শেরপুরের ঐতিহ্যবাহী দই স্বাদে ও গুণে অতুলনীয়

Sadek Ali
এসআই বাবলু, শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৫:৩৫ অপরাহ্ন, ৩১ অগাস্ট ২০২৫ | আপডেট: ৯:২২ অপরাহ্ন, ৩১ অগাস্ট ২০২৫
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

শেরপুর বগুড়া জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে একটি স্বনামধন্য অন্যতম উপজেলা নামে খ্যাত। আর এই উপজেলাতেই বগুড়ার সুনামধন্য ঐতিহ্যবাহী স্বাদে ও গুণে অতুলনীয় দইয়ের উপজেলা হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছে। শেরপুরের দই বগুড়ার সারা শহরসহ অন্যান্য জেলা উপজেলাতেও সুনাম কুড়িয়েছে। তাই এই দই শেরপুর বগুড়ার নামের ভেতরেই যেন লুকিয়ে আছে শত বছরের ঐতিহ্য। বগুড়াকে অনেকেই বলেন দইয়ের রাজধানী। মূলত বগুড়ার শেরপুর উপজেলা ঐতিহ্যবাহী দইয়ের জন্য বিখ্যাত। বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে ভোজনবিলাসীদের পরিতৃপ্ত খাবারের পর অপূর্ণ থেকে যায় স্বাদে ও গুণে ভরা শেরপুরের দই। সামাজিক প্রীতি ভোজের শেষ পাতে দই না হলে যেন চলেই না।

এদিকে নতুন করে মাইলফলক সৃষ্টি হলো প্রায় ২৫০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বগুড়ার দইয়ে। বিখ্যাত এই সরার দই অর্জন করেছে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি। এর ফলে নতুন সম্ভাবনার আলো দেখছে শেরপুর উপজেলা সহ বগুড়া শহরের দই ব্যবসায়ীরা। তবে গন্তব্যের শেষ এখানেই নয়। বিশ্ববাজারে বগুড়ার দই উপস্থাপন করতে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল। বিষয়টি নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়ন হলেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়তে পারে শেরপুরসহ বগুড়ার দইয়ের স্বাদ। বিগত ২৬শে জুন/২৩ এক সভায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) যাচাই-বাছাই শেষে বগুড়ার দইকে জিআই পণ্য হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন: সোনাতলা থানার ওসি দায়িত্বে অবহেলা ও দুর্নীতির অভিযোগে ক্লোজ

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, প্রায় ২৫০ বছর আগে শেরপুর উপজেলা থেকে বগুড়ার দইয়ের ইতিহাস শুরু হয়। তৎকালীন বগুড়ার শেরপুরের ঘোষ পরিবারের ঘেটু ঘোষ প্রথম দই তৈরি শুরু করেন। তবে স্বাধীনতার পূর্বে শেরপুরে নীলকণ্ঠ ঘোষ, নারায়ণ ঘোষ, আনন্দ ঘোষ, সদানন্দ ঘোষ অর্থাৎ ঘোষ পরিবারের সদস্যদের হাতে প্রথমে সরার দইয়ের প্রচলন শুরু হয়। প্রায় ১৫০ বছর আগে তার হাতেই সরার দই প্রসার লাভ করে শেরপুরের নীলকণ্ঠ ঘোষের মাধ্যমে। একসময় টক দইয়ের প্রচলন ছিল সবচেয়ে বেশি। তবে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আস্তে আস্তে হিন্দু এবং মুসলিম পরিবারের অনেকে এই পেশায় সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে শেরপুরের সাউদিয়া, জলযোগ, বৈকালী, সম্পা, চৈতি, ঊষা, লোকনাথ প্রভৃতি নামে দইয়ের দোকানের প্রসার লাভ করে। টক দই তৈরি থেকে বংশ পরম্পরায় তা চিনি পাতা বা মিষ্টি দইয়ে রূপান্তরিত হয়। বিগত ২৫০ বছর আগে দইয়ের ঐতিহ্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে স্থান দখল করেছে বিশ্বজুড়ে। এভাবেই আস্তে আস্তে বগুড়ায় প্রসার লাভ ঘটে দইয়ের বিস্তৃত বাজার। স্থানীয়ভাবে যে প্যাকেট দই দেওয়া হয় তা শীতকালে ৪ থেকে ৫ দিন, আর গরমকালে ২-৩ দিন ঠিক থাকে। দইয়ের ক্ষেত্রে আর এই বিশ্বখ্যাতি অর্জনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে বগুড়ার শেরপুরের দইয়ের কারিগররা। সেই সাথে দইয়ের ঐতিহ্য রক্ষার পাশাপাশি একচেটিয়া ব্যবসাও পরিচালনা করছেন এখানকার ব্যবসায়ীরা।

এছাড়াও মূলত দু’ধরনের দই তৈরি হয় বগুড়ার শেরপুরে। তা হলো টক দই আর মিষ্টি দই। কোনো প্রকার চিনি ছাড়া যে দই তাকে বলা হয় টক দই। প্রথম দিকে উপজেলার বিভিন্ন দই কারখানাতে টক দই তৈরি হলেও স্বাদের বৈচিত্র্য ও ভিন্নতার কারণে টক দইয়ের পাশাপাশি মিষ্টি দই এখন পুরো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী শেরপুরে প্রায় ২০০ শতাধিক দইয়ের কারখানা বিদ্যমান। এসব দই কারখানায় কাজ করেন প্রায় ২৫০০ জন কর্মচারী। দই বিক্রয় কেন্দ্রের কর্মচারীসহ প্রায় ৫ হাজার জনশক্তি প্রত্যক্ষভাবে দই তৈরি ও বিক্রির কাজে সম্পৃক্ত। পুরো শেরপুর উপজেলায় প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৪শ মণ দই উৎপাদনের সাথে খিরসা, মিষ্টি সহ মাসে প্রায় ২০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক লেনদেন হয়। সরাসরি দই বিক্রয় কেন্দ্রের পাশাপাশি উপজেলার অনেক তরুণ উদ্যোক্তা অনলাইনেও দই বিক্রি করে থাকেন।

আরও পড়ুন: কুলাউড়ায় বিএনপির কাউন্সিলে ৫ পদে ১৭ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র দাখিল

এ বিষয়ে শেরপুরের দই ব্যবসায়ী পার্থ সারথী সাহা বলেন, “শেরপুরের দই বগুড়া শহরসহ সারা দেশে খ্যাতি অর্জন করেছে। আমরা চেষ্টা করছি আমাদের ঐতিহ্য রক্ষা করে ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য। দুধের দাম ওঠানামা করার জন্য এবং অন্যান্য সামগ্রীর দাম অতিরিক্ত হওয়াতে বর্তমানে দইয়ের দামও বেড়েছে। তবে আসল স্বাদের দই খেতে হলে শেরপুরের কোনো বিকল্প নেই।”

এদিকে দই কিনতে আসা টাঙ্গাইল জেলার অধিবাসী ইসমাইল হোসেন জানান, “বগুড়ার শেরপুরে সবচেয়ে ভালো দই পাওয়া যায়। অতুলনীয় দইয়ের স্বাদ প্রায় সময়ই আমাদের বগুড়ার শেরপুরে টেনে আনে। দইয়ের সাথে বর্তমানে আমি ও আমার পরিবারের একটা ভালো লাগা, ভালোবাসার সৃষ্টি হয়ে গেছে।”

সব মিলিয়ে শেরপুরের দই স্বাদে ও গুণে অতুলনীয়। এজন্যই শেরপুরের দই বেঁচে থাকবে চিরদিন আমাদের সকলের মাঝে।