রোগের চেয়ে সড়কে বেশি ঝরছে সুস্থ প্রাণ
# দেশে প্রতিদিন গড়ে ১০৪ জন সড়ক দুর্ঘটনার কারণে পঙ্গু হয়ে পড়ছেন
# গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৬৬ জন মানুষ রাস্তায় প্রাণ হারাচ্ছেন
আরও পড়ুন: থাপ্পড় নিয়ে দেশ-বিদেশে যতো কাণ্ড
# সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের ৮৪ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ
# ২৪ ঘণ্টায় সড়কে ঝরল ১০ প্রাণ
আরও পড়ুন: ইশরাকের যত বিতর্কিত কর্মকাণ্ড
# বছরে সড়কে প্রাণ গেছে ৮ হাজার শিশুর
দেশে সড়ক দুর্ঘটনা যেন এক অঘোষিত মহামারি। রোগ মানুষকে প্রস্তুতি নেওয়ার বা চিকিৎসা করার সুযোগ দেয়। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা সম্পূর্ণ আকস্মিক। সকালে সুস্থ শরীরে ঘর থেকে বের হওয়া মানুষটি বিকেলে লাশ হয়ে ফিরলে সেই আঘাত পুরো সমাজকে নাড়া দেয়। স্ট্যাটাস সার্ভে’ অনুযায়ী, বাংলাদেশে মানুষের মৃত্যুর প্রধান কারণ হচ্ছে অসংক্রামক রোগ (যেমন: হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, ক্যানসার ও ডায়াবেটিস)। এসব অসংক্রামক ও সংক্রামক রোগে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ মারা যান। বিপরীতে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে আনুমানিক ৩১,৫৭৮ জন প্রাণ হারান। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক যুগে (২০১৪-২০২৫) সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৯৫ হাজার ৭৬১ জন। সাধারণ রোগব্যাধিতে সাধারণত বয়স্ক বা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ মানুষ বেশি মারা যান। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় যারা মারা যান, তাদের একটি বড় অংশই তরুণ, শিক্ষার্থী এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ফলে একটি পরিবার এক নিমেষে ধ্বংস হয়ে যায়। সড়ক দুর্ঘটনা কেবল প্রাণই কাড়ে না, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জরিপ অনুযায়ী দেশে প্রতিদিন গড়ে ১০৪ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনার কারণে স্থায়ীভাবে পঙ্গু বা প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ছেন। এই দীর্ঘমেয়াদী পারিবারিক ও অর্থনৈতিক বোঝা রোগের চেয়েও অনেক সময় বেশি কষ্টদায়ক হয়।
সড়কে প্রাণহানির পেছনে বারবার একই কারণ উঠে আসছে। বেপরোয়া গতি, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, চালকের বিশ্রামহীন অতিরিক্ত শ্রম, সড়কের নকশায় ত্রুটি এবং দুর্বল তদারকিই প্রধান কারণ। দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো ও অতিরিক্ত ট্রিপের কারণে চালকদের শারীরিক ও মানসিক অবসাদ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এছাড়া চালকের দক্ষতার পাশাপাশি নিয়োগ, বেতন ও কর্মঘণ্টার বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের তিন জেলায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় ১০ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে তিনজন, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ছয়জন এবং ময়মনসিংহের ত্রিশালে একজন নিহত হয়েছেন। গত রোববার সকাল থেকে গত সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত এসব দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগের এক কার্যসহকারী এবং একজন শ্রমিক রয়েছেন।
সড়কে বেরিয়ে আর ঘরে ফেরা হয়নি হাজারো শিশুর। কেউ মারা গেছে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে, কেউ বাড়ির পাশের সড়কে খেলতে গিয়ে। আবার কেউ প্রাণ হারিয়েছে মোটরসাইকেলের চালক বা আরোহী হিসেবে। গত প্রায় সাত বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৭ হাজার ৯৬৩ শিশু। তাদের মধ্যে ৩৭ শতাংশের বেশি মারা গেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। আর সড়ক পারাপার ও রাস্তায় হাঁটার সময় প্রাণ গেছে ২ হাজার ৮১২ শিশুর। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু নিহত হওয়ার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এই ১২ বছর বাংলাদেশে ৭০ হাজার ৯৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ৯৭ হাজার ৪০৬ জন এবং পঙ্গু হয়েছেন ১ লাখ ৭১ হাজার ৭০০ জন।
গড়ে এখানে প্রতিদিন প্রায় ৬৬ জন মানুষ রাস্তায় প্রাণ হারাচ্ছেন। তার অর্থ হচ্ছে, প্রতি ঘণ্টায় প্রায় তিন জন মানুষ চলে যাচ্ছেন। জনস্বাস্থ্য নিয়ে শিরোনাম হওয়া অনেক রোগের প্রাদুর্ভাবেও একদিনে এত মানুষ মারা যায় না। সড়কে মৃত্যু হঠাৎ করেই হয় এবং মারা যান তরুণ ও অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় নাগরিকরা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের কিশোর ও তরুণদের মৃত্যুর প্রধান কারণই সড়ক দুর্ঘটনা। তাদের মৃত্যুর প্রায় ২০ শতাংশের জন্য দায়ী সড়ক দুর্ঘটনা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, দেশে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ এবং সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২ রয়েছে। কিন্তু শুধু আইন প্রণয়ন করলেই সড়ক নিরাপদ হয় না, প্রয়োজন কার্যকর প্রয়োগ, ঝুঁকিভিত্তিক পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়। তিনি বলেন, সড়কের নকশা ও নির্মাণ, যানবাহনের নিরাপত্তা, গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকের যোগ্যতা, হেলমেট ও সিটবেল্টের ব্যবহার, পথচারীর নিরাপত্তা এবং দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসা—সব ক্ষেত্রকে সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। তার মতে, দুর্ঘটনার কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবগত থাকলেও ধারাবাহিক ও সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে কার্যকর সমাধান হচ্ছে না। কোনো দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন বা বিশেষ দিবসে সভা-সেমিনার আয়োজন করলেই স্থায়ী পরিবর্তন আসে না।
