শহীদ জিয়া: একটি জাতির আলোকবর্তিকা
১. পটভূমি ও রণাঙ্গনের ডাক
সেদিন আকাশ মেঘে ঢাকা ছিল, ছিল এক চরম তিমির,
আরও পড়ুন: ঈদের বিশেষ আপ্যায়নে অনন্য নজির কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে
ত্রাসে কাঁপছিল বাংলা, স্তম্ভিত ছিল পদ্মা-যমুনার তীর।
পরাধীনতার শিকল যখন চেপে বসেছিল বুকের ওপর,
আরও পড়ুন: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কেন, মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা সিটির দুই প্রশাসকের কাজ কি?
কে দেবে ডাক, কে ভাঙবে এই ঘোর অমাবস্যার প্রহর?
ঠিক তখনই কালুরঘাট থেকে ভেসে এলো সেই কণ্ঠস্বর,
বজ্রনির্ঘোষে গর্জে উঠলেন এক তরুণ মেজর।
"আমি মেজর জিয়া বলছি"— সেই একটি মাত্র বাণী,
বাঙালির বুকে জ্বেলে দিল রূদ্ধ আক্রোশের অগ্নিদাহন খানি।
তিনি ডাক দিলেন স্বাধীনতার, তিনি ডাক দিলেন জয়ের,
নিমেষেই কেটে গেল মেঘ, অবসান হলো সব ভয়ের।
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া মেতে উঠল মুক্তির উল্লাসে,
কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র সবাই ছুটল মরণ-পণ আবাসে।
রণাঙ্গনে দাঁড়িয়ে জিয়া, হাতে তাঁর উদ্যত হাতিয়ার,
শত্রুর বুকে কাঁপন ধরায় তাঁর রণকৌশল, তাঁর হুঙ্কার।
প্রথম ইস্ট বেঙ্গল নিয়ে যিনি লড়লেন সম্মুখ রণে,
স্বাধীনতার সূর্য আনবেন— এই পণ ছিল যাঁর মনে।
২. যুদ্ধজয়ের গৌরব ও বীর উত্তম
রক্তনদী পেরিয়ে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত লাল-সবুজ নিশান,
স্বাধীন হলো বাংলাদেশ, মুক্ত আকাশে গাইল পাখিরা গান।
রণাঙ্গনের সেই বীর সেনানী, বীরত্বের মুকুট মাথায় যাঁর,
জাতি তাঁকে দিল 'বীর উত্তম' উপাধি, অনন্য সম্মান তাঁর।
কিন্তু যুদ্ধ শেষের সেই বাংলাদেশে ছিল কান্নার রোল,
ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর হাহাকারে দুলছিল চারদিক দোল।
লুটপাট আর বিশৃঙ্খলায় ম্লান হতে চলল বিজয়ের আলো,
দেশবাসী ভাবছিল, তবে কি কাটবে না এই কালো?
সিপাহী-জনতার বিপ্লবে আবার ভাঙল ভোরের ঘুম,
৭ই নভেম্বরের সকালে চারদিকে ছড়াল আনন্দের ধুম।
জনতার কাঁধে চড়ে এলেন তিনি, যিনি ক্রান্তিকালের ত্রাণ,
জিয়াউর রহমান— যাঁর নামে স্পন্দিত হলো কোটি প্রাণ।
উত্তাল সেই দিনে তিনি নিলেন দেশের হাল,
নতুন করে বুনে দিলেন সমৃদ্ধির এক ভবিষ্যৎ জাল।
৩. দেশ গড়ার কারিগর
তিনি এলেন না কোনো শাসকের দম্ভ নিয়ে বুকে,
তিনি এলেন সেবক হয়ে, হাসি ফোটাতে চাইলেন দুখে।
শান্তি ও শৃঙ্খলার চাদরে ঢাকলেন এই বিক্ষুব্ধ দেশ,
দূর করলেন হানাহানি, অরাজকতার যত অবশেষ।
তিনি ডাক দিলেন সবুজ বিপ্লবের, কোদাল নিলেন হাতে,
খাল খননের মহোৎসবে নামলেন স্বয়ং জনতার সাথে।
কৃষকের মুখে ফুটল হাসি, মাঠ ভরে উঠল সোনালী ধানে,
বাংলাদেশ আত্মনির্ভরশীল হলো জিয়ার সততার টানে।
শিল্পের চাকা ঘুরল আবার, খুলল কলকারখানার দ্বার,
যুবসমাজ পেল কর্মের দিশা, ঘুচল হতাশার অন্ধকার।
গ্রাম-গঞ্জে জ্বলল আলো, শিক্ষার আলো ছড়াল ঘরে ঘরে,
গণশিক্ষার আলো জ্বেলে জিয়া অমর হলেন মানুষের অন্তরে।
