শরিয়া আইন নিয়ে কৌশল না অবস্থান বদল

জামায়াতের সাথে ইসলামী দলগুলোর নতুন করে মৌলিক বিরোধ

Sanchoy Biswas
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৯:৩৩ অপরাহ্ন, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬ | আপডেট: ৯:৩৩ অপরাহ্ন, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জামায়াতে ইসলামীর নীতি, কর্মকাণ্ড নিয়ে বামপন্থী ও হাক্কানী আলেম-ওলামাদের মৌলিক বিরোধ ছিল। উপমহাদেশের হাক্কানী আলেম-ওলামা, পীর আউলিয়ারা জামায়াত ইসলামিকে মওদুদী বাদের ভ্রান্ত ধারণার দল হিসাবে চিহ্নিত করে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ চালছিল।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বাংলাদেশের শরিয়া আইন কার্যকর নিয়ে জামায়াত ইসলামের আমিরের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ইসলামী দলগুলির সাথে নতুন বিরোধ তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন: দৃঢ়চেতা খালেদার স্মরণ করে সংকটময় সময়ে ঐক্যের আহ্বান

তাদের ৫ আগস্ট পরবর্তী আন্দোলন ও নির্বাচনের জোটসঙ্গী চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন অভিযোগ করেছে—জামায়াত ইসলাম এখন আর ইসলামী দল নয়। ইসলামের রাজনীতির মৌলিক পথ থেকে সরে গেছে। ইসলামী দলগুলোর এই জোটের এক বক্স নীতিতে মুসলিম ভোট পাওয়া এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলোর ঐক্যের অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের আমির মাওলানা মহিবুল্লাহ বাবুনগরী নির্বাচনের শুরু থেকেই জামায়াত ইসলামিকে ভ্রান্ত ধারণার দল হিসাবে আখ্যায়িত করে একাধিক বিবৃতি দিয়েছেন।

আরও পড়ুন: ইসলামী আন্দোলনের সব অভিযোগের জবাব দিলো জামায়াত

এদিকে, জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করবে না – বুধবার দলটির আমিরের সাথে দেখা করার পর গণমাধ্যমকে এমনটাই জানিয়েছিলেন খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি দলের মার্থা দাস।

তারপর থেকেই আলোচনায় বিষয়টি। এর আগে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুইজন প্রার্থীকে জাতীয় নির্বাচনের মনোনয়ন দেয় জামায়াতে ইসলামী।

ফলে ধর্মভিত্তিক দল হওয়া সত্ত্বেও সাম্প্রতিক এমন বেশ কিছু পদক্ষেপে তাদের পক্ষ থেকে তুলনামূলক উদার মনোভাব দেখানো হয়েছে।

তবে দলটির নেতাদের এসব বক্তব্যের সাথে জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্র কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ সে প্রশ্ন যেমন উঠছে, তেমনি ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে তা কৌশলগত অবস্থান কি না, আছে সে আলোচনাও।

বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কৌশলগত অবস্থান নেওয়ার এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। আবার কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর অনেক আগে থেকেই দলটির দর্শন ও মতাদর্শে কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে।

তবে জামায়াতের নেতাদের বক্তব্য হচ্ছে, দলীয় গঠনতন্ত্র মেনে দল পরিচালনা করা হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সংবিধান ও বিদ্যমান আইনি কাঠামোকেই গুরুত্ব দেবেন তারা।

বুধবার ঢাকার মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা।

বৈঠক শেষে ন্যাশনাল খ্রিষ্টান ফেলোশিপ অব বাংলাদেশের জেনারেল সেক্রেটারি মার্থা দাস সাংবাদিকদের বলেন, "জামায়াতের ইসলামীর আমির মহোদয়ের সাথে আমরা কথা বলেছি। উনি যে আশ্বাসগুলো দিয়েছেন সেটাই আবার আমি একটু রিপিট করতে চাই। যেটা তিনি জাতির উদ্দেশ্যে বলেছেন সেটা হলো, যদি মহান সৃষ্টিকর্তা ওনাদের এই দেশ পরিচালনার সুযোগ দেন তাহলে এই বাংলাদেশে শরিয়াহ ল অর্থাৎ শরিয়াহ আইন তিনি বাস্তবায়ন করবেন না"।

এসময় জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, প্রতিনিধি দলের মূল প্রশ্ন ছিল রাষ্ট্র পরিচালনা বা সরকার পরিচালনার সুযোগ পেলে জামায়াত কোন আইনে দেশ চালাবে?