বাংলাদেশে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছেন ৬৬ জন। দুর্ঘটনার অর্থনৈতিক পরিণতিও বেশ ভয়াবহ। যারা মারা যান বা আহত হন—তারা দেশের বহু পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী সদস্য। সড়ক দুর্ঘটনার মৃত অর্ধেকেরও বেশি মানুষ পরিবারের উপার্জনের প্রধান ভরসা। এমন মানুষ মারা গেলে সেই পরিবার হঠাৎ করেই দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে। একটি পুরো পরিবার একদিনের মধ্যে তাদের আর্থিক স্থিতি হারিয়ে ফেলে। জাতীয় অর্থনীতিও এক বড় ক্ষতির মুখে পড়ে। দুর্ঘটনায় আহত অনেক মানুষ দীর্ঘমেয়াদি প্রতিবন্ধকতায় ভোগেন, ফলে উৎপাদনশীলতা কমে যায়, তাদের চিকিৎসা ব্যয় প্রয়োজন হয় এবং তারা আসলে পিছিয়ে পড়েন। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক বছরের ব্যবধানে পরিবহন দুর্ঘটনার কারণে দেশের অর্থনীতিতে ১০ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর আনুমানিক ২৪ হাজার ২৩৩ জন প্রাণ হারান। দৈনিক গড়ে ৬৬ জন। প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার ১৪ দশমিক ৬৭। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের ৮৪ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ এবং ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ নারী। জরিপে গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরাঞ্চলে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার বেশি পাওয়া গেছে। শহরে প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে মৃত্যুর হার ১৬ দশমিক ৫৬। গ্রামাঞ্চলে এই হার ১৩ দশমিক ৮১।
সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশের উপনির্বাহী পরিচালক সেলিম মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু, মারাত্মক আহত ও নিহতের বেশির ভাগই বয়সে তরুণ। নিম্ন আয়ের মানুষ এবং পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিই বেশি। পঙ্গু হয়ে গেলে তাঁরা পরিবার ও রাষ্ট্রের জন্য বোঝায় পরিণত হন। দুর্ঘটনা কমাতে আইন প্রণয়ন, প্রয়োগ ও সচেতনতায় জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। জাতীয় স্বাস্থ্য ও আঘাত জরিপ অনুসারে, দেশে প্রতিবছর বিভিন্ন কারণে প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ ৭৪ হাজার মানুষ প্রাণঘাতী নয়, এমন আঘাতের শিকার হন। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন ৩০ লাখ ৩১ হাজার ২৮ জন। অর্থাৎ প্রাণঘাতী নয়, এমন আঘাতের প্রায় ১৮ দশমিক ৩ শতাংশের কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে বছরে প্রায় ১ হাজার ৮৩৫ জন সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন। জরিপে স্থায়ী পঙ্গুত্ববরণ কিংবা প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন—এমন দুর্ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার সবচেয়ে গুরুতর পরিণতিগুলোর একটি স্থায়ী পঙ্গুত্ব বা প্রতিবন্ধী হয়ে পড়া। জরিপের হিসাবে, দেশে প্রতিবছর বিভিন্ন ধরনের আঘাতের কারণে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৯ জন স্থায়ীভাবে পঙ্গু বা প্রতিবন্ধী হন। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বছরে ৩৮ হাজার ২৮ জন স্থায়ী পঙ্গুত্ববরণ করেন বা প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন। দৈনিক হিসাবে যা ১০৪ জন। দেশে আঘাতজনিত স্থায়ী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রায় ২৭ দশমিক ৪ শতাংশের কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। জরিপে স্থায়ী প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি, হাতের কার্যক্ষমতা, চলাফেরা কিংবা মানসিক কার্যক্ষমতা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
২০২১ সালে রাজশাহীতে বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে একটি মাইক্রোবাসে আগুন ধরে ১৭ জন মারা যান। মাইক্রোবাসের যাত্রীরা সবাই একই পরিবারের সদস্য ছিলেন। বাবা-মা ও আত্মীয়দের হারিয়ে একমাত্র বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি পাভেল মিয়া। তখন তাঁর বয়স ছিল ১৭ বছর। রংপুর পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজে সবে ভর্তি হয়েছিলেন। দুর্ঘটনার পর পাভেল তিন মাস আইসিইউতে ছিলেন। দুটি দাঁত ও ডান হাতের বুড়ো আঙুল স্থায়ীভাবে হারিয়েছে। কথা বললে এখনো জড়িয়ে যায়। পড়াশোনাও আর হয়নি। পাভেল বলেন, তিনি কোনো কাজ করতে পারেন না। একটা সরকারি চাকরি পেলে জীবন চালানো যেত।