তিনি চাইলেন স্বনির্ভরতা, ভিক্ষুকের জাতি হতে নয়,
শ্রম আর ঘামে গড়তে চাইলেন এক অপরাজেয় বিজয়।
৪. বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও বিশ্বমঞ্চ
যাঁর দর্শনে বাঙালি পেল নিজের আসল পরিচয়,
'বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ'— যা ভৌগোলিক সীমানা করে জয়।
ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে আমরা সবাই এক পরিবার,
এই মন্ত্রে মেলালেন তিনি বিভেদের যত দ্বার।
তিনি শেখালেন মাথা উঁচু করে বাঁচবার পরম শিক্ষা,
কারো কাছে নত না হওয়ার সেই অমোঘ দীক্ষা।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করলেন তিনি,
সার্ক-এর স্বপ্নদ্রষ্টা জিয়া, বিশ্বনেতারা যাঁর প্রজ্ঞা চিনি।
মুসলিম উম্মাহর ঐক্যে যিনি রাখলেন অনন্য অবদান,
মধ্যপ্রাচ্যে বাঙালি শ্রমিকের খুলে দিলেন সম্মানের স্থান।
ছোট্ট এই দেশটিকে তিনি করলেন বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু,
সীমাহীন ছিল যাঁর সাহস, যাঁর হৃদয়ের গভীরতা যেন সিন্ধু।
৫. সততার মূর্ত প্রতীক
ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও যিনি ছিলেন অতি সাধারণ,
বিলাসিতা ছোঁয়নি যাঁর জীবন, যিনি ত্যাগেরই উদাহরণ।
ভাঙা সুটকেস আর ছেঁড়া গেঞ্জি— যাঁর রেখে যাওয়া ধন,
এমন সততা আর কোথায় পাবে এই অবুজ জনগণ?
জনতার রাষ্ট্রপতি তিনি, মিশে যেতেন জনতার ভিড়ে,
কখনো হেঁটেছেন মেঠোপথে, কখনো গিয়েছেন কুঁড়েঘরে।
দুর্নীতির কালো ছায়া গ্রাস করতে পারেনি যাঁর কায়া,
গরীবের তরে ছিল যাঁর বুকভরা অকৃত্রিম মায়া।
৬. সেই কালরাত ও মহাপ্রয়াণ
১৯৮১ সালের মে মাসের সেই অভিশপ্ত ৩০ তারিখ,
চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে নেমে এলো অন্ধকারের মরীচিকা।
কিছু বিভ্রান্ত বুলেটের আঘাতে নিভে গেল এক বিশাল আলো,
হায়াত কেড়ে নিল তাঁর, যাকে ভালোবেসেছিল এ দেশের ভালো।
রক্তে রঞ্জিত হলো জিয়ার সেই প্রিয় চাদর ও শার্ট,
কেঁদে উঠল বাংলার আকাশ, স্তব্ধ হলো কোলাহলের হাট।
কিন্তু বুলেট কি পারে মারতে সেই অমর আত্মাকে?
যিনি বেঁচে আছেন এ দেশের প্রতি ধূলিকণায়, প্রতি বাঁকে।
শহীদ জিয়া মরেও অমর, তিনি তো মরেননি সত্যি,
কোটি মানুষের হৃদয়ে তিনি এক চিরন্তন জ্যোতি।
ঢাকা চন্দ্রিমা উদ্যানে আজ যেখানে তাঁর শয়ান,
সেখানে প্রতিদিন লক্ষ মানুষ জানায় শ্রদ্ধার বয়ান।
৭. উপসংহার ও চিরন্তন প্রেরণা
জিয়া মানেই স্বাধীনতা, জিয়া মানেই স্বনির্ভর দেশ,
জিয়া মানেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক আপসহীন রেশ।
যতদিন থাকবে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা আর বহমান তিস্তা,
ততদিন বাঙালির হৃদয়ে থাকবে শহীদ জিয়ার এই রাস্তা।
তুমি রয়েছ পতাকায়, তুমি রয়েছ ধানের শীষে,
তোমার আদর্শ মিশে আছে বাঙালির নিঃশ্বাসে-বিশ্বাসে।
হে অমর সেনানায়ক, হে ত্রাতা, তোমায় জানাই সেলাম,
তোমার চরণে আজ এই কাব্যের অর্ঘ্য সঁপে দিলাম।
লেখক: মমিনুল ইসলাম, সাংবাদিক কলামিস্ট।





