এনআরবিসি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে ফ্যাসিস্ট দুর্নীতিবাজ চক্র মরিয়া
- অস্থিরতা তৈরীর অভিযোগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বর্তমান বোর্ডের চিঠি
- ফরেনসিক অডিটে এসেছে পলাতক চক্র ও কিছু কর্মকর্তার নাম
দেশের বেসরকারি খাতের একসময়ের লাভজনক ও আমানতের নিরাপত্তার আস্তা এনআরবিসি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলছে অস্থিরতা। বিগত স্বৈরাচারী দীর্ঘ সময়ে ব্যাংকটি লুটেপুটে খেয়েছে সাবেক চেয়ারম্যান তমাল চক্র। স্বৈরাচারী সরকারকে রক্ষা সহ মডেল অন দা নিয়ে বিদেশে পাচার করেছে ব্যাংকটি থেকে অবৈধ উপায়ে বের করা শত শত কোটি টাকা। পাঁচ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী চেয়ারম্যান তমাল পারভেজ সহ দুর্নীতিবাজ চক্র আত্মগোপনে চলে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক দ্রুত চালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে ব্যাংককে দেউলিয়া থেকে রক্ষা করে। এখন আবার ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি করেছে এনআরবিসি ব্যাংককে ঘিরে উদ্ভূত অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। ব্যাংকটির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ অভিযোগ করেছে- দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে বিতর্কিত কিছু প্রাক্তন পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আবারও ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ দখলের ষড়যন্ত্রে সক্রিয় হয়েছেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে ৬ মার্চ ২০২৬ তারিখে একটি বিস্তারিত চিঠি দিয়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছে ব্যাংকের বর্তমান বোর্ড। চিঠিতে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক মানের ফরেনসিক অডিটে উঠে আসা তথ্য-প্রমাণের পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকের ওপর পুনরায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ ব্যাংকে বড় রদবদল, চার পরিচালক ও এক অতিরিক্ত পরিচালক বদলি
২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর এনআরবিসি ব্যাংক শুরুতে পেশাদার ব্যবস্থাপনা ও দক্ষ পরিচালনা পর্ষদের কারণে দ্রুত সুনাম অর্জন করে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদের ভেতরে প্রভাবশালী কয়েকজন পরিচালক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলে ব্যাংকের প্রশাসনিক কাঠামো ও করপোরেট গভর্ন্যান্স প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে- এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই ঘুরপাক খাচ্ছিল।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের ১২ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির বোর্ড পুনর্গঠন করে। নতুন বোর্ডে বিশিষ্ট ব্যাংকার মো. আলী হোসেন প্রধানিয়াকে স্বাধীন পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ছয়জন স্বাধীন পরিচালক যুক্ত করা হয়, যাদের অধিকাংশই ব্যাংকিং ও করপোরেট গভর্ন্যান্সে অভিজ্ঞ।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, প্রজ্ঞাপন জারি
একই সময় প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ড. মো. তৌহিদুল আলম খান (এফসিএমএ) ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেন।
বর্তমান বোর্ড দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকের পূর্ববর্তী কার্যক্রম পর্যালোচনার জন্য আন্তর্জাতিক অডিট প্রতিষ্ঠান কেপিএমজি-কে ফরেনসিক অডিটের দায়িত্ব দেয়। সেই অডিট রিপোর্টে প্রাক্তন কয়েকজন পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং করপোরেট শাসন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠে আসে বলে বোর্ডের দাবি।
ফরেনসিক অডিটে যেসব প্রাক্তন পরিচালকের নাম উঠে এসেছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন- তামাল পারভেজ, আদনান ইমাম, সাইদুর রহমান, শেলিনা পারভিন, তৌফিকুর রহমান, মোস্তাফিজুর রহমান, মিঠু এবং লকিতউল্লাহ।
অন্যদিকে ব্যাংকের সাবেক কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন- হারুনুর রশিদ (ডিএমডি), ইমরোজ মাহমুদ (এসইভিপি), কবির আহমেদ (ডিএমডি), জাফর আলী হাওলাদার (এসভিপি), মোখলেসুর রহমান (ভিপি), শফায়েত কবির কানন (এসইভিপি), তনুশ্রী মিত্র (এসইভিপি), সৈয়দ কবির আহমেদ (এসইভিপি), ফারহাদ সরকার (ভিপি) এবং পারভেজ আহমেদ (ভিপি)।
বর্তমান বোর্ডের অভিযোগ, এসব ব্যক্তির একটি অংশ ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে প্রভাব বিস্তার করে আবারও প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণে ফিরতে নানা ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছেন।
চিঠিতে বিশেষভাবে সাবেক কোম্পানি সেক্রেটারি আহসান হাবিবের নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তিনি এই তৎপরতার অন্যতম সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে পূর্বে তাকে পদ থেকে অপসারণ করা হলেও তিনি এখনও বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ রেখে বর্তমান বোর্ডের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বোর্ডের দাবি, প্রাক্তন কর্মকর্তাদের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল এবং ব্যাংকের কিছু অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ চ্যানেল ব্যবহার করে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অস্থিরতা তৈরি করা এবং শেষ পর্যন্ত পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পরিবেশ তৈরি করা।
পরিস্থিতিকে ব্যাংকের স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে বর্তমান বোর্ড বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপ চেয়েছে।
চিঠিতে কয়েকটি নির্দিষ্ট পদক্ষেপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে- প্রাক্তন অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পরিচালক বা নির্বাহী পদে পুনর্নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা, প্রয়োজনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ, ব্যাংকের অবৈধভাবে দখলকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার, অভ্যন্তরীণ শাসন ও কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কালো তালিকাভুক্ত করার মতো ব্যবস্থা গ্রহণ।
এছাড়া জনআস্থা বজায় রাখতে প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক নোটিশ প্রকাশের সুপারিশও করা হয়েছে।
বর্তমান বোর্ডের মতে, ব্যাংকটির পরিচালনা ও সংস্কার কার্যক্রম সফলভাবে এগিয়ে নিতে অন্তত তিন বছর একই বোর্ড অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। এতে করে ব্যাংকের করপোরেট গভর্ন্যান্স পুনর্গঠন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।
ব্যাংকটির সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট যখন নানা কারণে আলোচিত, তখন কোনো ব্যাংকের পরিচালনা নিয়ে এমন দ্বন্দ্ব আর্থিক খাতের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা হয়ে উঠতে পারে।
তাদের মতে, অভিযোগের বিষয়গুলো দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে শুধু একটি ব্যাংক নয়, সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ও জনআস্থা রক্ষাতেও তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।





