পর্যটকের ঢলে চাঙ্গা সিলেট: ছুটির জোয়ারে অতীতের রেকর্ড ভঙ্গ, শত কোটি টাকা বাণিজ্যের আশা

Shahrier Islam Pallab
জুলফিকার তাজুল, সিলেট
প্রকাশিত: ৮:১২ অপরাহ্ন, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ৮:১২ অপরাহ্ন, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
হোটেলে রুম না পেয়ে শাহজালাল মাজারে রাত্রিযাপন করছেন পর্যটকরা। ছবিঃ  বাংলাবাজার পত্রিকা
হোটেলে রুম না পেয়ে শাহজালাল মাজারে রাত্রিযাপন করছেন পর্যটকরা। ছবিঃ বাংলাবাজার পত্রিকা

এবারের দুর্গাপূজায় ছুটির তালিকা ছিল পাঁচ দিনের। ছুটি শুরুর আগে ও পরে দুই শুক্রবার ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় শিক্ষার্থীরা আরও চার দিন ছুটি কাটানোর সুযোগ পায়। আবার ২৫ অক্টোবর রোববার লক্ষ্মীপূজা হওয়ায় আরও এক দিন যোগ হয় ছুটির তালিকায়। 

ফলে ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৬ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ১০ দিনের ছুটির আমেজে রয়েছে পুরো দেশ। আর দীর্ঘ এ ছুটিকে কেন্দ্র করে জমে উঠেছে সিলেটের পর্যটন খাত। দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য সিলেট। তাই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটি উপভোগ করতে পর্যটকের ঢল নেমেছে। এবারের পর্যটকদের আগমনে অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। 

আরও পড়ুন: টঙ্গীর ইজতেমা ময়দান নিয়ে সরকারের কাছে দুই দাবি ওলামা-মাশায়েখদের

পর্যটকদের এই বাড়তি উপস্থিতিতে দর্শনীয় স্থানগুলো যেমন মুখর হয়ে উঠেছে, তেমনি গতি ফিরেছে প্রবাসী অধ্যুষিত ও পর্যটননির্ভর সিলেটের হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়। এতে বাড়তি আয়ের প্রত্যাশা করছেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

প্রকৃতি কন্যার রুপে মুগ্ধ পর্যটক:

আরও পড়ুন: ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পাঁচ সিদ্ধান্ত

ভোলাগঞ্জের সাদাপাথরের স্বচ্ছ জল, লালাখালের নীল জলরাশি, পাহাড় নদী ঘেরা মায়াবী জাফলং, দেশের একমাত্র জলমগ্ন রাতারগুল, জল পাথরের শয্যাখ্যাত বিছানাকান্দি, পাহাড়ের বুকে হেলান দিয়ে বসা পান্থুমাই ঝর্ণা, উৎমা ছড়া ও চা- বাগানের সবুজ অরণ্যে মুগ্ধ হচ্ছেন সব বয়সী মানুষ।

পাশাপাশি লাউয়াছড়ার গহীন অরণ্য, মাধবপুরের লেক ও চায়ের রাজধানী খ্যাত শ্রীমঙ্গলের শত শত রিসোর্টগুলোতেও উপচেপড়া ভিড় লেগেছে। এতে পরিবহন ও স্থানীয় সেবামূলক ব্যবসাগুলোতে গতি ফিরেছে। সবমিলিয়ে দুর্গাপূজার ছুটি সিলেটের পর্যটনে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি করেছে।

হোটেলে রুম সংকট ও পরিবহন ভাড়ায় ভোগান্তি : 

পর্যটকের রেকর্ড সংখ্যক আগমনে দেখা দিয়েছে আবাসন সংকট। হোটেল-মোটেলে রুম না পেয়ে শত শত পর্যটক রাত্রিযাপন করেছেন হজরত শাহজালালের (রহ.) মাজার প্রাঙ্গণে। পর্যটকদের অভিযোগ, আবাসনের পাশাপাশি যাতায়াতেও গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া।

