গণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি: মাসুমের সংগ্রাম জয়ের গল্প

Sanchoy Biswas
মবিনুল ইসলাম রাশা, গণ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ৭:৩৩ অপরাহ্ন, ২৬ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১২:১২ পূর্বাহ্ন, ২৭ জুন ২০২৬
ছবিঃ সংগৃহীত
ছবিঃ সংগৃহীত

কিছু গল্প থাকে, যেগুলো কেবল সাফল্যের গল্প নয়; বরং প্রতিবার ভেঙে পড়া থেকে আবার উঠে দাঁড়ানোর গল্প। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু জায়েদ মাসুমের জীবন ঠিক তেমনই এক গল্প। স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।

অষ্টম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণিতে ওঠার সময় থেকেই মাসুমকে নিরুৎসাহিত করা শুরু হয়। আশপাশের অনেকেই বলেছিলেন, বিজ্ঞান নাকি তার জন্য নয়। ‘বিজ্ঞান খুব কঠিন’—এই যুক্তিতে তাকে কমার্স বা মানবিক বিভাগে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। যা তার ভেতরে জন্ম দেয় এক অদ্ভুত জেদ। তিনি ঠিক করেন, কঠিন বলেই তিনি এই পথেই হাঁটবেন।

আরও পড়ুন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

স্কুলজীবনে গণিত ছিল তার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। সংখ্যার সঙ্গে তার স্বাচ্ছন্দ্য ছিল স্পষ্ট। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি বিষয় তাকে আকৃষ্ট করতে শুরু করে, তা হলো রসায়ন। ল্যাবে শিক্ষক যখন প্যারাসিটামল তৈরি করে দেখান, তখন প্রথমবারের মতো তিনি উপলব্ধি করেন, রসায়ন শুধু বইয়ের বিষয় নয়; এটি এক জীবন্ত, বিস্ময়কর জগৎ। এই অভিজ্ঞতাই যেন মাসুমের আগ্রহকে দৃঢ় করে তোলে।

তীব্র আগ্রহ থেকেই তিনি ভর্তি হন গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে। যদিও শুরুতে তার লক্ষ্য ছিল ফলিত গণিত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি বেছে নেন রসায়ন। রসায়ন বিষয়টি তখন তার কাছে কৌতূহলের, বিস্ময়ের এবং সম্ভাবনার নাম।

আরও পড়ুন: লক্ষ্মীপুরে মা ও বোনের সঙ্গে খুন হলেন ঢাবি শিক্ষার্থী সায়মা

গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন মাসুম। তখন অনেকেই এই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতেন। অনেকেই বলতেন, ‘এখানে পড়ে কিছু হবে না।’ কিন্তু এসব কথায় ভেঙে পড়েননি তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনও তার জন্য ছিল সংগ্রামের। টিউশন করে নিজের সেমিস্টার ফি চালানোর পাশাপাশি পরিবারকেও সহায়তা করতে হতো। ফলে নিয়মিত ক্লাস করা সম্ভব হতো না। অনুপস্থিতির জন্য জরিমানা, পরীক্ষায় বসার অনুমতির জন্য অনুরোধ—এসবই হয়ে ওঠে মাসুমের প্রতিদিনের বাস্তবতা। মিডটার্ম বা টিউটোরিয়াল পরীক্ষাগুলো প্রায়ই দেওয়া সম্ভব হতো না। ফলে তার মূল্যায়ন সীমিত নম্বরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। যেখানে অন্য শিক্ষার্থীরা পূর্ণ নম্বরের পরীক্ষায় নিজেদের প্রমাণ করছিলেন।

তবে এসব বাধা তার অগ্রযাত্রা থামাতে পারেনি। প্রথম দিকের সেমিস্টারগুলোতে ভালো ফল করতে না পারলেও পঞ্চম সেমিস্টার থেকে তিনি নিজেকে নতুনভাবে গুছিয়ে নিতে শুরু করেন। ফাইনাল ইয়ারে এসে তার জীবনে আসে একটি বড় সুযোগ।

এক শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে তিনি যুক্ত হন এক গবেষণা প্রকল্পে। প্রথমবারের মতো একটি গবেষণাগারে কাজ করার সুযোগ পেয়ে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ল্যাবে সময় কাটাতে থাকেন। একের পর এক পরীক্ষা, ব্যর্থতা এবং নতুন চেষ্টার মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয় মাসুমের গবেষণা, যা প্রকাশিত হয় আন্তর্জাতিক জার্নালে।

এই অভিজ্ঞতাই তাকে বুঝতে শেখায়, রসায়নের প্রকৃত সৌন্দর্য গবেষণায়। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, একদিন তিনি রসায়নে পিএইচডি করবেন।

৩.২৪ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক শেষে তিনি মাস্টার্সে ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে গিয়ে যেন তিনি পড়াশোনার প্রতি আরও মনোযোগী হয়ে ওঠেন। শিক্ষকদের কাছ থেকে বিষয়টির গভীরতা শিখে তিনি নতুনভাবে অনুপ্রাণিত হন। মাস্টার্সে তিনি অর্জন করেন ৩.৭৩ সিজিপিএ।

২০২১ সালে একটি সংবাদপত্রে একটি খবর পড়ে তার জীবনের লক্ষ্য আরও স্পষ্ট হয়। বাংলাদেশ থেকেই একজন শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রে ফুল-ফান্ডেড পিএইচডি করতে গেছেন। তখনই মাসুম উপলব্ধি করেন, এই স্বপ্ন তার পক্ষেও সম্ভব।

পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) এম.ফিল. প্রোগ্রামে ভর্তি হন। সেখানে গবেষণার বাস্তব অভিজ্ঞতা, সহপাঠীদের অগ্রগতি এবং একাডেমিক পরিবেশ তাকে আরও অনুপ্রাণিত করে। এম.ফিল.-এ তিনি ৩.৬৭ সিজিপিএ অর্জন করেন।

এরপর শুরু হয় তার সবচেয়ে কঠিন প্রস্তুতির সময়। যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডির জন্য আবেদন প্রক্রিয়ায় তিনি মাসের পর মাস সময় দেন। নিজের জীবনের গল্প, গবেষণার অভিজ্ঞতা ও লক্ষ্য তুলে ধরতে তিনি এসওপি (SOP) লেখেন দীর্ঘ সময় নিয়ে। সংগ্রহ করেন শক্তিশালী সুপারিশপত্র।

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের ই-মেইল করতে থাকেন তিনি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো উত্তর পাননি। তবুও তিনি থামেননি। প্রতিটি ইন্টারভিউয়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছেন, প্রেজেন্টেশন তৈরি করেছেন, নিজের গবেষণাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন।

অবশেষে তার পরিশ্রমের ফল আসে। যুক্তরাষ্ট্রের Massachusetts, New Jersey, Portland, Vermont এবং পরবর্তীতে Rhode Island থেকে Organic Chemistry-তে ফুল-ফান্ডেড পিএইচডির অফার পান তিনি। শেষমেশ মাসুম সিদ্ধান্ত নেন Massachusetts-এ পিএইচডি করার।

মাসুমের এই অর্জন একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, মানুষের নিজের প্রচেষ্টা ও যোগ্যতাই তার আসল পরিচয়। সমাজের প্রচলিত ধারণা ভেঙে দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, ইচ্ছাশক্তি থাকলে যেকোনো জায়গা থেকেই বড় কিছু অর্জন করা সম্ভব।