সাতক্ষীরা কালিগঞ্জ সরকারি হাসপাতাল কার্যত অচল চিকিৎসক সংকটে

Sanchoy Biswas
সৈয়দ আব্দুস সালাম পান্না, সাতক্ষীরা
প্রকাশিত: ৭:৫২ অপরাহ্ন, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ | আপডেট: ১১:৩৬ পূর্বাহ্ন, ০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বর্তমানে চরম চিকিৎসক সংকটে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। হাসপাতালে ৩৪ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র ৩ জন। ফলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডেন্টাল বিভাগ, রেডিওগ্রাফি, অপারেশন থিয়েটার বন্ধ হয়ে গেছে এবং অ্যাম্বুলেন্স সেবাও দীর্ঘদিন ধরে অচল।

কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল নিয়মিত কর্মরত হলে তালিকা অনুযায়ী ১৬৮ জন বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব পালন করবেন। সে হিসেবে হাসপাতালের মোট জনবলের মধ্যে কনসালট্যান্ট (বিভিন্ন বিভাগ), রেসিডেন্ট/মেডিকেল অফিসার, ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার, সিনিয়র স্টাফ নার্স, স্টাফ নার্স, মিডওয়াইফ, ল্যাব টেকনিশিয়ান, এক্স-রে/ইমেজিং টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্ট, ওয়ার্ড বয়/আয়া, ওয়ার্ড মাস্টার, ক্লিনার, ক্যাটারিং স্টাফ, ম্যানেজার, হিসাবরক্ষক, রিসেপশনিস্ট অন্তর্ভুক্ত থাকেন। ২৪ ঘণ্টা সেবা প্রদানের জন্য ৩ শিফটে কাজ করার কথা।

আরও পড়ুন: এনসিটি ইজারা বিরোধে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু, অচল চট্টগ্রাম বন্দর

চিকিৎসক সংকটের কারণে বর্তমানে ৩৪ জন ডাক্তার ও ২৫ জন স্টাফ নার্স, মিডওয়াইফ, টেকনোলোজিস্ট, ওয়ার্ড বয় থেকে মালি পর্যন্ত বসে বসে সময় কাটাচ্ছেন এবং বেতন সুবিধা ভোগ করছেন, চিকিৎসা সেবা প্রদান ব্যতীত। খবরের অন্তরালে সরকারি ঔষধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সুবিধা লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে রোগীদের পক্ষ থেকে।

সোমবার (২২ ডিসেম্বর) দিনব্যাপী সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়মিত কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন চিকিৎসক। এর বাইরে ডা. এ. এম. মুসাদ্দিক হোসাইন খান সপ্তাহে মাত্র দুই দিন রোগী দেখেন এবং ডা. গৌতম চক্রবর্তী সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেন, ফলে কালিগঞ্জে পূর্ণ সময় উপস্থিত থাকেন না। ফলে প্রতিদিন শত শত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ৩ জন চিকিৎসকের।

আরও পড়ুন: ‘আসমানে ফয়সালা হয়ে গেছে তারেক রহমানই আগামীর প্রধানমন্ত্রী’

চিকিৎসক সংকটের কারণে হাসপাতালে আসা রোগীদের ভোগান্তির শেষ নেই। বিশেষ করে ইমার্জেন্সি বিভাগে স্ট্রোক ও দুর্ঘটনায় আহত রোগীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে রোগী ‘রেফার্ড’ দেখিয়ে সাতক্ষীরা সদর বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। রোগীরা অভিযোগ করেছেন, রেফার্ডের নামে সময় ক্ষেপণ করা হয়, এতে পথিমধ্যে রোগীর অবস্থা আরও গুরুতর হয়ে পড়ে, এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, হাসপাতালের ভেতর ও আশপাশে সক্রিয় রয়েছে একটি দালাল চক্র। তারা রোগীদের অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করে দেওয়ার নাম করে টাকা আদায় করছে, আবার অনেককে বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে প্রলুব্ধ করছে। ফলে রোগীরা একদিকে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।

শফিকুল ইসলাম নামে এক রোগী অভিযোগ করে বলেন, “ডাক্তার দেখানোর পর ওষুধ নিতে গেলে প্যারাসিটামল আর পেট কামড়ানোর ওষুধ ছাড়া কিছুই পাই না। ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই, নামে মাত্র সরকারি হাসপাতাল।” স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালের এই বেহাল অবস্থার সুযোগ নিয়ে কালিগঞ্জের বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলো রমরমা ব্যবসা চালাচ্ছে। এতে কালিগঞ্জের প্রায় সাড়ে ৪ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয় আইনজীবী অ্যাডভোকেট জাফর উল্লাহ ইব্রাহিম বাংলাবাজার পত্রিকাকে বলেন, “সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, কালিগঞ্জ হাসপাতালে ডাক্তার নেই। রোগীরা প্রতারিত হচ্ছে, দালালের খপ্পরে পড়ছে। কোনো চিকিৎসা না দিয়ে শুধু ‘রেফার্ড’ করে হাজার হাজার টাকা নষ্ট করানো হচ্ছে।”

এই বিষয়ে কালিগঞ্জ উপজেলা ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রূপা রানী পাল বলেন, “আমাদের ডাক্তার সংকট চরমে। আমি সহ মোট তিনজন চিকিৎসক দিয়ে হাসপাতাল চালানো হচ্ছে। এখানে ৩৪ জন চিকিৎসক থাকার কথা। এই মুহুর্তে আমার সাথে আছেন ডাঃ অঞ্জন এবং ডাঃ আজাদুল হক। তবে আরও চিকিৎসক পদায়ন করা হলে সেবার মান উন্নত হবে।”

এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগ, বন্ধ থাকা বিভাগগুলো চালু করা, অ্যাম্বুলেন্স মেরামত এবং দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে জনস্বাস্থ্য চরম ঝুঁকিতে পড়বে।