ভোলায় বাফার গোডাউন নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

Sadek Ali
এ শাহরিয়ার ঝিলন, ভোলা
প্রকাশিত: ১:৪৭ অপরাহ্ন, ২০ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৩:০৫ অপরাহ্ন, ২০ অক্টোবর ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ভোলায় প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ইউরিয়া সার সংরক্ষণের বাফার গোডাউন নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) তত্ত্বাবধানে চলমান এ নির্মাণকাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের ফলে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এতে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হন প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী।

সরেজমিনে দেখা গেছে, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সুষ্ঠুভাবে সার সংরক্ষণ ও বিতরণ নিশ্চিত করতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩৪টি বাফার গুদাম নির্মাণকাজ করছে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। এই প্রকল্পের ভোলা সদর উপজেলার পশ্চিম ইলিশায় মার্ক বিল্ডার্স লিমিটেড নামের বাস্তবায়নাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উঠেছে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। প্রকল্প নির্মাণে নিম্নমানের বালু, পাথর, ইট ও রডসহ নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই কাজটি চাঁদপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মমিনুল হকের। তাঁর প্রভাব খাটিয়ে প্রকল্পের নির্মাণকাজে নিম্নমানের বালু, পাথর, ইট ও পুরোনো রড ব্যবহার করা হচ্ছিল। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও বিনির্দেশ অনুযায়ী কাজ না করায় গোডাউনের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা শঙ্কায় ১৩ই অক্টোবর দুপুরে চলমান কাজ বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয়রা।

আরও পড়ুন: ভোলায় গণপিটুনিতে আসিফ হত্যা, আসামি ১১ জন

ভোলা সদর উপজেলার ২নং ইলিশা ইউনিয়ন বিজেপির সদস্যসচিব নোমান হাওলাদার বলেন, “আমরা জানতে পেরেছি এটি চাঁদপুরের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মমিনুল হকের কাজ। একজন দেশপ্রেমিক এমপির কাছ থেকে আমরা শতভাগ মানসম্মত কাজ আশা করি। কিন্তু এমপির নাম ব্যবহার করে যদি কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়ম করা হয়, তাহলে তা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জাজনক। আমরা চাই, প্রকল্পের নির্ধারিত প্রাক্কলন (এস্টিমেট) ও সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করা হোক। কাজে সামান্য কমবেশি হতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই নির্ধারিত মানের সঙ্গে আপস করা যাবে না। এই বালু ও নির্মাণসামগ্রী দিয়ে কেউ নিজের বাড়ির উঠানও তৈরি করবে না। তাই এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে আমরা এ ধরনের অনিয়মের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সরকারের দক্ষিণাঞ্চলের সার সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই মেগা প্রকল্পের কাজ প্রায় এক বছর ধরে চলমান রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে আমরা শুনে আসছি, এখানে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে। প্রকল্পের যে প্রাক্কলন রয়েছে, বাস্তবে কাজ তার ধারেকাছেও হচ্ছে না। সার্বিকভাবে কাজটি অনিয়মের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। আমরা সরেজমিনে প্রকল্পের কাজ দেখতে এসেছি। এসে যা দেখলাম, তা আমাদের হতাশ করেছে। এখানে এসে দেখি নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বালুর তুলনায় মাটির পরিমাণ বেশি। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরাও স্বীকার করেছেন, এভাবে কাজ করা ঠিক হয়নি বলে তাঁরা মনে করেন।

তিনি আরও বলেন, এই প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ সার সংরক্ষণ করা হবে। তাই এখানে নির্মাণকাজের মান ও নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পরিবেশ, আবহাওয়া, তাপমাত্রাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় রাখতে হয়। সেখানে যদি নির্মাণকাজে অনিয়ম করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রকল্পে অনিয়ম হলে দেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে তদারকি করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্থানীয় মন্ত্রী, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, হবে।

আরও পড়ুন: রংপুরে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী, চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা

পশ্চিম ইলিশা ইউনিয়নের বাসিন্দা বিজেপি নেতা মোঃ রনি বলেন, বাফার গোডাউন হচ্ছে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার একটি প্রকল্প। এলাকাবাসী আমাদের অভিযোগ দিচ্ছে নিম্নমানের মালামাল দিয়ে এই কাজ চলমান। এলাকাবাসীকে নিয়ে এসে দেখতে পাই একদম নিম্নমানের পাথর, বালি, রড, পাথর দিয়ে ঢালাই চলছে। প্রায় একশোর মতো পিলার অলরেডি উঠে গেছে। এই পিলারগুলো সবই নিম্নমানের পাথর দিয়ে ওনারা কাজ করতেছেন। এখানে সাইটের ইঞ্জিনিয়ারকে আমরা জিজ্ঞাসা করছি যে আপনারা কি এই মালামাল দিয়ে এখানে কাজ করতে পারেন কিনা। বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারের নির্দেশ, কেউ কোনো দুর্নীতি-অনিয়ম করলে ব্যবস্থা নেবে। আমরা এখানে এসে শুনতে পাই এই কাজটি চাঁদপুরের এমপি মমিনুল হকের। একজন এমপি কীভাবে সরকারি কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি করে। একজন এমপি মহোদয়ের কাজেই যদি অনিয়ম হয়, তাহলে জাতি হিসেবে আমরা হতাশ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, কোনো সরকারি কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। আমরা চাই বাজেট অনুযায়ী গুণগত মানসম্পন্ন মালামাল দিয়েই যেন কাজটি সম্পন্ন করা হয়।”

