রংপুরে সাংবাদিক হত্যা ঘটনায় ১ জনের মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন ২

Any Akter
রংপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ৭:৪৭ অপরাহ্ন, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ৯:৩২ অপরাহ্ন, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

রংপুরে আলোড়ন সৃষ্টিকারী সাংবাদিক মশিউর রহমান ওরফে উৎস রহমান হত্যা মামলায় একজনকে মৃত্যুদণ্ড ও দুইজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তবে হত্যা মামলার মূল অভিযুক্ত চিহ্নিত মাদক কারবারি জহিরন আক্তার জুঁই ওরফে গেদিসহ তিনজনকে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস দেওয়া হয়েছে।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রংপুর মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মশিউর রহমান খান এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হলেন রুবেল ওরফে হেকরম এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এলিন ও শুভ কুমারকে। দণ্ডপ্রাপ্ত সকল আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল হাদী বেলাল।

আরও পড়ুন: শরীয়তপুরে চুরি মামলায় ৫ জন গ্রেপ্তার

এদিকে ঘোষিত রায়ে সংক্ষুব্ধ হয়ে উচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট) আপিল করার কথা জানিয়েছে নিহত সাংবাদিক উৎস রহমানের পরিবার ও রংপুরের সাংবাদিক সমাজ।

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় স্থানীয় ‘দৈনিক যুগের আলো’ অফিসে যান সাংবাদিক মশিউর রহমান উৎস। ওই রাতে তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। পরদিন সকালে নগরীর ধর্মদাস এলাকা থেকে একটি গাছের সঙ্গে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় নৃশংসভাবে নিহত উৎস রহমানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের মা নুরজাহান বেগম নুরী বাদী হয়ে রংপুরের কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ পরবর্তীতে আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে এবং আদালত ছয়জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করেন। দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর পর ১১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও উভয় পক্ষের যুক্তি-তর্ক শেষে আজ মামলার রায় দেওয়া হলো।

আরও পড়ুন: উলিপুরে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় নিহতের মা ও মামলার বাদী নুরজাহান বেগম বলেন, "এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। আমরা ন্যায্যবিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি। সুবিচারের আশায় আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব।"

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্দুল হাদী বেলাল ও বাদীপক্ষের আইনজীবী পলাশ কান্তি নাগ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "মামলার মূল অভিযুক্ত জহিরন আক্তার জুঁই ওরফে গেদি তিন লাখ ষাট হাজার টাকা দিয়ে চুক্তি করে সাংবাদিক উৎস রহমানকে হত্যা করিয়েছিল। অথচ আদালত হত্যাকাণ্ডের সেই মাস্টারমাইন্ডকেই বেকসুর খালাস দিয়েছেন। এই রায়ে আমরা আইনজীবীসহ নিহতের পরিবার চরম সংক্ষুব্ধ। এভাবে মূল হোতা পার পেয়ে গেলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাবে।"

বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন রংপুরের সভাপতি মমিনুল ইসলাম রিপন বলেন, "সবাই জানে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে অর্থের জোগানদাতা কে এবং কার নির্দেশে এটি সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু আদালত তথাকথিত প্রমাণের অভাবে সেই মূল নির্দেশদাতাকে খালাস দিয়েছেন। আমরা মনে করি, সাংবাদিক সমাজ আজ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে।"

রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সালেকুজ্জামান ছালেক বলেন, "আমরা অত্যন্ত মর্মাহত। আদালতে সঠিক তথ্য-প্রমাণের অভাবে উৎস রহমান হত্যার মাস্টারমাইন্ড খালাস পেয়ে গেছে, অন্যদিকে দণ্ডপ্রাপ্তরাও পলাতক। বিষয়টি নিয়ে আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে পরবর্তী কর্মসূচি বা পদক্ষেপ ঠিক করব।"

সিটি প্রেস ক্লাবের সভাপতি স্বপন চৌধুরী বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, "এই রায়ে সাংবাদিক সমাজ কোনোভাবেই সন্তুষ্ট নয়। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা পলাতক এবং মূল পরিকল্পনাকারী বেকসুর খালাস পেল—সব মিলিয়ে এটি একটি বিস্ময়কর রায়। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, উচ্চ আদালতে আপিল করা হলে মাস্টারমাইন্ড পার পাবে না।"