নারায়ণগঞ্জ থেকে পরিবার নিয়ে আসা পর্যটক আশরাফুল আলম বলেন, এবারের লম্বা ছুটি উপভোগ করতে সিলেটের চা-বাগান ও সাদাপাথর ঘুরে দেখেন পাশাপাশি মাজার জিয়ারত করেন। তবে এবার হোটেলের ভাড়া প্রায় দিগুণ গুনতে হয়েছে। আগ থেকে বুকিং করে আসলে হয়তো এমনটা হতো না।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির কয়েকজন শিক্ষার্থী এসেছেন দলবদ্ধ হয়ে, তাদের অভিযোগ সিলেটের স্থানীয় মানুষ যতেষ্ট হেল্পফুল হলেও মাজার কেন্দ্রিক বেশিরভাগ হোটেল এই সুযোগে ভাড়া দিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এর আগেও আমরা সিলেট ঘুরতে এসেছি হোটেলগুলোর ভাড়া স্বাভাবিক ছিলো। এছাড়া আম্বরখানা, জিন্দাবাজার ও বন্দরবাজার থেকে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াতে সিএনজি চালিত অটোরিকশা ও মাইক্রোবাসের চালকেরা স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ভাড়া চাইছেন।

হোটেলে কক্ষ না পেয়ে মাজার প্রাঙ্গণে আশ্রয় নেওয়া পর্যটক শেখ ফারুক হাসান বলেন, এমন আবাসন সংকটে পড়বেন তা কখনো ভাবেননি। কোথাও হোটেল না পেয়ে মাজার-ই রাত পার করতে হচ্ছে। পরদিন হোটেলে রুম না পেলে গাজীপুরে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন তিনি।

সিলেটের পথে পথে ভোগান্তি:

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ছয় লেনের কাজ চলমান থাকায় বিভিন্ন স্থানে লম্বা যানজট হচ্ছে। সড়কের বেহাল দশায় ছয় ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে এখন সময় লাগছে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা। সাদাপাথরের সড়ক ভালো হলেও জাফলং, বিছানাকান্দি, রাতারগুল ও লালাখালে যেতে  ভাঙাচোরা সড়কে দুর্ভোগ কমাতে চরম দুর্বোগ পোহাতে হচ্ছে। জাফলং যাওয়ার পথে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার সড়কের বেশির ভাগ স্থানেই রয়েছে বড় বড় খানাখন্দ। লালাখালের মূল পর্যটনকেন্দ্রে পৌঁছাতে সারিঘাটের পর পাড়ি দিতে হয় কাদামাটির সড়কে।

বিছানাকান্দির পথ আরও ভয়ংকর। প্রায় ২৫ কিলোমিটার সড়ক বেহাল অবস্থা। একই অবস্থা উৎমাছড়ার সড়কেও। সাদাপাথর থেকে দয়ারবাজার পর্যন্ত পথ ভালো হলেও এরপর প্রায় ১৫ কিলোমিটার সড়কে ভোগান্তি পোহাতে হয় পর্যটকদের।

শত কোটি টাকার ব্যবসার আশা:

সিলেটের পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনুকূল আবহাওয়া ও দেশের স্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, টানা দশ দিনের ছুটিতে অন্তত ১০ লাখ পর্যটক আসবেন। তাদের ঘিরে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ সংশ্লিষ্ট খাতে শত কোটি টাকার বাণিজ্য হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন তাঁরা।

সাদাপাথর হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শেখ রামিম আহমদ জানান, পুরো সপ্তাহ তাঁদের সব কটি কক্ষ বুকিং আছে। অনেক পর্যটক যোগাযোগ করেও রুম বুকিং পাচ্ছেন না। রেস্তোরাঁয়ও বেড়েছে বেচাকেনা। সব মিলিয়ে গত কয়েক বছরের সবগুলো ঈদ ও পূজার থেকে এবারে ভালো ব্যবসা হচ্ছে। 

সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রশাসক এজাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘এবার পূজায় ব্যবসা ভালো হয়েছে এবং নিরাপত্তাব্যবস্থাও ভালো ছিল। পর্যটকেরা সিলেটে এসে নির্বিঘ্নে ঘোরাফেরা করতে পেরেছেন। এ নিয়ে কোনো অভিযোগও পাওয়া যায়নি।’

নিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসনের ভুমিকা:

ট্যুরিস্ট পুলিশ সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহিনুর ইসলাম জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। পর্যটনকেন্দ্র গুলোতে নির্বিঘ্নে ভ্রমণের পরিবেশ বজায় রাখতে প্রতিটি স্পটে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। 

সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি যানজট কমাতে নেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। তবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পেলে এবং তার সত্যতা যাচাই-বাছাই করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।