স্থানীয় মাসুম মিয়াজী বলেন, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে এসে কাজের অনিয়ম দেখতে পাই। এখানে এসে দেখি বালু, খোয়া, ইট ও রডসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে কাজ করছে। এখানে এসে জানতে পারি এই কাজটি চাঁদপুরের এমপি ইঞ্জিনিয়ার মমিনুল হকের কাজ। একজন এমপির কাজে অনিয়ম দেখে আমরা খুবই হতাশ হয়েছি। সার ও রাসায়নিক সম্পর্কিত এ ধরনের স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে নিম্নমানের কাজ ভবিষ্যতে বড় ধরনের মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করবে। আমাদের দাবি কোনো উন্নয়নমূলক কাজে অনিয়ম হতে দেওয়া যাবে না। সরকারি অর্থে নির্মিত প্রতিটি কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। এলাকাবাসী হিসেবে আমরা এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।

স্থানীয়রা বলেন, “এতদিন জানতাম, কোনো কাজে দুর্নীতি হলে হয়তো অর্ধেক ভালো আর অর্ধেক খারাপ কাজ হয়। কিন্তু এখানে এসে দেখলাম, পুরো কাজজুড়েই অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। যে বালি ব্যবহার করা হচ্ছে, তাতে বালির চেয়ে মাটির পরিমাণই বেশি। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানাই, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কারণ, এই এলাকায় রাসায়নিক প্রক্রিয়াসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম রয়েছে। এখানে সার ও গ্যাসের মতো ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান থাকতে পারে। নির্মাণকাজে অনিয়মের কারণে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা ঝুঁকি তৈরি হলে আমরা কোথায় যাব? তাই কাজের মান নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি দূর করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”

স্থানীয়রা আরও বলেন, এটি আসলেই দুঃখজনক ও উদ্বেগজনক। আমরা এখানে ঢালাইয়ের কাজ করতে দেখেছি। ঢালাইয়ের ভেতরে ব্যবহৃত বালুর সঙ্গে মাটি ও বড় বড় মাটির চাকাও মিশে রয়েছে। এ ছাড়া, কাজে পুরোনো রড ব্যবহার করতে দেখা গেছে। এভাবে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ চলতে থাকলে প্রকল্পের স্থায়িত্ব ও নির্মাণের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আমরা চাই, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্ত করে কাজের মান নিশ্চিত করুক এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।

প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মার্ক বিল্ডার্স লিমিটেডের প্রকৌশলী দিদারুর রহমান মানিক বলেন, “আমরা সাধারণত এভাবে কাজ করি না। ড্রেজারের মাধ্যমে বালি তুলে এক জায়গায় স্তূপ করে রাখা হয়। সম্প্রতি কাজ করার সময় দুটি গ্রিডের মাঝখানে বালি থাকায়, বেকু দিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বালি সরানো হয়েছে। এ কারণে কিছু বালির সঙ্গে মাটি চলে এসেছে। আমি নিষেধ করার পরও অফিসকক্ষে যাওয়ার সুযোগে এ কাজ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমারও অন্যায় হয়েছে। আমি আমার দায় এড়াতে পারি না। দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি হিসেবে আমার আরও সচেতন হওয়া উচিত ছিল।”

প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী বিসিআইসির প্রকৌশলী ওহিদুজ্জামান বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ বাস্তবায়ন করে এবং তিনি কাজের গুণগত মান তদারকি করেন। সকালে এসে তিনি কাজ দেখে সংশ্লিষ্ট লটের কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। পরে বাসায় বিশ্রামে যাওয়ার ফাঁকে এলাকাবাসী সেখানে গিয়ে অনিয়ম দেখতে পান। তিনি বলেন, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের বিষয়ে তাঁদের কোনো নির্দেশনা ছিল না। শ্রমিকেরা হয়তো নিজেদের মতো করে এমনটি করে থাকতে পারেন। তবে এভাবে কাজ হওয়ার কথা নয়। সাম্প্রতিক ঢালাইয়ের সময় কাটাকাটি শুরু হওয়ার পর এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। এর আগে বালি ছেঁকে নেওয়ার কথা ছিল।

স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে চাঁদপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মমিনুল হকের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোনে কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এলাকাবাসীর দাবি, নির্মাণকাজে অনিয়মের বিষয়টি নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক এবং নির্ধারিত মান বজায় রেখে পুনরায় কাজ শুরু করা হোক।