ফতেহপুর জামশেদীয়া দরবার শরীফে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপন

Sanchoy Biswas
ইলিয়াছ সুমন, সোনাগাজী (ফেনী)
প্রকাশিত: ৯:৩৮ অপরাহ্ন, ২৬ অগাস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১০:৩৩ অপরাহ্ন, ২৬ অগাস্ট ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার নবাবপুরে ঐতিহ্যবাহী ফতেহপুর জামশেদীয়া দরবার শরীফে সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদযাপন করা হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জন্ম ও ধরাধামে আগমনকে স্মরণ করে বুধবার (২৬ আগস্ট), ১২ রবিউল আউয়াল সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত দরবার শরীফে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়।

ফতেহপুর জামশেদীয়া জামে মসজিদে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর মহানবী (সা.)-এর পবিত্র জীবন, আদর্শ, মানবিকতা ও তাঁর আগমনের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা, মিলাদ ও কিয়াম অনুষ্ঠিত হয়। জোহরের নামাজের পর দেশ, জাতি, মুসলিম উম্মাহ এবং সমগ্র মানবজাতির শান্তি ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। পরে উপস্থিত মুসল্লি ও অতিথিদের মধ্যে তবারক বিতরণ করা হয়।

আরও পড়ুন: গরু কাটার ‘খাইট্টায়’ কাস্টমস কর্মীর মরদেহ ১৫ টুকরো, গ্রেপ্তার ২

অনুষ্ঠানে দোয়া ও মোনাজাত পরিচালনা করেন অলীয়ে কামেল শাহ্ সূফী হযরত মাওলানা মোহাম্মদ জামশেদ আলম ফতেহপুরী, স্থানীয়ভাবে যিনি ‘ফুল হুজুর’ নামে পরিচিত। আলোচনা, মিলাদ ও কিয়াম পরিচালনা করেন যথাক্রমে ফতেহপুর জামশেদীয়া দরবার শরীফের সভাপতি মাস্টার মো. এমরান, সাধারণ সম্পাদক হাজী নুরুল আমিন মাস্টার এবং ফতেহপুর জামশেদীয়া সুন্নীয়া হাফেজীয়া মাদ্রাসার শিক্ষক ও মসজিদের খতিব হাফেজ মাওলানা মোহাম্মদ আবুল হাসেম।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ঈদে মিলাদুন্নবী নবীপ্রেমিকদের হৃদয়ে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। মহানবী (সা.)-এর আগমনকে তাঁরা আল্লাহর পক্ষ থেকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁদের মতে, পবিত্র কোরআনের আয়াতে আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহে আনন্দ প্রকাশের যে নির্দেশনা রয়েছে, মহানবী (সা.)-এর আগমন সেই রহমতেরই সর্বশ্রেষ্ঠ প্রকাশগুলোর একটি হওয়ায় তাঁর জন্ম ও আগমনকে স্মরণ করে আনন্দ প্রকাশ করা নবীপ্রেমিকদের ভালোবাসার স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ।

আরও পড়ুন: গোবিন্দগঞ্জে নদীতে গোসল করতে নেমে কিশোরের মর্মান্তিক মৃত্যু


এ প্রসঙ্গে বক্তারা সুরা আল-আম্বিয়ার ১০৭ নম্বর আয়াত উল্লেখ করে বলেন—“হে হাবীব! নিশ্চয়ই আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।” তাঁদের বক্তব্য, এ আয়াত মহানবী (সা.)-এর আগমনের সার্বজনীন তাৎপর্য স্পষ্ট করে। তিনি যেহেতু বিশ্বজগতের জন্য আল্লাহর রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন, তাই তাঁর পবিত্র জন্ম ও আগমনকে স্মরণ করা এবং তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করা মুসলমানদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

পাশাপাশি সুরা ইউনুসের ৫৮ নম্বর আয়াত তুলে ধরে বক্তারা বলেন—“আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত প্রাপ্তিতে আনন্দ উদযাপন কর যা তোমাদের সমস্ত ধন-দৌলত অপেক্ষা শ্রেয়।” আয়োজকদের ব্যাখ্যায়, এ আয়াতে আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত লাভে আনন্দ প্রকাশের নির্দেশনা রয়েছে। সেই নির্দেশনার আলোকে মহানবী (সা.)-এর আগমনকে আল্লাহর মহান রহমত হিসেবে স্মরণ করে আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা প্রকাশ করা হয়। এই দুই আয়াতের আলোকে ঈদে মিলাদুন্নবীকে তাঁরা নবীপ্রেমিকদের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ এবং আল্লাহর রহমতের শুকরিয়া আদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখেন।

বক্তারা আরও বলেন, ঈদে মিলাদুন্নবী শুধু আনন্দ বা আনুষ্ঠানিকতার বিষয় নয়; বরং এ দিন মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ স্মরণ করে তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের অঙ্গীকার করারও দিন। তাঁর সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ন্যায়পরায়ণতা, দয়া, ক্ষমাশীলতা, মানবিকতা ও শান্তির শিক্ষা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে বাস্তবায়ন করাই হওয়া উচিত নবীপ্রেমের প্রকৃত বহিঃপ্রকাশ। তাঁদের মতে, মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা যত গভীর হবে, তাঁর আদর্শ অনুসরণের আকাঙ্ক্ষাও তত দৃঢ় হবে।

এ বিশ্বাস ও ব্যাখ্যার ভিত্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের একটি বড় অংশ ১২ রবিউল আউয়াল মহানবী (সা.)-এর জন্ম ও আগমন স্মরণের দিন হিসেবে ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করে থাকেন। বিভিন্ন স্থানে এ উপলক্ষে মিলাদ, কিয়াম, দরূদ পাঠ, আলোচনা সভা, দোয়া-মোনাজাত ও তবারক বিতরণের আয়োজন করা হয়।

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে ফতেহপুর জামশেদীয়া দরবার শরীফ, জামে মসজিদ, মাদ্রাসা ও পুরো দরবার এলাকা নয়নাভিরাম আলোকসজ্জায় সাজানো হয়। এতে পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর ও মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। এ ছাড়া ফতেহপুর জামশেদীয়া সুন্নীয়া দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীরা সম্মিলিতভাবে ১৫ লাখ বার দরূদ শরীফ পাঠ করেন বলে আয়োজকরা জানান। মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিবেদনের অংশ হিসেবে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।

অনুষ্ঠানে ফতেহপুর জামশেদীয়া দরবার শরীফের আশেকান-মুরিদান, ধর্মপ্রাণ মুসল্লি, মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। দিনব্যাপী আয়োজনে দেশ ও জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য এবং সমগ্র মানবজাতির শান্তি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। মোনাজাত শেষে উপস্থিত মুসল্লি ও অতিথিদের মধ্যে তবারক বিতরণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।

আয়োজকরা বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জন্ম ও ধরাধামে আগমনকে স্মরণ করা, তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করা এবং তাঁর জীবন ও আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনের অন্যতম উদ্দেশ্য। নবীপ্রেমিকদের কাছে এ দিনটি তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়; বরং মহানবী (সা.)-এর প্রতি তাঁদের হৃদয়ের ভালোবাসা, দরূদ ও সালামের মাধ্যমে প্রকাশিত এক বিশেষ আনন্দের দিন।