তারুণ্যের ক্ষমতায়নেই বাংলাদেশের টেকসই ভবিষ্যৎ

Any Akter
এম এ মতিন
প্রকাশিত: ২:৩৯ অপরাহ্ন, ০৯ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ৪:৫৯ অপরাহ্ন, ০৯ মার্চ ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশ বর্তমানে তার জাতীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও শাসন সংকটের পর নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে দেশের সামনে যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তেমনি সৃষ্টি হয়েছে ভবিষ্যৎ উন্নয়নের নতুন চ্যালেঞ্জ। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ধারাবাহিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এবং শিক্ষার প্রসার,এসব অর্জন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।

তবে আগামী দশকের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচকের ওপর নির্ভর করবে না; বরং নির্ভর করবে দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনাকে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায় তার ওপর। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বয়স ৩০ বছরের নিচে। এই তরুণ জনগোষ্ঠী কেবল একটি জনমিতিক বাস্তবতা নয়; এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদ।

আরও পড়ুন: ১৭ বছর বয়সে বাধ্যতামূলক জাতীয় প্রশিক্ষণ: বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ করার নতুন প্রস্তাব

আজকের বিশ্ব দ্রুত জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। উদ্ভাবন, দক্ষতা, প্রযুক্তিগত অভিযোজন এবং সৃজনশীলতা,এই চারটি উপাদান এখন জাতীয় প্রতিযোগিতার মূল ভিত্তি। ফলে বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপ নির্ভর করবে এমন একটি প্রজন্ম তৈরির ওপর, যারা জ্ঞান, দক্ষতা এবং নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি ও সমাজকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম।

জনমিতিক সুযোগ ও ভবিষ্যতের ঝুঁকি:

আরও পড়ুন: মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বার কাউন্সিল রিভিউতে উত্তীর্ণ ১৯১৪ জন শিক্ষানবিশ আইনজীবীর পক্ষে খোলা চিঠি

বাংলাদেশ বর্তমানে যে “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড” বা জনমিতিক সুবিধা উপভোগ করছে, তা একদিকে বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে, অন্যদিকে সৃষ্টি করেছে একটি বড় দায়িত্ব। যদি এই তরুণ জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা, দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমে উৎপাদনশীল শক্তিতে রূপান্তর করা যায়, তবে তারা আগামী কয়েক দশক ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু বিপরীত চিত্রও কম উদ্বেগজনক নয়। যদি বিপুল সংখ্যক তরুণ বেকার, অদক্ষ কিংবা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাহলে এই জনমিতিক সুবিধাই একসময় অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই তরুণদের উন্নয়নকে কেবল একটি সামাজিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।

শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার: 

তরুণদের ক্ষমতায়নের প্রথম শর্ত হলো মানসম্মত ও যুগোপযোগী শিক্ষা। বাংলাদেশ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও শিক্ষার গুণগত মান ও প্রাসঙ্গিকতার ক্ষেত্রে এখনো বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।

বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা এখনও অনেকাংশে মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়নের ওপর নির্ভরশীল। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার মতো গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।

এই বাস্তবতায় শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিবেশ তৈরি, এবং শিল্পখাতের সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তোলা—এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়নও একটি বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

কর্মসংস্থান সংকট ও দক্ষতার বৈষম্য:

বাংলাদেশে তরুণদের বেকারত্ব এবং অপূর্ণ কর্মসংস্থান একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের একটি বড় অংশ তাদের যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ খুঁজে পায় না।

অন্যদিকে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান দক্ষ কর্মীর অভাবের অভিযোগ করে। এই দ্বৈত বাস্তবতা স্পষ্ট করে যে শিক্ষা ব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে গভীর অসামঞ্জস্য বিদ্যমান। এই ব্যবধান দূর করতে হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তরুণ উদ্যোক্তাদের উত্থান:

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণ উদ্যোক্তাদের একটি নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠছে। প্রযুক্তি, ই-কমার্স, কৃষি প্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং এবং সামাজিক উদ্যোগের ক্ষেত্রে তরুণরা নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে।

তবে উদ্যোক্তা পরিবেশ এখনও নানা সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ। সহজ ঋণপ্রাপ্তির অভাব, জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, পর্যাপ্ত মেন্টরশিপের অভাব এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা অনেক তরুণ উদ্যোক্তার অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে।

সরকার যদি স্টার্টআপ তহবিল সম্প্রসারণ, কর সুবিধা, উদ্ভাবন কেন্দ্র এবং ব্যবসা সহায়তা কাঠামো তৈরি করতে পারে, তাহলে তরুণ উদ্যোক্তারা দেশের অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।

গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ:

তরুণদের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি শক্তিশালী ও টেকসই রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে তরুণদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে।

স্থানীয় সরকার, সামাজিক উদ্যোগ, স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম এবং নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় তরুণদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে পারে। তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত সামাজিক উদ্যোগ ও কমিউনিটি প্রকল্প সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

তরুণরা যখন অনুভব করবে যে তাদের মতামত ও অংশগ্রহণ জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্ব পাচ্ছে, তখন তাদের মধ্যে দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আরও দৃঢ় হবে।

জলবায়ু সংকট ও তরুণদের ভূমিকা:

বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা এবং পরিবেশগত অবক্ষয় দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে তরুণদের পরিবেশ সংরক্ষণ, সবুজ প্রযুক্তি এবং জলবায়ু অভিযোজন উদ্যোগে সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব কৃষি এবং জলবায়ু সচেতনতা কর্মসূচিতে তরুণদের নেতৃত্ব দেশের পরিবেশগত স্থিতিশীলতা শক্তিশালী করতে পারে।

ডিজিটাল অর্থনীতি: 

ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার বাংলাদেশের তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং অনলাইন ব্যবসা ইতোমধ্যে নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

তবে ডিজিটাল সুযোগ এখনো সব অঞ্চলে সমানভাবে পৌঁছায়নি। গ্রামীণ এলাকায় উচ্চগতির ইন্টারনেট সম্প্রসারণ, সাশ্রয়ী প্রযুক্তি সরঞ্জাম এবং ডিজিটাল দক্ষতা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হলে দেশের তরুণরা বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে আরও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারবে।

জাতীয় উন্নয়ন:

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে দেশের তরুণ প্রজন্মের চিন্তা, শক্তি এবং নেতৃত্বের মাধ্যমে। আজকের তরুণরাই আগামী দিনের নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা, বিজ্ঞানী, শিক্ষক এবং সামাজিক নেতা হয়ে উঠবে।

তাই তরুণদের ক্ষমতায়নকে একটি বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং একটি সমন্বিত জাতীয় উন্নয়ন কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। শিক্ষা সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং পরিবেশ নেতৃত্ব,এই সব উপাদানকে একত্রিত করে একটি দীর্ঘমেয়াদি যুব উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন করা উচিত।

বাংলাদেশ অতীতে বহুবার প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে। এখন সময় এসেছে সেই অভিজ্ঞতা ও শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তরুণদের উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দেওয়ার।

কারণ সত্যটি স্পষ্ট , বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তার তরুণদের হাতেই। তাদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পারলেই দেশ একটি আরও উদ্ভাবনী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।