অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থার নতুন চিন্তা, কর আদায় থেকে সম্পদ সৃষ্টির পথে
নির্বাহী সারসংক্ষেপ
কোনো দেশের অর্থনীতি শুধুমাত্র কর আদায় বৃদ্ধি, কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ, কিংবা অতিরিক্ত কমপ্লায়েন্সের মাধ্যমে টেকসইভাবে বিকশিত হতে পারে না। একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে ওঠে তখনই, যখন উদ্যোক্তা, শিল্প, ব্যবসা, উৎপাদন ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা হয়।
আরও পড়ুন: শিক্ষার উন্নয়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা
বাস্তবতা হলো—সরকার নিজে আয় সৃষ্টি করে না; বরং ব্যবসা, শিল্প, উৎপাদন, রপ্তানি, সেবা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমেই জাতীয় আয় এবং করযোগ্য সম্পদ সৃষ্টি হয়।
কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামোতে প্রায়শই দেখা যায় যে—
আরও পড়ুন: শুধু মতামত নয়, প্রয়োজন জ্ঞান, নেতৃত্ব ও কর্ম
• কর কর্তৃপক্ষ,
• নিয়ন্ত্রক সংস্থা,
• ব্যাংক,
• নিরীক্ষক,
• পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান,
মূলত “কীভাবে বেশি আদায় করা যায়” সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিচালিত হয়; অথচ তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়—
• নতুন ব্যবসা সৃষ্টি,
• শিল্পায়ন,
• কর্মসংস্থান,
• বিনিয়োগ,
• ব্যবসা টিকিয়ে রাখা,
• উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি,
• উদ্যোক্তা উন্নয়ন,
• জাতীয় সম্পদ সৃষ্টি।
ফলে উদ্যোক্তারা নিজেদেরকে প্রায়শই এমন একটি চক্রের মধ্যে আবদ্ধ মনে করেন, যেখানে চারদিক থেকেই তাদের উপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।
এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য কর, অডিট বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বিরোধিতা করা নয়; বরং এগুলোকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা, যাতে সবার মূল লক্ষ্য হয়—
“জাতীয় সম্পদ সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।”
১. ভূমিকা
অর্থনীতি তখনই বৃদ্ধি পায়, যখন উৎপাদনশীল কার্যক্রম বৃদ্ধি পায়।
কোনো সরকার সরাসরি করযোগ্য আয় তৈরি করতে পারে না। কর আসে—
• ব্যবসা থেকে,
• শিল্প থেকে,
• উৎপাদন থেকে,
• কর্মসংস্থান থেকে,
• বিনিয়োগ থেকে,
• উদ্যোক্তার ঝুঁকি গ্রহণ থেকে।
অতএব, একটি আধুনিক অর্থনৈতিক নীতির মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—
“কীভাবে আরও বেশি ট্যাক্সদাতা তৈরি করা যায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে,”
শুধু
“বর্তমান করদাতার কাছ থেকে কীভাবে আরও বেশি কর আদায় করা যায়”
তা নয়।
যখন ব্যবসায়ীরা সম্মুখীন হন—
• উচ্চ সুদের হার,
• অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক জটিলতা,
• অস্থিতিশীল নীতি,
• হয়রানিমূলক কর ব্যবস্থা,
• জটিল কমপ্লায়েন্স,
• অনুমোদনে বিলম্ব,
তখন বিনিয়োগ ও উৎপাদন কমে যায়।
এর ফলাফল:
• কর্মসংস্থান কমে,
• খেলাপি ঋণ বাড়ে,
• বিনিয়োগ স্থবির হয়,
• ব্যাংকিং খাত দুর্বল হয়,
• এবং দীর্ঘমেয়াদে সরকারের রাজস্বও কমে যায়।
অতএব, অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থাকে “সংগ্রহমুখী” ধারা থেকে “প্রবৃদ্ধিমুখী” ধারায় রূপান্তর করতে হবে।
২. উদ্যোক্তাই অর্থনীতির মূল চালিকাশক্ত
উদ্যোক্তারাই অর্থনীতির চাকা ঘোরান।
তাঁরাই—
• ঝুঁকি নেন,
• বিনিয়োগ করেন,
• কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন,
• শিল্প গড়ে তোলেন,
• রপ্তানি বাড়ান,
• ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে সচল রাখেন,
• সরকারকে কর প্রদান করেন।
কিন্তু বাস্তবে উদ্যোক্তারা প্রায়শই অনুভব করেন যে তারা চারদিক থেকে ঘিরে আছেন—
• কর আদায়কারী সংস্থা,
• ব্যাংক,
• বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান,
• লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ,
• অডিট ও কমপ্লায়েন্স কাঠামো দ্বারা।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়—
• ব্যর্থ উদ্যোক্তাকে অপরাধীর মতো বিবেচনা করা হয়,
• উৎপাদনশীল খাতের তুলনায় অপ্রয়োজনীয় খাত বেশি সুবিধা পায়,
• প্রকৃত শিল্প উদ্যোক্তা পর্যাপ্ত সহায়তা পান না।
যে রাষ্ট্র উদ্যোক্তাকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে না, সেই রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে না।
৩. নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকার পুনর্মূল্যায়
নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
তাদের দায়িত্ব—
• আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা,
• সুশাসন বজায় রাখা,
• স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা,
• বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—
নিয়ন্ত্রণ কি ব্যবসাকে সহায়তা করছে, নাকি অনিচ্ছাকৃতভাবে ব্যবসার প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে?
বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা অতিরিক্তভাবে কেন্দ্রিত—
• শাস্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে,
• সীমাবদ্ধতায়,
• জরিমানায়,
• আনুষ্ঠানিক কমপ্লায়েন্সে।
অথচ তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়—
• ব্যবসা সহজীকরণে,
• শিল্পায়নে,
• বিনিয়োগে,
• কর্মসংস্থানে,
• উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে।
একটি আধুনিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা হওয়া উচিত—
• সহায়ক,
• ঝুঁকি ব্যবস্থাপক,
• অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকারী,
• প্রবৃদ্ধির অংশীদার।
৪. ব্যাংকিং খাত ও মূলধনের ব্যয়
ব্যাংক অর্থনীতির রক্তপ্রবাহের মতো।
কিন্তু যখন—
• ঋণের সুদের হার অত্যধিক বেশি হয়,
• জামানত নীতি অযৌক্তিক হয়,
• ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা অর্থায়ন পান না,
• পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনে সহনশীলতা থাকে না,
তখন উৎপাদনশীল খাত দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাস্তবতা হলো—
অনেক সময় ব্যাংক উচ্চ সুদে মুনাফা করে, উচ্চ বেতন দেয়, কর প্রদান করে;
কিন্তু ব্যবসার প্রকৃত ঝুঁকি বহন করেন উদ্যোক্তারাই।
অথচ দুর্বল ব্যবসা মানেই ভবিষ্যতে—
• খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি,
• বিনিয়োগ হ্রাস,
• ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি।
সুতরাং ব্যাংকিং খাতকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে-
• এসএমই,
• কৃষি,
• উৎপাদনশীল শিল্প,
• প্রযুক্তি,
• রপ্তানিমুখী খাত,
• তরুণ উদ্যোক্তা উন্নয়নে।
৫. হিসাবরক্ষক ও নিরীক্ষকদের ভূমিকা
পেশাদার হিসাবরক্ষক ও নিরীক্ষকদের ভূমিকা হওয়া উচিত—
• স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা,
• সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা,
• ঝুঁকি চিহ্নিত করা,
• বিনিয়োগকারীর আস্থা তৈরি করা।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—
হিসাবরক্ষণ ও নিরীক্ষা ব্যবস্থা কি যথেষ্টভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ব্যবসা উন্নয়নে অবদান রাখছে?
বর্তমানে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসাবরক্ষণ ও নিরীক্ষাকে দেখে—
• অতিরিক্ত কমপ্লায়েন্স,
• করকেন্দ্রিক চাপ,
• ব্যয়সাপেক্ষ আনুষ্ঠানিকতা,
• কাগুজে কার্যক্রম হিসেবে।
কখনও কখনও নিরীক্ষিত হিসাব পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত হয়, বড় আর্থিক ঝুঁকি আগেভাগে ধরা পড়ে না।
অতএব আধুনিক হিসাবরক্ষকদের শুধুমাত্র হিসাব প্রস্তুতকারী নয়, বরং হতে হবে—
• কৌশলগত আর্থিক উপদেষ্টা,
• ব্যবসা পরিকল্পনাবিদ,
• ঝুঁকি বিশ্লেষক,
• উৎপাদনশীলতা উন্নয়নকারী,
• টেকসই প্রবৃদ্ধির অংশীদার।
৬. অডিট: আনুষ্ঠানিকতা নাকি অর্থনৈতিক মূল্য সংযোজন?
