নালিতাবাড়ীতে গৃহবধূর মৃত্যু: অপমৃত্যুর মামলা, স্বজনের মুখে হত্যার অভিযোগ

Sanchoy Biswas
পুলক রায়, নালিতাবাড়ী (শেরপুর)
প্রকাশিত: ৬:৪০ অপরাহ্ন, ১৭ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ৫:৫৬ অপরাহ্ন, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে মুন্নি আক্তার সাগরিকা (২০) নামে এক গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় রহস্য ঘনীভূত হয়েছে। এটি আত্মহত্যা, নাকি পারিবারিক কলহের জেরে তাকে হত্যা করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে—এ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে নিহতের স্বজন ও পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য। পরিবারের দাবি, সাগরিকাকে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হালুয়াঘাট উপজেলার চর গোরকপুর গ্রামের মমতাজ হোসেনের মেয়ে সাগরিকা গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। একই প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুবাদে নালিতাবাড়ীর ফকিরপাড়া গ্রামের নদীরপাড় এলাকার মৃত শামছুল হকের ছেলে মনির হোসেন ওরফে আবু সামা (৩৫)-এর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং প্রায় এক বছর আগে তারা বিয়ে করেন।

আরও পড়ুন: কুলাউড়ায় অগ্রণী উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের দেয়াল পত্রিকার মোড়ক উন্মোচন

প্রথম দিকে পরিবার বিয়ে মেনে না নিলেও কয়েক মাস আগে তারা সম্পর্ক মেনে নেন। এরপর স্বামীর বাড়ি ফকিরপাড়ায় বসবাস শুরু করেন সাগরিকা। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, আবু সামার এর আগে আরও তিনটি বিয়ে হয়েছিল। পারিবারিক নানা বিরোধে সেসব সংসার টেকেনি। আগের স্ত্রীর একটি সন্তানও রয়েছে তার।

স্বজন ও প্রতিবেশীদের অভিযোগ, আবু সামা মাদকাসক্ত। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি থেকে যৌতুকের টাকা এনে দেওয়ার জন্য সাগরিকাকে চাপ দেওয়া হতো। এ নিয়ে প্রায়ই তাদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ লেগে থাকত। এমনকি মৃত্যুর আগের দিনও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ হয়েছিল বলে জানান স্থানীয়রা।

আরও পড়ুন: আশুলিয়ায় দুই পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বিক্ষোভ

ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাত পৌনে ১২টার দিকে আবু সামা ফোন করে সাগরিকার বাবাকে জানান, তার স্ত্রী স্ট্রোক করে মারা গেছেন। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে রাতেই আবু সামার বাড়িতে যান। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান, সাগরিকার মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থা থেকে নামিয়ে মেঝেতে রাখা হয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের প্রশ্ন, পুলিশ কিংবা স্বজনেরা বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই কেন মরদেহ নামানো হলো? এই ঘটনাই তাদের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয়। পরে পুলিশ সুরতহাল শেষে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়।

নিহতের বাবা মমতাজ হোসেনের অভিযোগ, মেয়েকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। বিষয়টি পুলিশকে মৌখিকভাবে জানানোর পরও তার কাছ থেকে কম্পিউটারে তৈরি একটি অপমৃত্যুর আবেদনে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। পরে অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

স্থানীয় কয়েকজন প্রতিবেশীও ঘটনাটিকে স্বাভাবিক আত্মহত্যা হিসেবে মানতে পারছেন না। তাদের ভাষ্য, আত্মহত্যা হয়ে থাকলেও এর পেছনে পারিবারিক নির্যাতন বা কলহের ভূমিকা থাকতে পারে। আবু সামার আগের তিনটি বিয়ে টেকেনি এবং সাগরিকার সঙ্গেও নিয়মিত বিরোধ হতো বলে তারা দাবি করেন।

এদিকে, পরিবারের অভিযোগের পরও কেন সরাসরি আত্মহত্যার প্ররোচনা কিংবা হত্যা মামলা করা হলো না—এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

নালিতাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফুজ্জামান বলেন, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলেই মনে হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর যদি হত্যার কোনো আলামত পাওয়া যায়, তাহলে সেটি হত্যা মামলা হিসেবে নেওয়া হবে।

তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শরিফ বলেন, ইতোমধ্যে অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। ময়নাতদন্তে হত্যার প্রমাণ পাওয়া গেলে পরবর্তী সময়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে সাগরিকার পরিবারের দাবি, মৃত্যুর আগে নির্যাতন ও পারিবারিক কলহের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হোক। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনেই শেষ পর্যন্ত এই তরুণীর মৃত্যুর পেছনে আত্মহত্যা, প্ররোচনা নাকি হত্যাকাণ্ড—সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।