"অনেকে জিজ্ঞেস করেন যে, শরিয়াহ আইনে না অমুক মডেলে তমুক মডেলে? ফলে আমিরে জামায়াত বলেছেন, বাংলাদেশে যে বিদ্যমান আইন সে আইনেই বাংলাদেশ চলবে, যেখানে সব ধর্মের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা হবে। এবং এই আইনটাই যথেষ্ট এখন", বলেন তিনি।

'জামায়াতের রাজনীতিতে এসেছে গুনগত পরিবর্তন'

এই ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে নেতারা দলটির নীতিগত অবস্থানের পরিবর্তন করছে না কি তা কেবলই নির্বাচনকে সামনে রেখে বলা হচ্ছে, এনিয়ে চলছে নানা আলোচনা।

যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দৈনিক নয়াদিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের মতে, জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে আগের তুলনায় অনেক গুণগত পরিবর্তন এসেছে।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে তিনি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দলটির সমাবেশের কথা টেনে আনেন। বলেন, জামায়াতের আমির মাটিতে পরে যাওয়ার পর সমাজের খেটে খাওয়া মানুষের কথা বলছিলেন।

আর এই বিষয়টি আগের কোনো নেতার মুখে শোনা যায়নি। একইসাথে প্রথম বারের মতো এবারের নির্বাচনে দুইজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে জামায়াত। ফলে এই বিষয়গুলোকে 'নতুন বন্দোবস্ত' হিসেবেই দেখছেন মি. বাবর।

শরিয়াহ আইন করার বিষয়ে দলীয় প্রধানের বক্তব্যকেও একই দৃষ্টিতে দেখছেন তিনি। তার মতে, বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ হলেও তারা 'ফ্যানাটিক মুসলমান না'।

ফলে শরিয়াহ আইনের বিষয়ে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীতো বটেই, মুসলিমদের দিক থেকেও তীব্র প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। "এটা হয়তো জামায়াত বুঝতে পেরেছে আর তাই মানুষের ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে চাচ্ছে" বলে মনে করেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

তবে জামায়াতের আরেকজন কেন্দ্রীয় নেতা মতিউর রহমান আকন্দ অবশ্য দাবি করছেন শরিয়াহ আইন বিষয়ক মন্তব্যটি শফিকুর রহমান "এই ভাষায় বলেননি"।

"তিনি বলেছেন জামায়াতে ইসলাম যদি ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে জনগণের মতামত, ইচ্ছা এবং অপিনিয়নের ভিত্তিতেই আইন প্রণয়ন এবং কোনো পরিবর্তন করতে হলে জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই পরিবর্তন করা হবে। এখানে আমরা শরিয়াহ আইন প্রণয়ন করবো না এই ধরনের কোনো বক্তব্য আমাদের পক্ষ থেকে দেয়া হয়নি", বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

যদিও মি. জুবায়ের বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন জামায়াতের আমির সেদিন বলেছিলেন "আমাদের সংবিধান এবং বিদ্যামান যে আইনি কাঠামো আছে, সেখানে সব নির্দেশনা আছে। বাংলাদেশ এই বিদ্যমান আইন সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই পরিচালিত হবে"।

দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর যাত্রা শুরু হয়েছিলো ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদীর হাত ধরে।

১৯৪৮ সালে ইসলামি সংবিধানের দাবিতে প্রচারণা শুরু করলে পাকিস্তান সরকার জননিরাপত্তা আইনে মি. মওদুদীকে গ্রেফতার করে। দু'বছর পর তিনি জেল থেকে ছাড়া পান।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিল দলটি। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ১৯৭৯ সালে রাজনীতিতে ফিরে আসে জামায়াত।

তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে যুক্তদের বিচার শুরু করলে বেশ চাপের মুখে পড়ে জামায়াতে ইসলামী।

নির্বাচন কমিশনে রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের শর্ত পূরণের জন্য ২০১২ সালে দলটির গঠনতন্ত্রে মৌলিক কিছু বিষয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন বা সংশোধনী আনা হয়।

