রাজনৈতিক সমর্থন ব্যালটে দেখাবেন, অফিসে নয়: কর্মকর্তাদের প্রধানমন্ত্রী

Sanchoy Biswas
বাংলাবাজার রিপোর্ট
প্রকাশিত: ৯:৪১ অপরাহ্ন, ০৮ নভেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৯:৫৫ অপরাহ্ন, ০৮ নভেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সরকারি কর্মকর্তাদের কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন থাকলে তা ব্যালট বাক্সে প্রকাশ করতে হবে, সরকারি অফিসে নয়—এমন মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিনি বলেছেন, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি ব্যক্তিগত সমর্থন থাকাকে তিনি দোষের মনে করেন না। তবে সেই সমর্থনের প্রতিফলন সরকারি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে থাকা উচিত নয়।

আরও পড়ুন: মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ: লটারিতে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত ৩০০ জন

রোববার (৮ নভেম্বর) সন্ধ্যায় সাভারের বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) মিলনায়তনে ৮১তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানে নবীন বিসিএস কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তারেক রহমান বলেন, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবনে কী করা উচিত বা উচিত নয়, তা নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে তিনি মনে করেন না। কারণ, কর্মকর্তারা নিজেরাই এসব বিষয় ভালো জানেন। তবে জানা বিষয়গুলো কর্মক্ষেত্রে বাস্তবায়নের সদিচ্ছা থাকাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন: প্রশিক্ষণ নিতে পাকিস্তান যাচ্ছেন সরকারের উচ্চপদস্থ ৩৪ কর্মকর্তা

নবীন কর্মকর্তাদের কাছে নিজের প্রত্যাশা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেকোনো বয়সের নাগরিক সরকারি অফিস-আদালতে সহযোগিতার জন্য এসে যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে তিনি একটি ‘গোল্ডেন রুল’ স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘ট্রিট আদার্স হাউ ইউ ওয়ান্ট টু বি ট্রিটেড।’ অর্থাৎ, অন্যের সঙ্গে তেমন আচরণ করুন, যেমন আচরণ আপনি নিজের জন্য প্রত্যাশা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জীবনের বিভিন্ন সময়ে মানুষের অন্যের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। সহযোগিতা পাওয়ার সময় নিজের জন্য যে ধরনের আচরণ প্রত্যাশা করেন, কেউ সহযোগিতা চাইতে এলে তার সঙ্গেও তেমন আচরণ করতে হবে।

প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আইন ও বিধিবিধান মেনে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানবিক আচরণের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, একজন কর্মকর্তাকে অবশ্যই বিধিবদ্ধ নিয়মের মধ্যে থেকে কাজ করতে হবে। আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে দায়িত্ব পালনের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে মানবিক আচরণ করা হচ্ছে কি না, আধুনিক রাষ্ট্র ও প্রশাসনে সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কোনো নাগরিক আবেদনপত্র নিয়ে এলে তাতে ভুল থাকলে সংশোধন করে আনতে বলা অন্যায় নয়। তবে ভুলটি নির্দিষ্ট করে দেখিয়ে দিয়ে কোথায় এবং কার কাছে গিয়ে তা সংশোধন করতে হবে, সে বিষয়ে পরামর্শ দিলে সেটি মানবিকতা ও আন্তরিকতার পরিচয় বহন করে। জনগণ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে শুধু আদেশ-নির্দেশ নয়, মানবিক আচরণও প্রত্যাশা করে।

কর্মকর্তাদের পদায়ন ও পদোন্নতির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনপ্রশাসনে হাজার হাজার পদ-পদবি রয়েছে। প্রতিটি পদই রাষ্ট্র ও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে অনেক সময় পছন্দের পদে পদায়ন বা পদোন্নতির জন্য কেউ কেউ পেশাগত দক্ষতা ও সততার সঙ্গে আপস করেন।

তিনি বলেন, দেশের যেকোনো স্থানে জনপ্রশাসনের যেকোনো পদে দায়িত্ব পালনের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকাই পেশাদারত্বের পরিচয়। মনে রাখতে হবে, কোনো সরকার যেমন চিরস্থায়ী নয়, তেমনি জনপ্রশাসনের কোনো পদও কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়।

নবীন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে বর্তমানে ২৬টি ক্যাডার রয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে কেউ প্রশাসন, কেউ পররাষ্ট্র, কৃষি, ট্যাক্সেশন, শিক্ষা কিংবা তথ্য ক্যাডারে যোগ দেবেন। কাজের ধরন ও কর্মস্থল ভিন্ন হলেও সবার প্রথম ও প্রধান পরিচয় হলো, তাঁরা জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ইউ আর দেয়ার টু সার্ভ দ্য পিপল।’ অর্থাৎ, জনগণের সেবা করার জন্যই তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

সরকারের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে জনপ্রশাসনের ভূমিকা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার তার রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে এবং তা সরকারি প্রশাসনের মাধ্যমেই করছে। তবে জনগণ নির্বাচনে ভোট দিয়ে এই সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।

তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে তাঁরা জনগণের সামনে নির্বাচনী ইশতেহার তুলে ধরেছিলেন। জনগণ সেই ইশতেহারের পক্ষে রায় দিয়েছে। ফলে নির্বাচনী ইশতেহার এখন দেশের জনগণের ইশতেহার ও জনগণের দলিল। এটি বাস্তবায়ন করা বর্তমান সরকারের দায়িত্ব। প্রশাসনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে সেই দায়িত্ব পালনে কর্মকর্তাদের আন্তরিকভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

সরকারি সেবা সহজ ও নাগরিকবান্ধব করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রশাসনে দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে সরকারি সেবা সহজ করার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক উদ্যোগের চেয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ইতিবাচক মানসিকতা বেশি কার্যকর। এ ক্ষেত্রে নবীন কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষার বিষয়েও নবীন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, পরিবেশ-প্রতিবেশের সুরক্ষা ও পরিচ্ছন্নতার দিকে আরও বেশি নজর দিতে হবে। ঘরবাড়ি, অফিস-আদালতসহ চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও দেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

বক্তব্যের শুরুতে নবীন কর্মকর্তাদের অভিনন্দন জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, তাঁরা জীবনের নতুন একটি অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন। একাডেমিক জ্ঞান অর্জনের পর ব্যবহারিক জীবনে সেই জ্ঞান প্রয়োগের কলাকৌশল শিখেছেন। এখন সরকারি প্রশাসনে যার ওপর যে দায়িত্ব অর্পিত হবে, অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে যথাযথভাবে তা পালন করতে হবে।

তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মজীবন শুরু করতে যাওয়া কর্মকর্তাদের অধিকাংশই সম্ভবত প্রথমবারের মতো পদায়ন পাচ্ছেন। তাঁরা এখন রাষ্ট্রের জনপ্রশাসনের অংশ। সরকারি প্রশাসন যত বেশি দক্ষ হবে, সরকারের কার্যক্রমও তত বেশি সফল হবে। তাই সরকারের সার্বিক সফলতার জন্য দক্ষতা, সততা ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন প্রশাসন গড়ে তোলা জরুরি।

প্রধানমন্ত্রী নবীন কর্মকর্তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সুখ, শান্তি, স্বাচ্ছন্দ্য ও সাফল্য কামনা করেন।

রোববার সন্ধ্যা ৬টায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চার মাসব্যাপী ৮১তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে শীর্ষ ১০ জনের হাতে সনদ তুলে দেন তিনি। পরে নবীন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী।