ইলিশের ঘরবাড়ি

Sanchoy Biswas
হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশিত: ১২:৫১ পূর্বাহ্ন, ১২ মে ২০২৬ | আপডেট: ৫:৩০ অপরাহ্ন, ১২ মে ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

ষাটের দশকের কথা। আমাদের শৈশব-কৈশোরকাল। বাংলার পাড়াগাঁয়ে বড় হয়েছি। বলতে পারি, গ্রামীণ জনপদের বিচিত্র সংস্কৃতির শাখা-প্রশাখায় বিচরণ করে একপর্যায়ে এসে শহুরে পরিবেশ পেয়েছি এবং নাগরিক জীবনের বাঁধাধরা ছকে আবদ্ধ হয়েছি। গ্রামের বিল-ঝিল, মাঠ-ঘাট, খালের জলে ডুব দিয়েছি। দেশি জাতের মাছ ধরার বিচিত্র আনন্দস্মৃতির কথা জীবনকালে কখনো বিস্মরণের অবকাশ নেই। একসময় গ্রামের খালেবিলে নানা জাতের মাছ পাওয়া যেত। ছোট-বড় বহু প্রজাতির মাছের সীমাহীন প্রাচুর্য ছিল, যা আজকের দিনে চিন্তা করাও অকল্পনীয়। সবই ছিল প্রাকৃতিক সুস্বাদু মিঠাপানির মাছ। তখন পর্যন্ত গ্রামবাংলার মানুষ মাছ চাষের কথা ভাবতেই শেখেনি। ভারতের এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যে ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’— এমন গৌরবের অভিধা কী সাধে মিলেছিল?

২. মনে পড়ে, এত সব মাছের ভিড়েও গ্রামের হাটবাজারে কদাচিৎ ইলিশের সাক্ষাৎ পাওয়া যেত। কালেভদ্রে কোনো একজন বিক্রেতা হয়তো দূরদূরান্তর থেকে দু-চারটি ইলিশ নিয়ে বাজারে এসেছে। অমনি স্থানীয় বিত্তবানদের কেউ কেউ তা কিনে নিয়েছে। বাকিরা শুধু দর্শন করেছে। কেনার সংগতি ছিল না বললেই চলে। তখনও ইলিশের দাম অন্য যেকোনো দেশি মাছের চেয়ে বেশি ছিল। কেননা ইলিশ গ্রামে কখনো সহজলভ্য ছিল না। তাই এরা সাধারণের নাগালের বাইরে ছিল। যে যা-ই বলুক, ইলিশ আসলে মাছের রাজাধিরাজ হিসেবেই এর সৌরবময় অতীত লালন এবং ধারণ করে এসেছে। এদের বংশানুক্রমিক আভিজাত্য, কৌলীন্য এবং অহংকারকে অবজ্ঞা করার সুযোগ কারও নেই। বাংলায় চিরকাল ইলিশের প্রতিদ্বন্দ্বী কেবল ইলিশই।

আরও পড়ুন: অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থার নতুন চিন্তা, কর আদায় থেকে সম্পদ সৃষ্টির পথে

৩. আমাদের কৈশোরে ইলিশের এক রূপান্তরিত বাজারজাত প্রক্রিয়া দেখেছি। তা হলো, লবণ-ছিটানো ও হালকা মশলা মাখানো ইলিশ। ইলিশ মাছকে চাক-চাক করে কেটে লবণ লাগিয়ে উন্মুক্ত অবস্থায় বাজারে বিক্রি করা হতো। এটাকে লোনা ইলিশ বলা হতো। বর্ষাকালে গ্রামের হাটবাজারে সহজেই তা পাওয়া যেত। বাবার পছন্দের অন্যতম খাবার ছিল সেই লোনা ইলিশ। এ যেন তাজা রুপালি ইলিশের পরিবর্তে পুরোনো বাসি-পচা ইলিশের মনোহরা ঘ্রাণ নিয়ে মধ্যবিত্তের নাসিকাকে তৃপ্ত করা। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো।

৪. ইলিশ বরাবরই অসূর্যস্পর্শা এক অভিমানী মৎস্যপ্রজাতি। এরা স্বচ্ছ জলের বাসিন্দা। সমুদ্র বা বড় নদীর গভীর জলে বসবাসকারী এই মাছ নিজেদের স্বজন ছাড়া অন্য কারও মুখদর্শন করতে চায় না। এরা সংঘবদ্ধ এবং গোষ্ঠীবদ্ধ। এদের কাছে অন্য জলজ প্রাণিকুল সবই যেন অচ্যুত অস্পৃশ্য। এরা জলের ওপরে এক মিনিটের বেশি সময় বেঁচে থাকার পক্ষে নয়। এরা নিজের এমন পরাভূত অসহায় জীবনকে দেখাতে রাজি নয়। এমনকি এই সুন্দর পৃথিবীর আলো-বাতাসও এরা নিতে চায় না। এমনকি মানুষ নামের শ্রেষ্ঠ জীবকেও এরা একনজর দেখে যেতে লজ্জাবোধ করে থাকে।

আরও পড়ুন: শিক্ষার উন্নয়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা

৫. ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর। এটা জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের স্লোগান। সেখানে একবার সরকারি চাকরিতে ছিলাম। পদ্মা-মেঘনা-ডাকাতিয়ার মোহনায় কিছুদিন বসবাস করে ইলিশদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। যদিও সেখানে ইলিশ ফেলনা কোনো জিনিস নয়, বরং পরম আরাধ্য বস্তুর ন্যায়। মনের মতো ইলিশের চেহারা দেখতে চাইলে সেই চাঁদপুরেও অনেক কষ্টসাধ্য কাজ।

আজকাল ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের কবলে গোটা দেশ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে পছন্দের আম কেনার চেয়ে রাজধানীতে যেমন সহজ এবং সুলভ, ইলিশের ক্ষেত্রে চাঁদপুরও তা-ই।

জ্যান্ত ইলিশ মাছ ধরা সম্পর্কে একটা ঘটনার কথা বলি। দেশে তখন ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতাসীন হয়ে আছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর সরকারের নজরদারি জোরদার হয়েছে। ছায়া সামরিক শাসনের মতো একপ্রকার আবহ বিরাজমান। একদিন দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একজন অতিরিক্ত সচিব চাঁদপুর জেলা সফরে এসেছেন। তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর জেলা প্রশাসনের সঙ্গে এক নির্ধারিত মতবিনিময় সভায় যোগ দেন। দিনের কর্মসূচিতে ছিল মধ্যাহ্নভোজের পরে তিনি পদ্মা-মেঘনার সংযোগস্থলের ভাটিতে গিয়ে জেলেদের ইলিশ মাছ ধরা সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন। এটা দাপ্তরিক নয়, তাঁর একান্তই ব্যক্তিগত মনোবাঞ্ছা। আমার ওপর তাঁর প্রটোকল এবং গাইড হওয়ার দায়িত্ব পড়ে। সার্কিট হাউস হতে সড়কপথে নদীর ঘাট পর্যন্ত গিয়ে স্পিডবোটে চেপে বসি। চালকসহ তিনজন স্রোতের বিপরীতে খানিকটা ঝুঁকি নিয়ে মাঝনদীতে গিয়ে হাজির হই। কিন্তু বিরূপ আবহাওয়া বা জোয়ার-ভাটার কোনো অলৌকিক কারণে সেদিন জেলেদের জালে ইলিশ ধরা একেবারেই পড়ছিল না। আমরা জেলের নৌকার কাছাকাছি বোটখানা থামিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। অতিরিক্ত সচিবও আজ জ্যান্ত ইলিশের চেহারা না দেখে নদী ত্যাগ করবেন না। আমি রীতিমতো টেনশনে পড়ে গেলাম। এমন ভিআইপি অতিথিকে ইলিশ না দেখাতে পারলে কিসের এডিসি?

খানিক পরে হঠাৎ একজন প্রবীণ জেলের জালে দুটো মাঝারি সাইজের রুপার মতো ঝকঝকে ইলিশের নৃত্য দেখে আমার মনের গহীনে আচমকা আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। অতিথির মুখেও তাৎক্ষণিক হাসির রেখা ফুটে উঠল। তিনি জীবনে প্রথমবার একটি জীবিত ইলিশকে স্পর্শ করে দারুণ উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন। সেই মুহূর্তে ইলিশটি তাঁর মুখদর্শন করেছিল কি না জানি না, তবে তাঁর করতলেই এর জীবনাবসান হতে দেখেছিলাম। সেদিন খুশিতে তিনি বৃদ্ধ জেলের ভেজা হাতে একশো টাকার একটি নোট গুঁজে দিয়ে পরম আত্মতৃপ্তি লাভ করেছিলেন। বলাবাহুল্য, সেই অতিরিক্ত সচিব জন্মসূত্রে চাঁদপুরের সন্তান ছিলেন। নিজে কখনো জীবন্ত ইলিশের গায়ে হাত বুলানোর সুযোগ পাননি— এমনটা তিনি হয়তো মেনে নিতে পারছিলেন না। তাই তাঁর আনন্দের সীমা ছিল না। সেদিনই যেন তাঁর জীবন সার্থক হয়েছে।

৬. এ দেশের ইলিশ কেবল বৈশাখ মাসের প্রথম দিনের পান্তা-ইলিশ নামেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। বৈশাখ আর ইলিশ যেন একে অপরের পরিপূরক হয়ে বেঁচে আছে। তবে পদ্মার ইলিশের বিচরণ এখন সারা পৃথিবীতে। সে কেবল আমাদের পার্শ্ববর্তী পশ্চিমবঙ্গ সফর করে, তা-ও সত্য নয়। এত সংক্ষিপ্ত সফর এদের কাছে মোটেও পছন্দের নয়। এরা মূলত দূরদেশী, দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসে। যদিও প্রতিবেশী দেশের কাছে এদের বাধ্য হয়ে যেতে হয়। বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর নানা দেশে এদের অবাধ প্রবেশাধিকার আছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা— এদের কাছে কোনো বিষয় নয়। বলা যায়, ইলিশরা ভিসামুক্ত দুনিয়ার অধিবাসী। ভিসার জন্য এদের কোনো দালাল-ফড়িয়ার দ্বারস্থ হতে হয় না। অ্যাম্বাসির আরোপিত কোনো শর্তের ধার এরা ধারে না। আমাদের স্বদেশীয় লুটেরা, রপ্তানির দালালেরাই এদের বিশ্বব্যাপী সফরকে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করে দেয়। তখন এরা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত সজ্জিত কফিনের ভেতরে শুয়ে আরাম-আয়েশে রাজকীয় বেশে সাতসমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দেয় এবং আকাশপথের দীর্ঘ সফর শেষে পরভূমে গিয়ে উপস্থিত হয়। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোথাও এদের মানমর্যাদা ও সম্মান একবিন্দু কম নয়। বরং এতদিন পাশের দেশের গরিব বাঙালিদের নিকট থেকে এরা অপেক্ষাকৃত কম মর্যাদা পেয়ে এসেছে। আশা করা যায়, আগামী দিনগুলোতে ইলিশরাজ এদের হৃতগৌরব ফিরে পাবে। এ বিষয়ে পদ্মা-মেঘনার ইলিশরা মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছে। জানা যায়, ইতোমধ্যে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে এরা স্মরণকালের বৃহৎ সলিল মিছিলে হর্ষধ্বনি দিয়েছে।

আরেকটা ছোট্ট অভিজ্ঞতা।

২০০০ সালে, অর্থাৎ মিলেনিয়াম বছরে, জীবনে প্রথম মার্কিন মুলুকে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) সহকর্মীদের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হয়ে সেখানকার বিভিন্ন স্টেটে ঘোরাঘুরি করার এক সুবর্ণ সুযোগ হয়েছিল। সেখানেই দলের সদস্যদের কারও না কারও স্বজনের বাসায় আমন্ত্রিত হয়েছি, বিশেষ করে নিউইয়র্ক ও নিউজার্সিতে। দুটো বাসায় বেড়াতে গিয়ে অনেক কিছুর সঙ্গে ইলিশ দ্বারা আমরা সবাই আপ্যায়িত হয়েছিলাম। আপ্যায়নকারী হোস্ট বলেছিলেন, ‘পদ্মার দুই কেজি ওজনের ইলিশ দেশে না পেলেও নিউইয়র্কে পাবেন।’ সত্যি কথা বলতে, এমন বৃহদাকার ডিম্বজ ইলিশের টুকরো পরবর্তীতে না চাঁদপুরে, না ঢাকায়— কোথাও আর নজরে পড়েনি। এতে বোঝা যায়, ইলিশের প্রবীণ ও নেতৃস্থানীয় স্বগোত্রীয়রা এদের রাজসিক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার নিমিত্ত পাশের দেশ ভারত নয়, বরং পশ্চিমা দুনিয়াকেই অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে।

৭. ইলিশের আদি-ঠিকানা যদি বঙ্গোপসাগর বা পদ্মা-মেঘনার মতো বড় নদী হয়, স্বাভাবিকভাবেই এদের ওপর বাংলাদেশি মানুষের অধিকার সর্বাধিক। তাছাড়া এদের প্রজনন সময়ে কয়েক মাস ধরে এখানকার নদীবিধৌত গরিব মানুষগুলোই অপেক্ষার প্রহর গুণে থাকে। এটা ইলিশকুলও জানে। কিন্তু নানাবিধ সামাজিক, ভূরাজনৈতিক ও বৈশ্বিক কারণে কখনো কখনো আমাদের রুপালি চাঁদবর্ণ সুন্দরী ইলিশদের ব্যবহার করতে হয়েছে। ইতঃপূর্বে এদের দিয়ে রাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় কূটনৈতিক সাফল্যও লাভ করতে হয়েছে। এ দিক থেকে ইলিশ কেবল আমাদের জাতীয় মাছ নয়, বাংলাদেশ নামক জাতিরাষ্ট্রের উন্নয়ন এবং ঐক্যের প্রতীকও বটে। তবে অন্যরা যেভাবেই যতই ভোগ করুক না কেন, দিনের শেষে ইলিশ আর বাংলাদেশ সমার্থক। কাজেই বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশির নীলাভ রেখায় ঝাঁক বেঁধে ক্ষিপ্রগতিতে ধাবমান ইলিশগুলো অনন্তকাল ধরে কেবল আমাদেরই সম্পদ হয়ে থাক।

লেখক : গল্পকার ও কলামিস্ট