কারণ বাংলাদেশের সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রকাঠামো সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তার সাথে জামায়াতের আগের গঠনতন্ত্র ছিল সাংঘর্ষিক।

গঠনতন্ত্রে 'ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা'-র পরিবর্তে 'গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা' সম্বলিত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে তাদের লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করে জামায়াতে ইসলামী।

এর আগে তাদের গঠনতন্ত্রে 'আল্লাহ-প্রদত্ত ও রসুল-প্রদর্শিত ইসলাম কয়েমের প্রচেষ্টা'-কে তাদের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে উল্লেখ করা হলেও তা বাদ দিয়ে 'গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা'-র কথা বলা হয়।

যদিও ২০১৩ সালে সংবিধানের সঙ্গে গঠনতন্ত্র সাংঘর্ষিক হওয়ায় জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে হাইকোর্ট। পরে এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে দলটি।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে আবারও শক্তিশালীভাবে দৃশ্যমান হয় জামায়াত। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেও গুরুত্বপূর্ণ দলগুলোর তালিকায় এগিয়ে আছে তারা। আর জয়ের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপও নিয়েছে দলটি। যার একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দুইজনকে মনোনয়ন দেয়া।

তবে এই সিদ্ধান্ত জামায়াতের গঠনতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক নয় বলেই জানিয়েছেন মি. আকন্দ।

"গঠনতন্ত্রে বলা আছে, যেকোনো ধর্মের লোক জামায়াতে ইসলামীর লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং রাজনৈতিক দর্শনের সাথে একমত হয়ে জামায়াতে সম্পৃক্ত হতে পারে। যেহেতু এটা একটা রাজনৈতিক বিষয়, রাজনীতিতে সকল ধর্ম, বর্ণ, মতের লোক থাকবে"।

"অতএব পার্লামেন্টের ভেতরে যেন যারা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী আছেন তাদেরও প্রতিনিধিত্ব থাকে এই লক্ষ্যেই জামায়াত দুই জনকে প্রার্থী করেছে। এটা আমাদের সংগঠনের সাথে, সংবিধানের সাথে বা আমাদের ধর্মীয় চিন্তা-চেতনার সাথে কোনো অবস্থাতেই সাংঘর্ষিক হবে না," বলেন তিনি।

অন্যদিকে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বিবিসি বাংলাকে বলেন, "বাংলাদেশ বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনেই পরিচালিত হবে। দল তার নিজের রীতি ও আদর্শ অনুযায়ী চলবে"।

তবে দলটির নেতারা সব ধর্ম, বর্ণ বা মতের কথা বললেও এখন পর্যন্ত কোনো নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে দেখা যায়নি জামায়াতকে। এর আগে সরকার গঠন করলে নারীদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার বিষয়ে জামায়াতের আমিরের দেয়া মন্তব্যও বেশ সমালোচনার মুখে পড়েছিল।

জামায়াতের নেতাদের এমন বক্তব্য ও অবস্থান নির্বাচনী কৌশল হবার বিষয়টিও উড়িয়ে দিচ্ছেন না পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরা।

"নির্বাচনের আগে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী, ভিন্ন কমিউনিটির সাথে বসা অবশ্যই নির্বাচনী মুভই। এবং এই নির্বাচনী মুভে বসে যখন বলছে আমরা এটা করবো, এটা করবো না- ধরেন, সেটা শরিয়াহ আইন করাই হোক, আর আমরা আপনাদের সংখ্যালঘুদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবো, মেয়েদের পোশাক নিয়ে কিছু করবো না – যাই বলা হোক না কেন এটাকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ধরে নিতে হবে", বলছিলেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস।

বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অতীতে যেকোনো দলই ভোট টানার জন্য নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা পালন করেননি। ফলে জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রেও তেমনটা হবার সুযোগ আছে বলেই মনে করছেন তারা।

"নির্বাচনকে সামনে রেখে তারা অনেক সফট কথাবার্তা বলছে এবং তারা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবার জন্য অনেক কিছু বলছে যাতে মনে হচ্ছে তারা অনেকটা উদার হয়ে গেছে। তো নির্বাচনকে সামনে রেখে এধরনের কৌশল নেয়াতো অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার না। কারণ দলটি নিয়ে মানুষের যে পারসেপশন আছে, তা কাটাতেই হয়তো তারা এসব কথাবার্তা বলছে", বলছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহবুব উল্লাহ।

