সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে মৃত্যু ৯, ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে একটি জাহাজভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজের ভেতর বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন অসুস্থ হয়েছেন। দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতা ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনীর একটি ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছে।
শুক্রবার সকালে ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ড অ্যান্ড রিসাইক্লিং কারখানায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
আরও পড়ুন: নলছিটি পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ৩০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ঝুঁকি বিবেচনায় সম্ভব হলে উদ্ধারকাজেও সেনাসদস্যরা সহায়তা করবেন।
তিনি বলেন, জাহাজের ভেতরে গ্যাসের উপস্থিতি থাকায় সেখানে প্রবেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। উদ্ধারকাজ পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। দুর্ঘটনার পর একজন সাংবাদিকও গ্যাসে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৮
দুর্ঘটনার সময় শ্রমিকেরা একটি স্ক্র্যাপ জাহাজের ভেতরে কাজ করছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, হঠাৎ কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক ইশতিয়াক রহমান জানান, দুই দফায় ওই কারখানা থেকে সাতজনকে হাসপাতালে আনা হয়। তাঁদের মধ্যে ছয়জনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। অপর একজনকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। নিহতদের মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
সীতাকুণ্ড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আলমগীর জানান, ঘটনাস্থলে আরও দুজনের মরদেহ ছিল। পরে মৃতের সংখ্যা বেড়ে আটজনে দাঁড়ায়। সর্বশেষ আরও একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ফলে এ ঘটনায় মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯ জনে।
নিহতদের মধ্যে সানি জলদাস (২২), পলাশ জলদাস (২৭), দুই সহোদর মনসুর আলী (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮)-এর পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁদের বাড়ি ভাটিয়ারী এলাকায়।
স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, সকালে কারখানার ভেতর থেকে হঠাৎ মানুষের চিৎকার শুনতে পান তাঁরা। পরে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা ঘটনাস্থলে গিয়ে অসুস্থ শ্রমিকদের গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখেন।
এরপর স্ক্র্যাপ জাহাজের ভেতরে কয়েকজন শ্রমিকের মরদেহ পড়ে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে কয়েকজন কারখানার ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর করেন। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, সকালে তাঁদের দুটি নৌকা সাগর থেকে ইলিশ ধরে উপকূলের দিকে ফিরছিল। এ সময় কারখানার দিক থেকে আসা তীব্র গ্যাসের গন্ধের কারণে তাঁরা ওই এলাকার খালে ঢুকতে পারেননি। প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে গিয়ে নৌকা ভেড়াতে হয়।
ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম জানান, জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। যে জাহাজটি কাটা হচ্ছিল, সেটি আগে এলএনজি বহন করত বলে জানা গেছে।
তিনি বলেন, এ ধরনের জাহাজ কাটার আগে ট্যাংক ও অন্যান্য অংশ সম্পূর্ণভাবে গ্যাসমুক্ত করা জরুরি। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট জাহাজের ট্যাংক পুরোপুরি গ্যাসমুক্ত না করেই কাটার কাজ শুরু করা হয়েছিল।
ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা জানান, জাহাজের কিছু ট্যাংকে ক্ষতিকর গ্যাস থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের গ্যাস শ্রমিকদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি দুর্ঘটনাস্থলে শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থাও পর্যাপ্ত ছিল না বলে প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে।
কারখানার মালিকের প্রতিনিধি মো. মহিউদ্দিন জানান, দুর্ঘটনার সময় তিনি কারখানার বাইরে ছিলেন। কারখানা থেকে তাঁকে জানানো হয়েছে, অসতর্কতার কারণে জাহাজে থাকা কয়েকজন কর্মী বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়েছেন। পরে তিনি কারখানায় গিয়ে বিস্তারিত পরিস্থিতি জানার কথা বলেন।
দুর্ঘটনার পর কারখানা ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকি থাকায় উদ্ধার তৎপরতাও ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করছেন।
ঘটনার প্রকৃত কারণ, জাহাজটি যথাযথভাবে গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কি না এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।





