায়েন করা বিজিবি সদস্যরা। যেকোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। বিজিবি জানিয়েছে, শিল্পাঞ্চলে নিরাপদ ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ বজায় রাখা, জনসাধারণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মোতায়েন ও নজরদারি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
প্রসঙ্গত, ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে গত কয়েক দিন ধরে রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ চলছিল। এরই মধ্যে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণে ৬ সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার।
গত রবিবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। মজুরি বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকদের সড়ক ছেড়ে কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এর আগে শুক্রবার শ্রমিক নেতা এবং শনিবার তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন মন্ত্রী। দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। নতুন বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানকে। বোর্ডের অন্য সদস্যরা হলেন মালিকপক্ষের প্রতিনিধি বিজিএমইএর পরিচালক এবিএম শামছুদ্দিন, শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব আসিফ আইয়ুব এবং নিরপেক্ষ সদস্য মোসলেহ উদ্দিন আহমদ ও আনোয়ার হোসাইন। এই বোর্ড পোশাকশিল্পের সব পদে শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি নির্ধারণের সুপারিশ করবে। বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা ও গেজেট প্রকাশ করবে সরকার।
সর্বশেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। পরের মাস থেকে বর্ধিত মজুরি কার্যকর হয়। সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর পরপর পোশাকশিল্পে নিম্নতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে বোর্ড গঠন করা হতো। তবে গত ১০ এপ্রিল সংসদে পাস হওয়া শ্রম আইন সংশোধন বিলে মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমা ৫ বছর থেকে কমিয়ে ৩ বছর করা হয়েছে। সেই হিসাবে চলতি নভেম্বরে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের কথা ছিল।