অডিট শুধুমাত্র চেকলিস্ট পূরণের একটি প্রক্রিয়া হতে পারে না।
একটি কার্যকর অডিটের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত—
• প্রতিষ্ঠানের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি,
• ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করা,
• সুশাসন নিশ্চিত করা,
• দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা তৈরি করা।
যদি অডিট—
• কেবল কাগুজে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে,
• ব্যবসার জন্য বাস্তব মূল্য সংযোজন না করে,
• উদ্যোক্তার উপর অতিরিক্ত ব্যয় চাপায়,
তাহলে তার অর্থনৈতিক অবদান প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
৭. করনীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
একটি সুস্থ করব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত—
• বিনিয়োগ উৎসাহিত করা,
• ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়তা করা,
• নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা,
• করভিত্তি বিস্তৃত করা,
• দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব বৃদ্ধি করা।
মূলনীতি হওয়া উচিত—
“অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়লে করও স্বাভাবিকভাবে বাড়বে।”
অতিরিক্ত করচাপ ও জটিলতা:
• বিনিয়োগ কমায়,
• অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বাড়ায়,
• ব্যবসা নিরুৎসাহিত করে,
• প্রতিযোগিতা কমায়।
৮. সমন্বিত জাতীয় অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব
জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব তখনই, যখন—
• সরকার,
• নিয়ন্ত্রক সংস্থা,
• ব্যাংক,
• হিসাবরক্ষক,
• নিরীক্ষক,
• উদ্যোক্তা,
• বিনিয়োগকারী
একটি অভিন্ন জাতীয় লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে।
সেই লক্ষ্য হওয়া উচিত—
“টেকসই জাতীয় সম্পদ সৃষ্টি।”
৯. নীতিগত সুপারিশ
ক) নিয়ন্ত্রক সংস্কার
• নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সহায়ক দৃষ্টিভঙ্গি।
• অপ্রয়োজনীয় কমপ্লায়েন্স কমানো।
• ব্যবসা সহজীকরণ বৃদ্ধি।
খ) ব্যাংকিং সংস্কার
• উৎপাদনশীল খাতে কম সুদে অর্থায়ন।
• এসএমই ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা।
• দীর্ঘমেয়াদি শিল্প অর্থায়ন।
গ) হিসাবরক্ষণ পেশার আধুনিকায়ন
• কৌশলগত ব্যবসা উপদেষ্টা হিসেবে ভূমিকা বৃদ্ধি।
• উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা।
ঘ) নিরীক্ষা সংস্কার
• গুণগত মান বৃদ্ধি।
• ভবিষ্যতমুখী ঝুঁকি মূল্যায়ন।
• ব্যবসার স্থায়িত্ব মূল্যায়ন।
ঙ) ব্যবসাবান্ধব করনীতি
• পুনঃবিনিয়োগে কর সুবিধা।
• স্টার্টআপ প্রণোদনা।
• সহজ ও স্বচ্ছ করব্যবস্থা।
১০. উপসংহার
কোনো দেশ শুধুমাত্র কর আদায়ের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হতে পারে না।
প্রথমে সম্পদ সৃষ্টি করতে হয়, তারপর সেই সম্পদ থেকে কর আসে।
উদ্যোক্তা, ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান শুধু রাজস্বের উৎস নয়—
তাঁরাই জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি।
অতএব—
• নিয়ন্ত্রকদের হতে হবে সহায়ক,
• ব্যাংককে হতে হবে উন্নয়ন অংশীদার,
• হিসাবরক্ষকদের হতে হবে কৌশলগত উপদেষ্টা,
• নিরীক্ষকদের হতে হবে স্থায়িত্ব রক্ষাকারী,
• সরকারকে হতে হবে প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক।
জাতীয় সমৃদ্ধির মূল ভিত্তি হলো—
“আরও বেশি উৎপাদন, আরও বেশি কর্মসংস্থান, আরও বেশি উদ্যোক্তা, এবং আরও বেশি টেকসই জাতীয় সম্পদ সৃষ্টি।”
মোঃ ফজলুর রহমান, ব্যবসা ও আর্থিক বিশ্লেষক