আবার কেউ কেউ বলছেন, ধর্মভিত্তিক দল হলেও ট্র্যাডিশনাল বা প্রথাগত এবং মডার্ন বা আধুনিক ইসলামের মধ্যে যে পার্থক্য আছে জামায়াত ইসলামকে সেদিক থেকেও ব্যাখ্যা করার সুযোগ আছে।

ফলে প্রথাগত ইসলামপন্থিরা শরিয়াহর দিকটিকে বেশি গুরুত্ব দিবে। আর কিছুটা উদার হওয়ার কৌশল নেওয়া জামায়াত শরিয়াহকে গুরুত্ব দিলেও তারা সংস্কারের কথাও বলবে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ।

তবে শরিয়াহ আইন বা এই ধরনের বিষয়ে জামায়াতের নেতাদের বক্তব্যকে নীতিগত পরিবর্তন হিসেবেই দেখছেন সালাহউদ্দিন বাবর।

তার মতে, জামায়াতে ইসলামীর গত ৫০ বছরের যে ইতিহাস বর্তমানে তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনীতি তুলে ধরছে দলটি।

আর দলটি "যা বলে অন্ততপক্ষে তারা প্র্যাকটিস করার চেষ্টা করে। তো যেটা বলেছে সেটা নিছক ইলেকশন নয়। জামায়াতের গোটা পলিটিক্সের নতুন একটা অধ্যায় শুরু হয়েছে, সেই অধ্যায়টাই তারা চর্চা করবে", বলেন তিনি।

যদিও তার এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন অধ্যাপক ফেরদৌস। তিনি বলেন, "মাঠের রাজনীতিতে কেউই যুধিষ্ঠির নয়। তারা যা বলে তা করে না। জামায়াতও তার থেকে কোনো ব্যতিক্রম নয়"।

বরং জামায়াত নিয়ে মানুষের এমন মনোভাবও আছে যে তারা যেসব কথা বলে, কার্যত তার একেবারে ভিন্ন ধরনের রাজনীতি করে। "এটা দলটির বাইরে, জামায়াতপন্থি নন, এমন নানা মত-পথের মানুষরাই নানা সময় বলে থাকেন"।

জামায়াতে ইসলামী ইসলামের আদর্শ থেকে সরে যাওয়ায় তাদের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক ঐক্য থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ—এমন মন্তব্য করেছেন দলটির যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান। শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

গাজী আতাউর রহমান বলেন, “খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সঙ্গে বৈঠকে জামায়াতে ইসলামী প্রচলিত আইনে দেশ পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অথচ ইসলামী আন্দোলন শরিয়াহ অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতি করে। এই অবস্থান আমাদের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।”

তিনি আরও বলেন, “জামায়াতের আমির বিএনপির নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলছেন। এর অর্থ হলো—তারা সমঝোতার নির্বাচনের পথে হাঁটছে। দীর্ঘদিন পর মানুষ একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আশায় ছিল, কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হবে বলে মনে হচ্ছে না।”

জোট ভাঙার পেছনে ভোটব্যাংক নিয়ে জামায়াতের কটাক্ষও গুরুত্বপূর্ণ কারণ বলে উল্লেখ করেন গাজী আতাউর রহমান। তিনি বলেন, “গত ৯ ডিসেম্বর জামায়াত আমির ও পীর সাহেবের একান্ত বৈঠকে প্রথম আলোর একটি জরিপের কথা টেনে বলা হয়—ইসলামী আন্দোলনের ভোট ‘জিরো দশমিক সামথিং’। এটি পীর সাহেবের প্রতি এক ধরনের সরাসরি অপমান। এই ঘটনার পর থেকেই ইসলামী আন্দোলন বিকল্প সিদ্ধান্তের কথা ভাবতে শুরু করে।”

তিনি জানান, ভবিষ্যতে ইসলামপন্থি কোনো দল বা শক্তি ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে ঐক্য করতে চাইলে আলোচনার দরজা খোলা রয়েছে।

উল্লেখ্য, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে না থাকার ঘোষণা দিয়েছে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটির ‘এক হাতে হাতপাখা’ নীতির আলোকে আগামী নির্বাচনে ২৬৮টি সংসদীয় আসনে হাতপাখা প্রতীকে এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।